February 17, 2026
বাংলাদেশে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং মোবাইল অপারেটরদের ডাটাবেজ পুলিশকে ব্যবহারের সুযোগ দেয়ার কারণে ফেঁসে যাচ্ছে জঙ্গিরা। তাদের নীল নকশা বাস্তবায়ন হওয়ার আগেই ধরাশায়ী হতে হচ্ছে। সংবাদ মাধ্যম সূত্র বলছে, রোববার ছিনতাই হওয়া ৩ জঙ্গির একজনকে গ্রেফতার করার পর জানা গেছে তারা কারাগারের ভেতরেই মোবাইল ব্যবহার করে যোগাযোগ রক্ষা করতো। তাদের রেকর্ড পর্যালোচনা করে ব্যবস্থা নিতে যাচ্ছে গোয়েন্দা বিভাগ। ইতোপূর্বেও দেশের শীর্ষ জঙ্গিনেতা শায়খ আবদুর রহমানকে মোবাইল নেটওয়ার্ক ট্র্যাক করেই গ্রেফতার করা হয়। এছাড়াও দেশে একাধিকবার জঙ্গিনেতাদের মোবাইল নেটওয়ার্কের গতিবিধি লক্ষ্য করে অবিশ্বাস্য সব অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে।
দৈনিক আমাদের সময়ে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কারাগারে আটক অবস্থায় জেএমবির ৩ জঙ্গিই মোবাইল ফোন ব্যবহার করত। এই মোবাইল ফোনেই শনিবার জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল রোববার সকালেই প্রিজন ভ্যানে হামলা করে তাদের ছিনিয়ে নেওয়া হবে। সে অনুযায়ী তৈরি করা হয় জেএমবির একাধিক সশস্ত্র টিম। যারা গতকাল সকালে পুলিশের প্রিজন ভ্যানে হামলা করে জেএমবির সাজাপ্রাপ্ত ৩ জঙ্গি সালাউদ্দিন ওরফে সালেহীন, জাহিদুল ইসলাম ওরফে সুমন ওরফে বোমারু মিজান এবং রাকিব হাসান ওরফে হাফেজ মাহমুদকে ছিনিয়ে নেয়। গতকাল বিকালে আটক জঙ্গি রাকিব হাসান ওরফে হাফেজ মাহমুদকে জিজ্ঞাসাবাদ করে এবং তথ্য প্রযুক্তির সহায়তা নিয়ে এসব তথ্য জানতে পারেন গোয়েন্দারা।
সূত্র জানায়, কারাগারে আটক এই ৩ জঙ্গির সঙ্গে বাইরে থাকা জেএমবির সদস্যরা গত কয়েকদিন দফায় দফায় টেলিফোনে আলাপ করে। কবে, কখন, কীভাবে হামলা করে আসামি ছিনতাই করা হবে তার দিনক্ষণ নিয়ে প্রথমে দ্বিধাদ্বন্দ্ব ছিল তাদের মধ্যে। পরবর্তী সময়ে শনিবার আসামি ছিনতাইয়ের সিদ্ধান্ত পাকা করা হয়। শনিবারের ওই সিদ্ধান্ত মোতাবেক ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের ত্রিশাল উপজেলার কাশিগঞ্জ সাইনবোর্ড এলাকাতেই প্রিজন ভ্যানে হামলা করে ৩ সহযোগীকে ছিনিয়ে নেয় জেএমবি সদস্যরা। সূত্র বলেছে, জঙ্গিরা পৃথকভাবে তিনটি কারাগারে থাকলেও তারা কারাগারে বসেই একে অপরের সঙ্গে টেলিফোনে মাঝে-মধ্যে কথা বলত। এজন্য কারাগারের কতিপয় সদস্য তাদের কাছ থেকে সুবিধা নিত।
রাকিব হাসান ওরফে হাফেজ মাহমুদ রোববার পুলিশের প্রিজন ভ্যান থেকে পালিয়ে গেলেও পরে টাঙ্গাইলে গিয়ে পুলিশের হাতে ধরা পড়ে যায়। এই হাফেজ মাহমুদকেও মোবাইলের খপ্পরেই গ্রেফতার করা হয়েছিল। র্যাবের গোয়েন্দা বিভাগের কর্মকর্তারা বলেন, ২০০৬ সালে অনেক কষ্টে তারা জানতে পারেন, হাফেজ মাহমুদ নারকেল ব্যবসায়ী সেজে আছেন যশোরে। কর্মকর্তারা তার ফোন নম্বর জোগাড় করেন। কিন্তু ফোনে কথা বলতে চান না হাফেজ। র্যাবের সোর্স অন্য পরিচয়ে নানা টোপ ফেলতে থাকেন। দুই মাস চলে ইঁদুর-বিড়াল খেলা। একপর্যায়ে র্যাবের সোর্স বিদেশি এনজিওর লোক পরিচয় দিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা পাইয়ে দেওয়ার লোভ দেখান। বলা হয়, তাদের এসব কর্মকাণ্ডের পেছনে একটি এনজিও অর্থ সাহায্য দিতে চায়। এবার বরফ গলে। টোপ গেলেন হাফেজ মাহমুদ।
