পৃথিবীকে জেনে নিন আপনার ভাষায়….24 Hrs Online Newspaper

দণ্ডপ্রাপ্ত অন্য জঙ্গিদের মুক্ত করার পরিকল্পনাও ছিল তাদের

Posted on February 7, 2014 | in জাতীয় | by

23-02-14-JMB-4নুরুজ্জামান লাবু: দেশের বিভিন্ন কারাগারে থাকা সহযোগী জেএমবি সদস্যদের মুক্ত করার পরিকল্পনাও ছিল তাদের। ত্রিশালের অপারেশন ছিল তাদের প্রথম সফল অপারেশন। এর আগে দু’একবার চেষ্টা করলেও তারা সফল হতে পারেনি। দুই ভাগে বিভক্ত জেএমবি’র অঘোষিত আমীর ফারুক হোসেন ছিল এই পরিকল্পনার মূল হোতা। গ্রেপ্তারের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে বন্দুকযুদ্ধে নিহত জঙ্গি নেতা হাফেজ মাহমুদ ওরফে রাকিব হাসান এমন তথ্য জানিয়েছেন। এদিকে কারাগার থেকে জঙ্গিরা নিয়মিত তাদের সহযোগীদের সঙ্গে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলার প্রমাণ পেয়েছে গোয়েন্দারা। কথোপকথনের পাশাপাশি তারা নিয়মিত মেসেজ আদান-প্রদানও করতেন। এসব কথার রেকর্ড ও মেসেজের তথ্য উদ্ধার করেছে গোয়েন্দারা। গত রোববার ত্রিশালের সাইনবোর্ড এলাকায় এক পুলিশ সদস্যকে হত্যা করে দুর্ধর্ষ তিন জঙ্গিকে ছিনিয়ে নেয়ার বিষয়টি নিয়ে এখনও তোলপাড় চলছে।

ঘটনার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে রাকিব হাসান ওরফে হাফেজ মাহমুদ ও তাদের অবমুক্ত করা দলের অন্যতম সদস্য জাকারিয়াকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তবে মধ্যরাতে সহযোগীদের ধরার নামে হাফেজ মাহমুদের কথিত ‘ক্রসফায়ারে’ নিহত হওয়ার বিষয়টি নিয়েও ব্যাপক সমালোচনা চলছে। দুর্ধর্ষ এই জঙ্গির কাছ থেকে পরিপূর্ণ তথ্য উদ্ধার না করেই কেন তাকে নিয়ে অভিযান চালানো হলো  প্রশ্ন উঠেছে এ নিয়েও। টাঙ্গাইলের সখিপুর থানা হেফাজতে জিজ্ঞাসাবাদের সময় উপস্থিত ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, রাকিব হাসান ওরফে হাফেজ মাহমুদ এবং সালাউদ্দিন ওরফে সালেহীন জেএমবি’র শীর্ষ পর্যায়ের নেতা। তারা দু’জনই জেএমবি’র প্রতিষ্ঠাকালীন মজলিসে সূরা সদস্য। হাফেজ মাহমুদ প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেছে তাদের এই অপারেশন সাকসেসফুল হলে তারা একই কায়দায় বিভিন্ন কারাগারে বন্দি থাকা ফাঁসি ও যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত সদস্যদের অবমুক্ত করতো। এটি তাদের ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার অংশ ছিল। গ্রেপ্তারকৃত জাকারিয়া ও রায়হান ওরফে রাসেলকে ঢাকার গোয়েন্দা কার্যালয়ে এনেও জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, জেএমবি’র ত্রিশাল অপারেশনের মূল হোতা হলো ফারুক হোসেন। ২০০৬ সালে সে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের হাতে ধরা পড়েছিল। এরপর ২০১২ সালে কারাগার থেকে জামিনে বেরিয়ে আসে। কারাগার থেকে বেরিয়ে আসার পর সে নিজেকে জেএমবি’র স্বঘোষিত আমীর হিসেবে দাবি করে। এর আগে ২০১০ সালে মাওলানা সাইদুর রহমান গ্রেপ্তারের পর জেএমবি দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। সাইদুরের অবর্তমানে তার মনোনীত হিসেবে সোহেল মাহফুজ একাংশের আমীর নির্বাচিত হন। আর ফারুক নিজেকে আলাদা  অংশের আমীর ঘোষণা করে সালাউদ্দিন ওরফে সালেহীন, রাকিব হাসান ওরফে হাফেজ মাহমুদ ও বোমা মিজানসহ একটি অংশকে নিজের দলে নিয়ে আসে।
সূত্র জানায়, গ্রেপ্তারকৃত জাকারিয়া ২০০৫ সালে জেএমবি’র তৎকালীন সামরিক শাখার প্রধান আতাউর রহমান সানির (মৃত) সঙ্গে পুলিশের হাতে ধরা পড়ে। গত বছর সে উচ্চ আদালত থেকে জামিন নিয়ে কারাগার থেকে বেরিয়ে আসে। এরপর ফারুকের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করে জেএমবিকে সংগঠিত করতে থাকে।  ত্রিশালের অপারেশন নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদে জাকারিয়া জানায়, তাদের আমীর ফারুক হোসেন ওরফে আনোয়ার হোসেন তাকে শফিক নামে এক ব্যক্তির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়। গত ১৫ই ফেব্রুয়ারি রাজধানীর বনানী বাজারে শফিক তাকে মিলন, মানিক, মজিদ ও সবুজ নামে কয়েক জনের পরিচয় করিয়ে দেয়। তারা সেখানে ত্রিশালের অপারেশন নিয়ে আলোচনা করে। জিজ্ঞাসাবাদে জাকারিয়া জানায়, গত ২০শে ফেব্রুয়ারি জেএমবি সদস্য মানিকের ওপর দায়িত্ব ছিল রাকিব হাসান ওরফে হাফেজ মাহমুদের কাছে একটি মোবাইল ফোন দিতে হবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী মানিক ঢাকার আদালতের হাজতখানায় সিটিসেলের ওই মোবাইলটি রাকিবকে দেয়। ওই মোবাইলে প্রিজন ভ্যানে ও অপারেশন পরবর্তী  যোগাযোগের জন্য দেয়া হয়েছিল।

