May 6, 2026
ঢাকা: চলতি বছরের মাঝামাঝি সময়ে তিস্তা চুক্তি স্বাক্ষর করতে যাচ্ছে ভারত সরকার। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কন্যা সায়মা ওয়াজেদ পুতুলকে মঙ্গলবার সোনিয়া গান্ধী বিষয়টি জানিয়েছেন। একই প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়।
সোমবার পুতুল একটি অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের জন্য নয়াদিল্লিতে আসলে ইউপিএর চেয়ারপারসন ও রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। এসময় সোনিয়া তাকে বলেন, ইউপিএ সরকার তিস্তা চুক্তি করতে বদ্ধপরিকর।
তিনি বলেন, বিভিন্ন নানা কারণে বাংলাদেশকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি রাখা যায়নি। কিন্তু আর বিলম্ব না করে কয়েক মাসের মধ্যেই ভারত সরকার এই চুক্তি সম্পাদন করতে চায়।
রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়ও পুতুলকে একই আশ্বাস দিয়েছেন বলে রাষ্ট্রপতি ভবন সূত্রে জানা যায়।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী সালমান খুরশিদের চলতি মাসেই ঢাকা আসার কথা রয়েছে। এছাড়া মার্চে রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়ের বাংলাদেশ আসার কথা রয়েছে। এই দুই সফরের পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরে যাওয়ার কথা রয়েছে।
বিশ্বস্ত সূত্রে জানা যায়,শেখ হাসিনার ভারত সফরের সময়ই তিস্তার পানি বণ্টন নিয়ে দু’দেশের মধ্যে অতি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তিটি সম্পন্ন করার চেষ্টা চলছে। তবে, পানি বণ্টনের পরিমাণ নিয়ে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সিদ্ধান্তহীনতার কারণে চুক্তি পত্রে এই বিষয়টি উহ্য রাখা হতে পারে।
গঙ্গা চুক্তির সময় পানি বণ্টন পরিমাণের বিষয়টি পরে আলোচনার মাধ্যমে ঠিক করা হয়েছিল। সুতরাং তিস্তার ক্ষেত্রেও বিষয়টি নিয়ে পরে আলোচনা সম্ভব বলে সূত্রে জানা যায়।
ভারত সরকারের বক্তব্য, চুক্তিটি নিয়ে টালবাহানা চললে বাংলাদেশে কিছু ভারতবিরোধী শক্তি নানা ধরনের অপপ্রচার করতে পারে। শেখ হাসিনার সরকারও তাতে বিপাকে পড়তে পারে। তাই কেন্দ্রের প্রধান লক্ষ্য তিস্তা চুক্তিটি সেরে ফেলা।
তিস্তা চুক্তি বাস্তবায়নে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আপত্তিই প্রধান অন্তরায়। ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং চুক্তি করতে ঢাকায় এসেও মমতার আপত্তিতে শেষ মুহূর্তে পিছিয়ে যান।
তিস্তা চুক্তির বিষয়টি যখন কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার আলোচ্যসূচিতে ওঠে, প্রণব মুখোপাধ্যায় তখন অর্থমন্ত্রী। তৃণমূল তখন ইউপিএর অন্যতম প্রধান শরিক। তাদের বিরোধিতার কারণে সে সময়ে মন্ত্রিসভায় ওই চুক্তি পাশ করা সম্ভব হয়নি। কিন্তু তৃণমূল এখন ইউপিএ-র বাইরে।
বাংলাদেশ বরাবর দিল্লির উপর চাপ সৃষ্টি করে চলেছে, যেন প্রতিশ্রুতি রেখে মনমোহন সরকার অবিলম্বে তিস্তা চুক্তিটি সম্পাদন করে। ভারতের পররাষ্ট্র সচিব রঞ্জন মাথাই সম্প্রতি ঢাকা ঘুরে গেছেন। সফরে মাথাইও কয়েক মাসের মধ্যে তিস্তা চুক্তিটি সম্পন্ন হবে বলে বাংলাদেশের প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের আশ্বাস দেন বলে বিশ্বস্ত সূত্রে জানা যায়।
