পৃথিবীকে জেনে নিন আপনার ভাষায়….24 Hrs Online Newspaper

ডিসিসির মতো ভাগ্যবরণ করতে পারে জাতীয় নির্বাচন

Posted on May 26, 2013 | in নির্বাচিত কলাম | by

tuhin-malik1

১৩ মে হাইকোর্টে নির্বাচনের ওপর স্থগিতাদেশ প্রত্যাহারের পর ডিসিসি নির্বাচনের সব আইনি জটিলতার নিরসন ঘটে। তবুও নির্বাচন হচ্ছে না। আবারও বলা হচ্ছে সেই একই কথাথ আইনি জটিলতা। অথচ বলা হচ্ছে না সরকারের কুটিলতার কথা। গত বছরও ডিসিসি নির্বাচনে সীমানা নির্ধারণসহ আইনি জটিলতার কথা বলে স্থগিত করা হয় নির্বাচন। এবার হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞা উঠে যাওয়ার পর নির্বাচন কমিশন সুলতানগঞ্জ ইউনিয়নের বিষয়টি স্পষ্ট করতে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়কে চিঠি দেয়। এর জবাবে ১৯ মে মন্ত্রণালয় চিঠি দিয়ে জানিয়েছে, সুলতানগঞ্জ ইউনিয়নের এলাকাকে দক্ষিণ সিটির অন্তর্ভুক্ত করা হলেও এটি এখনো ওয়ার্ডভুক্ত হয়নি। সীমানা নিয়ে সৃষ্ট জটিলতা দূর না হওয়া পর্যন্ত ঢাকা সিটি করপোরেশন (ডিসিসি) নির্বাচনে যাবে না নির্বাচন কমিশন। ফলে বলা যায় বর্তমান সরকারের মেয়াদেও হবে না ডিসিসি নির্বাচন।

