May 5, 2026

বাংলাদেশে আকস্মাৎ এই ‘আরব বসন্তের’ কারণটা কি? লন্ডনের অনেক বন্ধুই আমাকে কারণটা জিজ্ঞাসা করেন। তাঁদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যসহ কয়েকটি মুসলিম দেশে আকস্মিক গণঅভ্যুত্থান ঘটার একটা বড় কারণ ছিল, বহুযুগ ধরে এই দেশগুলোর মানুষ তাদের স্বৈরাচারী শাসক, সামরিক শাসকদের দ্বারা নিষ্ঠুরভাবে শাসিত হচ্ছিল। এই স্বৈরাচারী শাসকদের অনেকের পেছনে শক্তি ও সমর্থন জোগাত পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলো। ফলে স্বৈরাচারী শাসকরা অতি সহজেই তাদের বিরুদ্ধে গণঅসন্তোষ ও গণআন্দোলন দমন করে ফেলত।
এই অবস্থাটির সহসা পরিবর্তন হয়। যে কোন কারণেই হোক আমেরিকাসহ পশ্চিমা দেশগুলো এই স্বৈরাচারী শাসকদের কারও কারও ওপর থেকে সমর্থন প্রত্যাহার করে এবং এই ফাঁকে জমাটবাঁধা গণ অসন্তোষ গণঅভ্যুত্থানে পরিণত হয় এবং একশ্রেণীর স্বৈরাচারীর পতন ঘটায়।
বাংলাদেশে এই অবস্থার উদ্ভব হয়নি। কোন স্বৈরাচারী অথবা সামরিক সরকার এখন ক্ষমতায় নেই। বরং একটি গণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় রয়েছে। তারা দেশকে এখনও সুশাসন উপহার দিতে পারেনি। আবার আগের বিএনপি-জামায়াত সরকারের মতো কুশাসনও উপহার দেয়নি। বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে জনসাধারণের-বিশেষ করে শহুরে মধ্যবিত্তের অনেক অভিযোগ আছে; কিন্তু গণঅসন্তোষ নেই। বিএনপি ও জামায়াত অনেক চেষ্টা করেও জনতাকে রাজপথে সরকার-বিরোধী আন্দোলনে নামাতে পারেনি। তাদের আন্দোলন ক্যাডার ভিত্তিক এবং ক্যাডারদের দ্বারা ভাংচুর, বাসযাত্রী, রিকশাওয়ালাকে পুড়িয়ে মারাকেই তারা আন্দোলনের নামে চালাতে চাইছে। তাতেও সফল হতে পারছে না।
ঢাকায় শাহবাগ স্কোয়ারে হঠাৎ যে বিশাল গণসমাবেশ, যে সমাবেশের বড় অংশই তরুণ, তাদের সেøাগান সরকারের বিরুদ্ধে নয়, পক্ষেও নয়। বিরুদ্ধে হলে বিএনপি সকলের আগে এই আন্দোলনে এসে অংশ নিত। এই সমাবেশে কোন রাজনৈতিক দল বা দলসমূহের নেতৃত্ব নেই। ফলে এই সমাবেশ কোন রাজনৈতিক চরিত্রও ধারণ করেনি। বরং একে ইতোমধ্যেই দলমত নির্বিশেষে দেশের সকল মানুষের বিশেষ করে তরুণদের অভ্যুত্থান আখ্যা দেয়া হয়েছে।
ঢাকার এই ‘আরব বসন্তের’ একটাই লক্ষ্য। একাত্তরের স্বাধীনতাবিরোধী এবং মানবতাবিরোধী দেশদ্রোহী ঘাতচক্রের বিচার এবং শুধু বিচার নয়, তাদের শাস্তি হিসেবে চরম দ- প্রদান। কাদের মোল্লা নামে এক চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীকে এই চরম দ- প্রদান না করায় দেশের মানুষ, বিশেষ করে তরুণ সমাজ ফুঁসে উঠেছে এবং প্রত্যেকটি যুদ্ধাপরাধীর চরম দ- দাবি করে বাঁধভাঙ্গা ঢলের মতো শুধু ঢাকার শাহবাগে নয়, সারা দেশে বিশাল প্লাবন সৃষ্টি করেছে। এই প্লাবন এখন পর্যন্ত অব্যাহত রয়েছে।
