May 4, 2026
নিউজ ডেস্ক: সোনালী ব্যাংকের সার্ভারে ভয়াবহ বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। এ কারণে সারা দেশে ব্যাংকটির এক হাজার ২০৭টি শাখার মধ্যে ৫০২টি শাখায় সব ধরনের লেনদেন বন্ধ হয়ে গেছে। সরকারের ট্রেজারি ব্যাংক হওয়ায় সংশ্লিষ্ট এলাকায় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড স্থবির হয়ে পড়েছে। এতে লেনদেন করতে না পারায় এসব শাখার লাখ লাখ গ্রাহক ভোগান্তির মুখে পড়েছেন। পেনশনভোগী, মুক্তিযোদ্ধা, ব্যবসায়ী, সাধারণ জনসাধারণ, আইএমই গ্রাহকেরা টাকা না পেয়ে হতাশ হয়ে ফিরে যাচ্ছেন। লেনদেন বন্ধ হয়ে পড়ায় নানামুখী সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে। সরকারি অফিস আদালতেও লেনদেন নিয়ে সমস্যা হচ্ছে। শুধু গ্রাহকেরাই ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন না, এসব শাখার কর্মকর্তারাও ভোগান্তিতে পড়েছেন। গ্রাহকদের চাহিদা পূরণ করতে না পারায় নানা কথা শুনতে হচ্ছে, লেনদেন করতে না পারায় অনেক গ্রাহক চড়াও হচ্ছেন কর্মকর্তাদের ওপর। পাশাপাশি ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা রাত ১০টা পর্যন্ত অফিস করছেন সার্ভার ঠিক হওয়ার অপেক্ষায়। সার্ভার বিকল হওয়ার বিষয়ে সোনালী ব্যাংকের আইটি শাখার উপমহাব্যবস্থাপক শামীমুল হক আজ বুধবার বিকেলে নয়া দিগন্তকে জানান, সোনালী ব্যাংকের লেনদেন অধিকতর তদারকি করতে সার্ভার কেন্দ্রীভূত করা হচ্ছে। চালু করা হয়েছে কোর ব্যাংকিং সিস্টেম। নতুন একটি প্রযুক্তি চালু করাতে গত কয়েক দিন কোনো কোনো জায়গায় সমস্যা হয়েছে। তবে গতকাল বিকেল থেকে তা পুরোপুরি সচল হয়েছে। এখন আর কোথাও সমস্যা হচ্ছে না বলে তিনি দাবি করেন। জানা গেছে, সোনালী ব্যাংক আগে শাখাভিত্তিক ব্যাংকিং করত। অর্থাৎ সারা দিন লেনদেন শেষে সন্ধ্যায় সারা দিনের লেনদেনের তথ্য প্রধান অফিসকে জানানো হতো। এর ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক শাখা ব্যবস্থাপকদের তথ্যের ওপরই নির্ভর করতে হতো। আর কোর ব্যাংকিং সিস্টেম চালু হওয়ায় প্রতিটি লেনদেনের তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে কেন্দ্রীয় অফিস জানতে পারবে। এ জন্য কেন্দ্রীয় অফিস সার্ভার নিয়ন্ত্রণ করবে। কেন্দ্রীয়ভাবে সার্ভার চালু করতে গিয়েই বিপত্তির মুখে পড়ে সোনালী ব্যাংক। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ৩১ ডিসেম্বর থেকে সার্ভার ডাউন হতে থাকে বিভিন্ন শাখায়। ২ জানুয়ারি থেকে তা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। গতকাল বিকেল ৪টা পর্যন্ত সব ধরনের লেনদেন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে সোনালী ব্যাংকের একটি থানার শাখা ব্যবস্থাপক গতকাল নয়া দিগন্তকে জানান, গত সাত দিন ধরে তারা রীতিমতো দোজখের মধ্যে কাটিয়েছেন। গ্রাহক আসছেন টাকা জমা দিতে, কেউ আসছেন প্রয়োজনে টাকা উত্তোলন করতে; কিন্তু কোনো লেনদেনই করতে তারা পারছেন না। অনেকেই মারমুখী হচ্ছেন। এই তো সার্ভার সচল হবে, এ কথা বলে সান্ত্বনা দেয়া হচ্ছে গ্রাহকদের। কিন্তু ক’দিন আর সান্ত্বনা দিয়ে রাখা যায়। এভাবেই তারা করছেন দিনাতিপাত। ৫টায় অফিস ছুটি হয়, কিন্তু সার্ভার সচল হওয়ার অপেক্ষায় রাত ১০-১১টা পর্যন্ত অফিসে থাকতে হয়। শীতের রাতে পোহাতে হচ্ছে