জিজ্ঞাসাবাদে হাফেজ মাহমুদ ওই মোবাইলটি মোটরসাইকেল  দিয়ে পালানোর সময় একটি পুকুরে ফেলে দিয়েছে বলে স্বীকার করে। পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে জাকারিয়া স্বীকার করেছে, ফারুক হোসেনের নেতৃত্বে জেএমবি’র এই অংশের অর্থ শাখার দায়িত্ব পালন করছিল সে। গোয়েন্দারা ইতিমধ্যে তার তিনটি ব্যাংক একাউন্টের তথ্য পেয়েছে। এসব একাউন্টে গত এক বছরে প্রায় কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে বলে জানতে পেরেছে। জাকারিয়া জানিয়েছে, এসব টাকা বিভিন্ন এনজিও এবং তাদের ভাষায় ‘সুধী’রা (জেএমবি’র সমর্থক) দিয়েছে। গোয়েন্দারা এসব সুধীজনকেও শনাক্ত করার চেষ্টা করছে। গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার ছানোয়ার হোসেন জানান, কারাগার থেকে শুরু করে তাদের পালিয়ে যাওয়া সব বিষয়ে অনুসন্ধান করা হচ্ছে।
কারাগার থেকে অবাধে কথা বলতো জঙ্গিরা: কারাগার থেকে আসামিদের কথা বলার পুরনো অভিযোগ রয়েছে। কিন্তু দুর্ধর্ষ এই তিন জঙ্গি সেই সুযোগ কাজে লাগানোর সুবিধা দেয়ায় বিষয়টি নিয়ে খোদ কারা অধিদপ্তরের মধ্যেও তোলপাড় চলছে। গোয়েন্দা সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, কারাগারে প্রায় দুই মাস ধরে তিন জঙ্গি মোবাইল ফোন ব্যবহার করে আসছিল। তাদের কাছে তিনটি মোবাইল সেট ও দুটি সিম ছিল। গোয়েন্দারা এসব সিমের নম্বর উদ্ধার করে কল রেকর্ডস উদ্ধার করেছে।