এটাই দেশে-বিদেশে একশ্রেণীর রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকের মধ্যে বিস্ময় সৃষ্টি করেছে। একাত্তরের যুদ্ধাপরাধী এবং স্বাধীনতার শত্রুদের প্রতি বালাদেশের মানুষের মনে এত ঘৃণা ও ক্রোধ পুঞ্জীভূত হয়ে আছে, এটা তারা বুঝতে পারেননি। তাঁরা ভেবেছিলেন, গত ৪২ বছরে স্বাধীনতার শত্রুরা দেশী-বিদেশী মদদে শুধু আত্মরক্ষা করা নয়, ক্ষমতার মসনদেও বসতে সক্ষম হয়েছিল। স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাসকে তারা চরমভাবে বিকৃত করেছে। সুতরাং দুর্বল স্মরণশক্তির অধিকারী সাধারণ মানুষ যুদ্ধাপরাধী ও মানবতার শত্রুদের ‘৭১-এর অপরাধ সম্ভবত: ভুলে গেছে। গত ৪২ বছরে এই অপরাধের প্রমাণ পত্রও তারা যতটা সম্ভব ধ্বংস করেছে। সুতরাং পুরনো প্রজন্মের না হোক, বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে তো এই অপরাধীদের এত অপরাধের বিবরণ জানার কথা নয় এবং তাদের বিরুদ্ধে এত ঘৃণা জন্মানোও সম্ভব নয়।
শাহবাগের প্রজন্ম স্কোয়ারের গণজলোচ্ছ্বাসে, বিশেষ করে তরুণদের অভ্যুত্থানে বিএনপি ও জামায়াতই সবচাইতে বেশি বিস্মিত হয়েছে এবং হতবাক হয়েছে। তদের এত যুগের এত সাধের সাধনা সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়ে যাবে ভাবতে পারেনি। তারা ভেবেছিল ক্ষমতায় বসে ইতিহাস-বিকৃতি, জাতীয় নেতাদের চরিত্র হনন, একশ্রেণীর বুদ্ধিজীবী ও সাংবাদিক ক্রয় করে গোয়েবলসীয় মিথ্যা প্রোপাগা-া চালিয়ে দেশের তরুণ সমাজকে সম্পূর্ণ বিভ্রান্ত ও বিপথগামী করতে সক্ষম হয়েছে। আমার এক প্রবীণ সাংবাদিক বন্ধু, যিনি নিজেও ছিলেন স্বাধীনতার পক্ষের শিবিরের লোক; তিনিও বার্ধক্যের ভ্রম অথবা অন্য যে কোন কারণেই হোক, কুখ্যাত হাওয়া ভবনের দুর্বৃত্তদের নেতা জিয়াপুত্র তারেক রহমানকে ‘বাংলার তারুণ্যের ভবিষ্যত’ আখ্যা দিয়ে নিজেকে হাস্যষ্পদ করেছিলেন।
সেই তারেক রহমান এখন কোথায়? সন্ত্রাস, অর্থপাচারসহ দুর্নীতির বড় বড় অভিযোগে অভিযুক্ত হয়ে বিদেশে গাঢাকা দিয়ে ভীরু পলাতকের জীবনযাপন করছেন; অন্যদিকে ঢাকার শাহবাগের গণতারুণ্যের মঞ্চে আগামী দিনের বাংলার নতুন নায়কদের অভ্যুদয় আমি দেখছি। সুদূর ল-নে বসে টেলিভিশনে শাহবাগ মঞ্চের সকল তরুণ নায়ককে দেখার সুযোগ আমার হয়নি। কিন্তু লাকি আখতারের মতো এক তরুণীকে আমি বার বার দেখেছি আর পরম সন্তোষের সঙ্গে নিজেকে বলেছি, নাহ আজকের তরুণ সমাজকে নিয়ে আমাদের শঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। তাদের ভেতরে একাত্তরের চেতনার পুনর্জন্ম ঘটেছে। এখন মৃত্যু হলেও আমার দুঃখ পাওয়ার আর কিছু থাকবে না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে এই ব্যাপারে আমি সম্পূর্ণ সহমত পোষণ করি।
