May 26, 2026

ঢাকা: মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জরা/অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা…। শুদ্ধ সুন্দর এ প্রার্থনার মধ্য দিয়ে আজ নতুন বছর শুরু করবে বাঙালি।
শোক-তাপ-বেদনা-অপ্রাপ্তি-আক্ষেপ ভুলে অপার সম্ভাবনার দিকে এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ। অন্ধকার ঠেলে, সকল ভয় জয় করার মানসে নতুন করে জেগে উঠবে।
১৪২১। স্বাগত ১৪২২ বঙ্গাব্দ। আজ শুধু উৎসব নয়, সমাজের সকল অন্যায়-অসাম্য-সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে জ্বলে ওঠার নতুন শপথ নেয়ার দিন।
বছরের সব অপ্রাপ্তি ভুলে গিয়ে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচনের লগ্নে একটি আত্মমর্যাদাসম্পন্ন অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক ও সুখী-সমৃদ্ধ দেশ গড়ার প্রত্যয় নিয়েই মঙ্গলবার বাঙালি পালন করবে সার্বজনীন এ উৎসব। নতুন বছরে নবচেতনায় উদ্বুদ্ধ জাতি আরও সোচ্চার হবে প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে।
সঙ্গে সবচেয়ে নিবিঢ় সম্পর্ক কৃষির। এ সম্পর্কের সূত্রেই বাংলা সাল প্রবর্তন করেন সম্রাট আকবর। তাঁর আমলেই প্রবর্তন হয় বাংলা সাল। এখন তা বঙ্গাব্দ নামে পরিচিত। বৈশাখ নামটি নেয়া হয়েছিল নক্ষত্র বিশাখার নাম থেকে। কালের বিবর্তনে নববর্ষের সঙ্গে সম্পর্কিত অনেক পুরনো আচার অনুষ্ঠানের বিলুপ্তি ঘটেছে। আবার যুক্ত হয়েছে অনেক নতুন আয়োজন।
প্রথম দিনে হালখাতার প্রচলন এখনও হারিয়ে যায়নি। আগের মতো হালখাতার আয়োজন না থাকলেও গ্রামে এখনও এর প্রচলন আছে। রাজধানীর পুরান ঢাকায়ও হালখাতার আয়োজন দৃশ্য চোখে পড়ে।
প্রথম এ দিন দেশের বিভিন্ন জেলা শহরেও বসছে বৈশাখী মেলা। গ্রামবাংলার বৈশাখী মেলা শহরাঞ্চলেও সম্প্রসারিত হয়েছে। তবে বৈশাখী মেলায় গ্রামীণ ঐতিহ্যের সঙ্গে এখন মিশেছে আধুনিকতা।
বটমূলে ষাট দশকে বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনার নবউন্মেষকালে ছায়ানট সেই যে কাকডাকা ভোরে নববর্ষকে আবাহনী গান গেয়ে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন করেছিল, সেটি আজ রাজধানীবাসীর সবচেয়ে বড় আকর্ষণ। পহেলা বৈশাখ রমনায় পালন করতে ঢাকাবাসী ছাড়াও দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকেই লোকজন জড়ো হয়। মঙ্গলবার সব পথ মিশে যাবে রমনায় এসে।
পরিচিতি বটমূল হলেও প্রকৃত পক্ষে যে গাছের ছায?ায? মঞ্চ তৈরি হয? সেটি বট গাছ নয?, অশ্বত্থ গাছ । ১৯৬০-এর দশকে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর নিপীড?ন ও সাংস্কৃতিক সন্ত্রাসের প্রতিবাদে ১৯৬৭ সাল থেকে ছায?ানটের এই বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের সূচনা।
এই প্রাণের উৎসবকে ঘিরে রমনা পার্কসহ বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার পুরোটাই এ উপলক্ষে সারাদেশই নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
প্রথম দিনে বদলে যাবে রাজধানী ঢাকার দৃশ্যপট। ভোর সোয়া ছ’টায় রমনার বটমূলে ছায়ানটের প্রভাতী অনুষ্ঠানে ভোরের সুর তুলে শুরু হবে বর্ষবরণের আনুষ্ঠানিকতা। এর সঙ্গে সঙ্গেই রমনার বটমূল থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা, ধানমন্ডির লেকের পাড়, সংসদ ভবনসহ শেরেবাংলা নগর, গুলশান, বনানী, উত্তরা, মিরপুর, যাত্রাবাড়ী, অর্থাৎ এক কথায় পুরো রাজধানীই বৈশাখী আমেজে মেতে উঠবে। কাকডাকা ভোর থেকেই নগরীর পথে ঢল নামবে বাঙালি সংস্কৃতি লালনকারী আনন্দপিয়াসী নগরবাসীর। সবার পরনেই থাকবে বৈশাখী রং লাল-সাদার পাশাপাশি অন্যান্য রঙের বাহারি নকশার পোশাক।
অভিজাত রেস্টুরেন্টগুলো এবং রমনা ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের আশপাশে ভ্রাম্যমাণ রেস্টুরেন্টে থাকবে ইলিশ-পান্তার আয়োজন। বাসাবাড়িতে তৈরি হবে বাঙালি খাবার।