হাফেজের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনের পর থেকেই তার মোবাইল ফোনে তীক্ষ নজর রাখা হয়। দেখা যায়, র্যাবের সোর্সের সঙ্গে কথা বলার পরপরই হাফেজ মাহমুদ অন্য একটি নম্বরে ফোন করেন। কিন্তু তাদের কথা হয় সাংকেতিক ভাষায়। কিছুই বোঝা যায় না। একেক সময় ওই ব্যক্তির অবস্থান থাকে একেক জায়গায়। তবে মোটামুটি নিশ্চিত হওয়া যায়, ওই ব্যক্তিই শায়খ রহমান। কিন্তু তার আগে ধরা দরকার হাফেজ মাহমুদ ওরফে রাকিব হাসানকে। র্যাব সোর্সের টোপ গিলে হাফেজ রাজি হন, ২০০৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ঢাকার বায়তুল মোকাররমে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের পাঠাগারে আলোচনায় বসা হবে। র্যাবের গোয়েন্দা বিভাগের প্রধান লে. কর্নেল গুলজার ফাঁদ পাতেন ওই পাঠাগার ও তার আশপাশে। ওই দিন ভোরবেলা হাফেজ মাহমুদ যশোর থেকে নৈশকোচে ঢাকায় এসে নামেন, সে খবরও পায় র্যাব। ব্যস, শুরু হয় গোয়েন্দাগিরির খেলা।
বায়তুল মোকাররম থেকে গ্রফতার করা হাফেজ মাহমুদকে নিয়ে তখনই শুরু হয় প্রবল জিজ্ঞাসাবাদ। কিন্তু হাফেজ অটল। শায়খ রহমানের অবস্থান তিনি কিছুতেই জানাবেন না। একপর্যায়ে শায়খের ফোন নম্বর জানাতে রাজি হন তিনি। তার হাত থেকে মোবাইল সেট কেড়ে নিয়ে র্যাব কর্মকর্তারা দেখেন, একটি নম্বরে বারবার কথা বলা হয়েছে। র্যাবের আইটি শাখার মেজর জোহা খোঁজ করে দেখেন, এ নম্বরটি সিলেটের এমসি কলেজ টাওয়ার থেকে আসছে এবং টাওয়ারের ৮ বর্গকিলোমিটারের মধ্যেই ফোনটির অবস্থান। র্যাব মহাপরিচালক আবদুল আজিজ সরকারকে বিষয়টি জানানোর পর সিলেটে র্যাব-৯ এর অধিনায়ক লে. কর্নেল মোমিনকে নির্দেশ দেন, টাওয়ার থেকে ৮ বর্গকিলোমিটার দ্রুত ঘেরাও করে ফেলতে। কর্নেল মোমিন, মেজর শিব্বির ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হায়দার তখনই পুরো এলাকা ঘিরে ফেলেন।
ঢাকা থেকেও রওনা হয় র্যাবের গোয়েন্দা প্রধান লে. কর্নেল গুলজার উদ্দিনের নেতৃত্বে ৪০ সদস্যের একটি দল। ওই বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি মঙ্গলবার বিকাল ৪টার দিকে তারা ঢাকা থেকে রওনা হয়ে সিলেট পৌঁছান রাত ৮টায়। ওই দলে আরও ছিলেন মেজর আতিক, মেজর মানিক, মেজর জাভেদ, মেজর ওয়াসি, ক্যাপ্টেন তানভির ও ক্যাপ্টেন তোফাজ্জল। অভিযানে র্যাবের আড়াইশ সদস্য অংশগ্রহণ করেন। গোটা অভিযান কেন্দ্রীভূত হয় ‘সূর্যদীঘল বাড়ী’কে ঘিরে। এখানেই আত্মগোপন করেছিলেন শায়খ আবদুর রহমান। শেষ পর্যন্ত মোবাইল ট্র্যাকিং করেই তাকে গ্রেফতার করা হয়।
পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ নিয়মিত ভাবেই জঙ্গিসহ শীর্ষ অপরাধীদের ধরতে মোবাইল ফোন ট্র্যাকিংয়ের ব্যবহার করে আসছেন। এদিকে গত বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা বিভাগে মোবাইল ফোন ট্র্যাকিং সংক্রান্ত একটি মনিটরিং সেল গঠন করা হয়। এ ব্যাপারে র্যাব-৭ অধিনায়ক লে. কর্নেল সাইফুল করিম বলেন, মোবাইল ফোন ট্র্যাকিংয়ের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ অপরাধীদের ধরার কৌশল ডিবি থেকে কেন্দ্রীয়ভাবে চালু হয়েছে। প্রয়োজনের তাগিদে বিভিন্ন ক্ষেত্রে এর ব্যবহার করা হয়ে থাকে।