জামায়াত ও বিএনপি-অর্থাৎ একাত্তরের মাবনতার শত্রুদের সমর্থক ও সহযোগীরা এখানেই তাদের সবচাইতে বড় রাজনৈতিক ভুল করেছে এবং এখন জন-প্লাবনের সামনে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে তাদের নেতারা প্রলাপ বকতে শুরু করেছেন। তাঁদের এই ভুলটা কি? বিএনপি ভেবেছে, দীর্ঘ একুশ বছর আওয়ামী লীগকে ক্ষমতার বাইরে থাকতে বাধ্য করে ভাড়াটিয়া লেখক দ্বারা স্বাধীনতার যুদ্ধের ইতিহাস-বিকৃতি এবং খলনায়ককে স্বাধীনতাযুদ্ধের আসল নায়ক বানানোর চেষ্টা দ্বারা দেশের তরুণ সমাজকে তারা যথেষ্ট পরিমাণে বিভ্রান্ত ও বিপথগামী করতে পেরেছেন। সুতরাং মেরুদ- ভাঙ্গা এই তরুণ প্রজন্ম স্বাধীনতার সৈনিক নয়, স্বাধীনতার আদর্শ-হত্যাকারী ‘জিয়া-সৈনিক’ হতে চাইবে।
অন্যদিকে জামায়াতীরা ভেবেছে, অপপ্রচার ও প্রোপাগা-া দ্বারা তারা দেশের তরুণ জনমনে এই মিথ্যাকে সত্য বলে প্রতিষ্ঠিত করবে যে ‘৭১-এ তারা ছিলেন ধোঁয়া তুলসিপাতা। মানবতা ও দেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে কোন অপরাধ তারা করেননি।
অন্যদিকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের মানুষের শিরকাটা, রগ কাটা এবং উগ্র মৌলবাদী অসংখ্য উপদল জন্ম দিয়ে, বাংলা ভাইদের উত্থান ঘটিয়ে তারা ক্ষমতা দখল করবে এবং সুযোগ মতো এক সময় বিএনপিকে হঁটিয়ে দিয়ে নিজেরাই রাষ্ট্র ক্ষমতায় সর্বেসর্বা হবে।
জামায়াতীদেরও স্ট্রাটেজি নির্ধারণে ভুলটা এখানেই হয়েছে। কারবালায় ইমাম হোসেন ও তাঁর পরিবারবর্গের নির্মম হত্যার বেদনা এজিদ চক্র হাজার চেষ্টা দ্বারা যেমন শিয়া-সুন্নি নির্বিশেষে মুসলমানদের মন থেকে মুছতে পারেনি; বাংলাদেশে তেমনি জামায়াতীদের (রাজাকার, আল বদর, আল শামস ইত্যাদি বহু নামে) বর্বর বুদ্ধিজীবী হত্যা (তাদের মধ্যে নারীও আছে), গণহত্যায় সহযোগী হওয়া বাংলার মানুষ ভোলেনি। তাদের তরুণ প্রজন্মকেও ভুলতে দেয়নি। মিথ্যা ইতিহাস তৈরি করে তো চোখে দেখা অভিজ্ঞতা কারও মন থেকে মুছে ফেলা যায় না।
জামায়াতীদের একাত্তরের বর্বরতা হয়ত বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম চোখে দেখেনি। কিন্তু বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর তাদের স্বাধীনতা-বিরোধী কার্যকলাপ এবং রাজনীতির নামে সন্ত্রাসী তৎপরতা এবং কুখ্যাত সন্ত্রাসী বাংলাভাই, হিযবুত তাহরিকদের লালন-পালনের ব্যাপারটি তো তারা প্রত্যক্ষ করেছে।
যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, যা সারা দেশের মানুষের একান্ত কাম্য, তা ঠেকানোর জন্য তাদের প্রোপাগান্ডা ও অপপ্রচার, বৈধভাবে গঠিত ট্রাইব্যুনালকে এবং তার বিচারকে অস্বীকার, বিচার ও রায় ব্যর্থ করার জন্য আন্দোলনের নামে গাড়ি, দোকান ভাংচুর, বাস পোড়ানো, বাসযাত্রী হত্যা ইত্যাদি দেশের পুরনো প্রজন্মের মনে জামায়াতীদের ’৭১-এর অপরাধ মুছতে দেয়নি এবং তরুণ প্রজন্মকেও জামায়াতীদের সন্ত্রাসী ও ঘাতক ছেহারার সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে পরিচিত করেছে।