কল রেকর্ডস অনুযায়ী ঘটনার দিন সকাল ৮ টা ৪৭ মিনিটে জঙ্গিরা একটি ক্ষুদে বার্তা প্রেরণ করে। যেই ক্ষুদে বার্তাটি ভালুকায় অবস্থানকারী একজনের মোবাইলে গিয়ে পৌঁছে। ধারণা করা হচ্ছে, ভালুকায় অবস্থানকারী ওই ব্যক্তি ফারুক ছিলেন। তিনি আগে থেকেই ভালুকায় একটি প্রাইভেটকার নিয়ে অবস্থান করছিলেন। গোয়েন্দা সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ৩০শে জানুয়ারি থেকে তারা প্রায় প্রতিদিনই কাশিমপুরের কারাগার থেকে জঙ্গিদের কথোপকথনের রেকর্ড পেয়েছেন। কথার পাশাপাশি তারা ক্ষুদেবার্তা  আদান-প্রদানের তথ্যও পেয়েছেন। তবে অনেক ক্ষুদেবার্তা ছিল সাংকেতিক ভাষায়। গোয়েন্দারা এসব বিশ্লেষণ করে অর্থ বের করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। গ্রেপ্তারের পর হাফেজ মাহমুদ জানিয়েছিলেন, এসব মোবাইল ফোন তারা গোপনাঙ্গের সঙ্গে বেঁধে কারাগারের ভেতরে প্রবেশ করিয়েছিলেন। সর্বশেষ মোবাইল ফোনটিও একই কায়দায় নেয়া হয়। অনেক পুরোনো বন্দি এবং পরহেজগার (নিয়মিত নামাজা-রোজা করা) বলে কারারক্ষীরা তাদের গোপনাঙ্গ তল্লাশি করতো না।
প্রিজন ভ্যানের দুই পুলিশের ভাষ্য: ত্রিশালের জঙ্গি ছিনতাইয়ের ঘটনায় প্রিজন ভ্যানে চালকসহ চার পুলিশ সদস্যের মধ্যে আতিক নামে এক কনস্টেবল ঘটনাস্থলেই মারা যান। বাকি দুই পুলিশ সদস্য এসআই হাবিব ও কনস্টেবল সোহেল এখনও  ময়মনসিংহের দরপাড়া হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এই প্রতিবেদকের সঙ্গে মুঠোফোনে ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে এসআই হাবিব বলেন, সামনে দিয়ে একটি ট্রাক ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে তাদের গাড়িটির গতি কমে যায়। এর পর মুহূর্তেই সামনের কাঁচ ভেদ করে একটি গুলি তার পেটে বিদ্ধ হয়। এতে তিনি চিৎকার করে অজ্ঞান হয়ে যান। অপরদিকে ভ্যানের পেছনে থাকা পুলিশ কনস্টেবল সোহেল জানান, গাড়ি থেমে যাওয়ায় অমিত ভ্যান থেকে নামার চেষ্টা করছিল। তখনই তার শরীরে গুলিবিদ্ধ হয়। তিনি সামনের দিকে এগিয়ে এলে তার শরীরেও গুলি লাগে। এর মধ্যেই অস্ত্রধারীরা তাদের জিম্মি করে ফেলে।

এ কারণে তারা নিজেরা নিজেদের অস্ত্র ব্যবহারের সুযোগই পাননি। এসআই হাবিব ও সোহেল জোর করে দিয়ে বলেন, প্রিজন ভ্যানের ভেতরে আমাদের মোবাইল ফোন জঙ্গিরা ব্যবহার করে কথা বলার যে অভিযোগ উঠেছে তা ডাহা মিথ্যা। আমাদের মোবাইলের কল রেকর্ডস চেক করলেই তা পরিষ্কার হয়ে যাবে। ভ্যানের ভেতরে জঙ্গিরা কোন মোবাইলে কথা বলছিল কিনা তা জানতে চাইলে এমন কিছু তারা দেখেননি বলে মন্তব্য করেন। তবে গ্রেপ্তারকৃত জাকারিয়া স্বীকার করেছে তিন জঙ্গি প্রিজন ভ্যানে থাকার সময়ও তাদের সঙ্গে একাধিকবার কথা হয়েছে।
এখনও অধরা দুর্ধর্ষ দুই জঙ্গি: তিন জনকে ছিনিয়ে নেয়ার পর একজন গ্রেপ্তার ও পরে কথিত ‘ক্রসফায়ারে’ নিহত হলেও পালিয়ে যাওয়া বাকি দুই জঙ্গি সালাউদ্দিন ওরফে সালেহীন এবং জাহিদুল ইসলাম ওরফে বোমারু মিজানকে ধরতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

র‌্যাবের গোয়েন্দা শাখার পরিচালক লে. কর্নেল আবুল কালাম আজাদ জানান,  তাদের ধরার জন্য নিরন্তর চেষ্টা করা হচ্ছে। ম্যানুয়াল ও প্রযুক্তিগত সব উপায় ব্যবহার করা হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক সংস্থাও তাদের গতিবিধি জানার চেষ্টা করছে বলে জানিয়েছে। তবে গোয়েন্দা পুলিশের জঙ্গি দমনে অভিজ্ঞ এক কর্মকর্তা জানান, যে দুজন পালিয়ে আছে তারা খুবই দুর্ধর্ষ। তাদের গ্রেপ্তার করতে না পারলে গোপনে তারা আবারও জেএমবিকে চাঙ্গা ও নাশকতার চেষ্টা করতে পারে।

সর্বশেষ খবর

আজকের ছবি

www.facebook.com

Tag Cloud