আগামী ১৫ ফেব্রুয়ারি পররাষ্ট্রমন্ত্রী সালমান খুরশিদ দু’দিনের এক সফরে ঢাকায় আসার কথা রয়েছে। সফরে তিস্তা চুক্তির বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা। মার্চে রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায় ঢাকা আসছেন। সফরে দু’জনই তিস্তা চুক্তি নিয়ে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে কথা বলবেন বলে জানা যায়। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে প্রণব মুখোপাধ্যায়ের অবদানকে স্বীকৃতি দিতে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে একটি বিশেষ সম্মান দেওয়ারও পরিকল্পনা নিয়েছেন। বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির সেই বিশেষ সম্মান তুলে দেওয়ার কথা।
বিশ্বস্ত সূত্রে জানা যায়, তিস্তা চুক্তি করতে রাজ্য সরকারের অনুমোদন বাধ্যতামূলক নয়। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার প্রতি আস্থা রেখে প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং বিষয়টি নিয়ে মমতার সঙ্গে বার বার আলোচনা করেছেন। জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা শিবশঙ্কর মেনন, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা টি কে এ নায়ার থেকে শুরু করে কেন্দ্রীয় গ্রামোন্নয়ন মন্ত্রী জয়রাম রমেশ নানা স্তরে মমতাকে বোঝানোর চেষ্টা করেছেন যে, এই চুক্তির ফলে পশ্চিমবঙ্গ কোন ভাবেই তার প্রাপ্য পানি থেকে বঞ্চিত হবে না।
শেখ হাসিনার বিশেষ ঘনিষ্ঠ সাংবাদিক ও লেখিকা বেবি মওদুদও মমতার সঙ্গে দেখা করে অনুরোধ জানিয়েছেন যেন মমতা ওই চুক্তিতে রাজি হন। মহাকরণে এসে মমতাকে বোঝাতে চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনি। এমনকি মার্কিন পররাষ্ট্র সচিব হিলারি ক্লিনটনও কলকাতায় এসে মমতাকে বোঝানোর চেষ্টা করেছেন যে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বাংলাদেশের যা অবস্থান, তাতে নিরাপত্তার কারণেই প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের ভালো সম্পর্ক রাখা জরুরি।
কয়েক দিন আগেই ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রসচিব সুশীল কুমার সিন্দে বাংলাদেশে সফরে এসে বন্দি প্রত্যার্পণ চুক্তি করেছেন। চুক্তির বিরুদ্ধে বাংলাদেশের একাধিক মহল সরব হলেও হাসিনা সরকার তাতে সবুজ সংকেত দেয়। স্বভাবতই প্রশ্ন উঠেছে, নিরাপত্তার প্রশ্নে বাংলাদেশ যখন ভারতকে সাহায্য করছে, তখন পানির ক্ষেত্রে ভারত কেন তাদের সাহায্য করবে না।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কন্যা পুতুল অটিজম ও স্নায়ু সংক্রান্ত একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে যোগ দিতে দিল্লি এসেছেন। কানাডার বাসিন্দা পুতুল অটিজম-এর উপর বাংলাদেশের জাতীয় কমিটির উপদেষ্টা এবং অটিজম সংক্রান্ত একটি বেসরকারি সংস্থার প্রধান। কিছু দিন আগে তাঁর আমন্ত্রণে সোনিয়া গান্ধী বাংলাদেশ অটিজম সংক্রান্ত একটি সম্মেলনে যোগ দিয়েছিলেন।
প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর সঙ্গেও তার সুসম্পর্ক রয়েছে। দিল্লি থেকে ঢাকা ঘুরে পুতুলের কানাডা ফেরার কথা। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মনে করছে, তিস্তা নিয়ে সোনিয়া-প্রণবের এই গুরুত্বপূর্ণ বার্তাটি তাঁর মায়ের কাছে পৌঁছে দেবেন পুতুল। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্তাদের বক্তব্য, এটি আরও এক ধরনের কূটনীতি, যেখানে অরাজনৈতিক ভাবে সমস্যা মোকাবিলার চেষ্টা করা হয়ে থাকে। পুতুল শেখ মুজিবুর রহমানের নাতনি হওয়ায় ভারতের কাছে তাঁর আলাদা কদর রয়েছে।