এই প্রবন্ধটি লেখার সময় খবর পেয়েছি, গতকাল (মঙ্গলবার) যখন শাহবাগে লাখ লাখ মানুষের সমাবেশ শান্তিপূর্ণভাবে তাদের দাবি উত্থাপন চালিয়ে যাচ্ছে, তখন জামায়াতীরা সেই পুরনো ঘাতক স্বভাব দ্বারা চালিত হয়ে জনসমাবেশের দূরে কাওরান বাজার এলাকায় এবং কিছুটা মতিঝিলে হঠাৎ আবির্ভূত হয়ে গাড়ি ভাংচুর করেছে। ফলে ‘প্রথম আলোর’ সম্পাদকও আহত হয়েছেন। পুলিশ ও জামায়াতীদের মধ্যে গুলি বিনিময়কালে একজন পথচারী নিহত হয়েছেন। দু’জন জামায়াতী গু-াকে ধরে জনতা পুলিশের হাতে হাওলা করেছে।
একদিকে লাখ লাখ মানুষের শান্তিপূর্ণ সমাবেশ। অন্যদিকে মুষ্টিমেয় জামায়াতী গু-ার আকস্মিকভাবে রাস্তায় নেমে সাধারণ নাগরিকদের গাড়ি ভাংচুর করা এবং তারপর অলিগলিতে মূষিকের মতো পলায়ন। ’৭১ সালে এরা ছিল বর্বর ঘাতক এবং হানাদারদের কোলাবরেটর। বর্তমানেও তাদের চরিত্রের পরিবর্তন হয়নি। তারা রাজনীতির নামে একই দস্যুবৃত্তি চালিয়ে যাচ্ছে। মানুষের ক্ষোভ তাই গত চল্লিশ বছরেও জামায়াতীদের ওপর থেকে হ্রাস পায়নি, বরং দিন দিন পুঞ্জীভূত হয়েছে এবং তরুণ প্রজন্মের মধ্যেও ব্যাপকভাবে সঞ্চারিত হয়েছে।
’৭১-এর যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের সময়ে জামায়াতীদের আবার ঘাতক ও দালাল চরিত্রে প্রত্যাবর্তন, দেশে অরাজকতা সৃষ্টির চেষ্টা এবং গৃহযুদ্ধের (’৭১-এর পুনরাবৃত্তি) হুমকি সারা দেশের মানুষ, এমনকি তরুণ সমাজের মনেও পুঞ্জীভূত ক্রোধের বারুদে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। ফলে কোন প্রস্তুতি ছাড়া, কোন রাজনৈতিক নেতা বা দলের ডাক ছাড়া শুধু ঢাকার শাহবাগে নয়, সারা দেশে এই অভূতপূর্ব গণজাগরণ। বাংলাদেশে ‘আরব স্প্রিং’ কোন আকস্মিক ঘটনা নয়; যুদ্ধাপরাধী জামায়াতীরাই এই ঘটনাটিকে প্ররোচিত করেছে এবং এই দেশদ্রোহীদের বিরুদ্ধে দেশের তরুণ সমাজ আবার একাত্তরের হাতিয়ার ধারণ করেছে। এই কথাটিই আমি সকলের প্রশ্নের জবাবে বলি।
একাত্তরে গণহত্যা, বুদ্ধিজীবী হত্যা দ্বারা জামায়াত সফল হয়নি। এবারেও গু-ামি ও সন্ত্রাস দ্বারা ’৭১-এর যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও শাস্তি বন্ধ করতে পারবে না। শাহবাগে তাদের মৃত্যুঘণ্টা বেজেছে। এই ঘণ্টাধ্বনি আজ সারাদেশে নিনাদিত হচ্ছে। এবার বিএনপির কাঁধে সওয়ার হয়েও জামায়াতীরা বাংলাদেশে টিকতে পারবে না। কবি গোলাম কুদ্দুসের দু’টি কবিতার লাইন একটু পাল্টে এখানে উদ্ধৃত করছি।
“লক্ষ লক্ষ তরুণ কণ্ঠে নিনাদিত আজ গর্জন
তারা দৈত্য বধের সত্য করেছে অর্জন।”
(জনকন্ঠ, ১৩/০২/২০১৩)