একদিকে মন্ত্রণালয় ও ইসি বলছে আইনি জটিলতার কথা। অথচ এই জটিলতা তো জনগণ তৈরি করেনি। আর জটিলতা নিরসন করা যাদের দায়িত্ব তারা কেন তাদের দায়িত্ব পালন করল না? হঠাৎ করে উচ্চ আদালতে মামলা বিচারাধীন থাকা অবস্থায় মন্ত্রণালয় কেন সুলতানগঞ্জ ইউনিয়নকে সিটি করপোরেশনে অন্তর্ভুক্ত করল? আর করলেও তার সীমানা কেন এতদিনে নির্ধারণ করা হলো না? সীমানা নির্ধারণের জন্য আইন মতে একজন মাত্র কর্মকর্তা কেন এতদিনেও নিয়োগ দেওয়া হলো না? সীমানা নির্ধারণের জন্য একটি গণবিজ্ঞপ্তি এতদিনে কেন প্রকাশ করা হলো না? নতুন করে কেন ডিসিসি দক্ষিণে ৫৭ নম্বর ওয়ার্ড জন্ম দেওয়া হলো? এই ওয়ার্ড কেন সিটি করপোরেশনের অন্তর্ভুক্ত বলে এসআরও জারি করা হলো? আবার মন্ত্রণালয় থেকে কেন ৫৭ নম্বর ওয়ার্ড বাদ দিয়ে নির্বাচন করতে বলা হলো? সীমানা নির্ধারণ করার পর এটা বলা হলো না কেন? আর এই কথাগুলো জনগণ হঠাৎ করে এখন জানল কেন? এত সব কেন-এর উত্তর একটাই। কেন-গুলোকে তৈরি রাখা হয়েছে নির্বাচনী রাজনীতির জন্য। নির্বাচনে জয়ের সম্ভাবনা না থাকলে এই কেন-গুলোকে ব্যবহার করা হয়। তা-ও আবার আদালতের ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে এই কূটকৌশলের আশ্রয় নেওয়া হয়।
আসলে আইনি জটিলতা তৈরি করেছে সরকার। জনগণ এটার জন্য দায়ী নয়। তাহলে সরকারের দায়িত্বহীনতা ও ব্যর্থতার দায় জনগণ কেন নেবে? সর্বশেষ ঢাকা সিটি করপোরেশনের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০০২ সালে। মেয়াদ শেষ হয়েছিল ২০০৭ সালের মে মাসে। এরপরও ছয় বছর ধরে নির্বাচন হয় না ঢাকা সিটি করপোরেশনের। দেশের সব কটি সিটি করপোরেশনে নির্বাচন অনুষ্ঠান করতে পারলেও নির্বাচন কমিশন কেন জানি ঢাকার ক্ষেত্রে ভয় পাচ্ছে। একাধিকবার ঘোষণা দিয়েও তারা বার বার পিছু হটছে।
স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইন, ২০০৯-এর ৩৪ ধারার ১(খ) উপধারা অনুসারে মেয়াদ শেষ হওয়ার পূর্ববর্তী ১৮০ দিনের মধ্যে সিটি করপোরেশনের নির্বাচনের বিধান রয়েছে। ফলে সেপ্টেম্বর এবং অক্টোবরের মধ্যে পর্যায়ক্রমে রাজশাহী, সিলেট, খুলনা ও বরিশাল সিটি করপোরেশনের নির্বাচন শেষ করলে আইনগত কোনো বাধা থাকত না। কিন্তু স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের তাগাদার কারণে আগাম নির্বাচন দিচ্ছে ওই চারটি সিটি করপোরেশনে। অথচ ঢাকা সিটি করপোরেশনের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর ছয় বছর পেরিয়ে গেলেও এ ব্যাপারে নির্বাচন কমিশনের কার্যক্রম হতাশাজনক। কয়েক দফা লোক দেখানো নির্বাচনের উদ্যোগ নিলেও শেষ পর্যন্ত তা সম্পন্ন করেনি।
সামনেই জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এমন সময় ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীর পরাজয় হলে সারা দেশে তার প্রভাব পড়বে। তাই আপাতত এসিড টেস্ট হিসেবে ঢাকার পাশেই গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচন দিচ্ছে সরকার। নির্বাচিত নয়, এই অজুহাতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল করলেও বছর ধরে অনির্বাচিত প্রশাসক দিয়ে চলছে ডিসিসি। নির্বাচিত মেয়র সাদেক হোসেন খোকাকে রেখে কেন নির্বাচন করা হয়নি? জেলা পরিষদগুলো কেন অনির্বাচিত দলীয় প্রশাসক দিয়ে চালানো হচ্ছে। দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে কেন ছাত্র সংসদের নির্বাচন দেওয়া হচ্ছে না? মন্ত্রীদের উপরে খবরদারির জন্য অনির্বাচিত উপদেষ্টাদের দিয়ে কেন মন্ত্রণালয়গুলো চালানো হচ্ছে?
১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীতে ১১৭ক অনুচ্ছেদ যোগ করে একটি মাত্র দল রেখে সব রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করা হয়। দেশের প্রথম অনির্বাচিত সরকারেরও জন্ম হয় তখন। চতুর্থ সংশোধনীর ৩৩ দফায় কোনো ধরনের নির্বাচন ছাড়াই সে সময়ের সব সংসদ সদস্যকে পরবর্তী পাঁচ বছরের জন্য নির্বাচিত ঘোষণা করা হয়। চতুর্থ সংশোধনীর ৩৪ দফায় কোনো ধরনের নির্বাচন ছাড়াই আজীবনের জন্য রাষ্ট্রপতি করা হয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। তাই অযথা নির্বাচন না করে বছরের পর বছর ক্ষমতায় থাকার বিধান যখন এ দেশে করা সম্ভব, তখন সরকার কেনইবা নির্বাচন দিতে যাবে? বর্তমান সংবিধানের ৫৭(৩) অনুচ্ছেদের বিধান মতে প্রধানমন্ত্রীর পদের মেয়াদের কোনো সীমা বলা নেই। প্রধানমন্ত্রীর উত্তরাধিকারী কার্যভার গ্রহণ না করা পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীকে স্বীয় পদে বহাল থাকার বিধান রয়েছে সংবিধানের এই অনুচ্ছেদে। তাই সীমানা নির্ধারণসহ যে কোনো আইনি জটিলতার অজুহাতে যদি জাতীয় নির্বাচনও ডিসিসির মতো বছরের পর বছর ঝুলে থাকে তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। আর যেহেতু উত্তরাধিকারী কার্যভার গ্রহণ না করা পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীকে স্বীয় পদে বহাল থাকার সুযোগ রাখা হয়েছে সংবিধানে, তাই অনায়াসে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী কোনো নির্বাচন ছাড়াই ক্ষমতায় থাকতে পারেন। তা-ও আবার সম্পূর্ণ সাংবিধানিকভাবেই। শুধু ডিসিসির মতো একই প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। ইতোমধ্যে সংসদের বিভিন্ন আসনের সীমানা পুনঃনির্ধারণ নিয়ে আইনি বাহাস চলছে দীর্ঘদিন ধরে। সরকারি দলের এমপিরা পর্যন্ত সংক্ষুব্ধ এই সীমানা নিয়ে। তাই ফর্মুলা যখন কাকতালীয়ভাবেই মিলে যাচ্ছে, তাতে সন্দেহ হলে দোষের কি?
লেখক : সংবিধান বিশেষজ্ঞ

সর্বশেষ খবর

আজকের ছবি

www.facebook.com

Tag Cloud