ধরে পান্তা-ইলিশ পহেলা বৈশাখ উৎসবের প্রধান অনুষঙ্গে পরিণত হলেও এবার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ বিভিন্ন বৈশাখের সঙ্গে ইলিশের যোগসূত্র নেই। কে অনুপ্রবেশ হিসেবে দেখছেন তারা। বাঙালি সংস্কৃতি ও ইতিহাস-ঐতিহ্য জানাশোনা সম্পর্ক থাকলেও ইলিশ খেয়ে বর্ষবরণের ইতিহাস বাঙালি ঐতিহ্যে নেই।
উপলক্ষে ১৪ এপ্রিল (মঙ্গলবার) সরকারি ছুটির দিন। দেশের শীর্ষ অনলাইন সংবাদপত্র, মুদ্রিত জাতীয় সংবাদপত্রগুলো বাংলা নববর্ষের বিশেষ দিক তুলে ধরে ক্রোড়পত্র বের করবে। সরকারি ও বেসরকারি টিভি চ্যানেলে নববর্ষকে ঘিরে বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানমালা প্রচার করা হবে।
বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিশেষ বাণী দিয়েছেন।
বাণীতে অতীতের সব গ্লানি ও বিভেদ ভুলে বাংলা নববর্ষে জাতীয় জীবনের সর্বক্ষেত্রে ঐক্য ও সংহতি আরও সুদৃঢ় করবে এবং অফুরন্ত আনন্দের বার্তা বয়ে আনবে বলে বাংলা নববর্ষে প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন। নববর্ষের এই আনন্দঘন দিনে রাষ্ট্রপতি দেশবাসীকে বাংলা নববর্ষের শুভেচ্ছা জানিয়ে বলেন, ‘আজ পহেলা বৈশাখ, ১৪২২ বঙ্গাব্দ। শুভ নববর্ষ।’
উপলক্ষে দেশবাসী ও ‘আমি আশা করি, পহেলা বৈশাখে বাঙালি সংস্কৃতির এ চর্চা আমাদের জাতিসত্ত্বাকে আরও বিকশিত করবে। সাম্প্রদায়িকতা, ধর্মান্ধতা, জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার শক্তি যোগাবে। রাজনীতির নামে আগুনে পুড়িয়ে নিরীহ মানুষ হত্যা ও দেশের সম্পদ ধ্বংসকারী অপশক্তির বিরুদ্ধে আমাদের আরও ঐক্যবদ্ধ করবে।’
নেতা রওশন এরশাদ, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া দেশবাসীকে বৈশাখের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন।
নানা আয়োজন
বর্ষবরণে রাজধানী জুড়ে থাকবে নানা আয়োজন। দিনের প্রথম প্রভাতেই রমনার বটমূলের ঐতিহ্যবাহী সংগঠন ছায়ানট ভোরের সূর্যের আলো দেখার সঙ্গে সঙ্গেই ভোর সোয়া ছ’টায় শুরু করবে বর্ষবরণের আনুষ্ঠানিকতা। এরপর ছায়ানটের দু’ঘণ্টার আয়োজনে রবীন্দ্রসঙ্গীত ছাড়াও, নজরুল, লালন, সলিল চৌধুরী ও রশিদউদ্দীনের গানের একক ও দলগত পরিবেশনা ছাড়াও থাকবে পাঠ ও আবৃত্তির পরিবেশনা। শেষে দেশের সাম্প্রতিক সময় ও এর পরিবেশ তুলে ধরে বক্তৃতা দেবেন ছায়ানট সভাপতি ড. সনজীদা খাতুন।
শিক্ষার্থীরা সকাল সাড়ে নয়টায় বের করবে মঙ্গল শোভাযাত্রা। এবারের মঙ্গল শোভাযাত্রার মূল প্রতিপাদ্য নির্বাচন করা হয়েছে-‘অনেক আলো জ্বালতে হবে মনের অন্ধকারে’। অসাম্প্রদায়িক চেতনার মানুষদের মাঝে তার স্বরূপ তুলে ধরতেই এবার মঙ্গল শোভাযাত্রায় ২৫ ফুট উঁচু ‘হাতের পাঞ্জা’র একটি ভাস্কর্য স্থান পাচ্ছে। মৌলবাদী শক্তি যেভাবে অসাম্প্রদায়িক নিরীহ সাধারণ মানুষের গলা টিপে ধরছে, তা তুলে ধরা হয়েছে এ ভাস্কর্যের মাধ্যমে।
শোভাযাত্রায় ২৮ ফুট উচু টেপা পুতুল থাকবে, যার এক কোলে কলসি ও অন্য কোলে দেখা যাবে এক শিশু।
সাংস্কৃতিক জোট পহেলা বৈশাখের দিন বিকাল ৪টায় ধানমন্ডির রবীন্দ্র সরোবরে একক ও দলীয় লোকসঙ্গীত, নৃত্য ও আবৃত্তিসহ নানা আয়োজন করবে। বাংলা একাডেমি সকাল ৮টায় একাডেমির নজরুল মঞ্চে বর্ষবরণের সঙ্গীত দিয়ে দিবসটি উদযাপন করবে।
বাংলা বিভাগ ও বাংলা অ্যালামনাই যৌথভাবে চৈত্র সংক্রান্তি-১৪২১ এবং বর্ষবরণ- ১৪২২ উপলক্ষে দু’দিনব্যাপী বিশেষ অনুষ্ঠান আয়োজন করেছে। চৈত্র সংক্রান্তি অনুষ্ঠান সোমবার সন্ধ্যা ৬টায় বাংলা বিভাগের করিডোরে অনুষ্ঠিত হয়েছে। বর্ষবরণের অনুষ্ঠান মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১০টায় কলাভবনের সম্মুখস্থ সবুজ চত্বরে অনুষ্ঠিত হবে।
সংগঠন ও প্রতিষ্ঠান নতুন বছরকে নানা আয়োজনে পালন করবে।