ভোগান্তি। জানা গেছে, সরকারের ট্যাক্স আদায় থেকে শুরু করে প্রায় সব ধরনের কার্যক্রম বেশিরভাগ সম্পন্ন হয় সোনালী ব্যাংকের মাধ্যমে। সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারীদের বেতন ভাতা, পেনশনভোগী, মুক্তিযোদ্ধা ভাতা, বিধবা ভাতাসহ বেশিরভাগ সেবামূলক কার্যক্রম হয় এ ব্যাংকের মাধ্যমে। এর বাইরে প্রত্যন্ত অঞ্চলে শাখা থাকায় ব্যবসায়ী ও সাধারণ গ্রাহকেরা এই ব্যাংকের মাধ্যমে লেনদেন করে থাকে। এমন একটি ব্যাংকের পাঁচ শতাধিক শাখার লেনদেন বন্ধ হয়ে পড়ায় কার্যত সব কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে। আমাদের বিভিন্ন জেলা থেকে প্রতিনিধিরা সোনালী ব্যাংকের শাখা বন্ধ থাকায় সাধারণ গ্রাহকদের ভোগান্তির চিত্র তুলে ধরেছেন। আমাদের রাজবাড়ী জেলার বালিয়াকান্দি সংবাদদাতা সোহেল রানা জানান, রাজবাড়ী জেলার চারটি উপজেলায় সার্ভার বিকল হওয়ায় সোনালী ব্যাংকের সব লেনদেন এক সপ্তাহ ধরে বন্ধ হয়ে পড়েছে। এতে চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন গ্রাহকেরা। জানা গেছে, জেলার বালিয়াকান্দি, কালুখালী, গোয়ালন্দ ও পাংশা সোনালী ব্যাংক শাখায় ৩১ ডিসেম্বর থেকে সার্ভারে সমস্যা দেখা দেয়। বালিয়াকান্দি সোনালী ব্যাংক শাখার ব্যবস্থাপক মো: আবু দাউদ হোসেন জানান, এ ব্যাংকে ১৬ হাজার অ্যাকাউন্ট ধারী রয়েছে। নিয়মিত লেনদেন করে ৯ হাজার গ্রাহক। ৩১ ডিসেম্বর থেকে সার্ভার সমস্যার কারণে লেনদেন করতে পারছি না। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানানো হয়েছে। আশা করি দ্রুতই এ সমস্যার সমাধান হবে। আমাদের রাজবাড়ী জেলার গোয়ালন্দ সংবাদদাতা মেহেদুল হাসান আক্কাছ জানিয়েছেন, সাত দিন ধরে অনলাইন ত্রুটির কারণে সোনালী ব্যাংকের গোয়ালন্দ উপজেলা কমপ্লেক্স শাখার কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। সোনারগাঁও (নারায়ণগঞ্জ) সংবাদদাতা হাসান মাহমুদ রিপন জানান, নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁওয়ে সোনালী ব্যাংকের সোনারগাঁও শাখায় চার দিন ধরে লেনদেন বন্ধ রয়েছে। ফলে গ্রাহকেরা টাকা উত্তোলন করতে না পেরে হতাশায় ভুগছেন। ব্যাংক হিসাব থেকে টাকা উত্তোলন করতে না পেরে অনেক গ্রাহক, সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা তাদের ছেলেমেয়েদের স্কুলে ভর্তি পর্যন্ত করতে পারছে না বলে অভিযোগ তুলেছেন। এ সমস্যা সমাধানে কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করছে না বলে ব্যাংক ব্যবস্থাপককে দোষারোপ করেছেন গ্রাহকেরা। সোনালী ব্যাংক সোনারগাঁও শাখার ব্যবস্থাপক জাহাঙ্গীর হোসেন গতকাল বিকেল ৪টার পর সফটওয়্যারের যান্ত্রিক ত্রুটি সমাধান হয়েছে বলে জানালেও গ্রাহকেরা টাকা উত্তোলন করতে পারছেন না বলে জানিয়েছেন। সোনারগাঁও পৌরসভার সচিব সামসুল আলম জানান, সোনারগাঁও পৌরসভার কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের ব্যাংক হিসাব সোনালী ব্যাংক সোনারগাঁও শাখায় রয়েছে। সোনারগাঁও পৌরসভার কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা গত তিন দিন ধরে তাদের হিসাব থেকে বেতনের টাকা উত্তোলনের জন্য ব্যাংকের যাওয়া-আসা করছেন। টাকা উত্তোলন করতে না পেরে সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এক শিক্ষক জানান, আজকের মধ্যে আমাদের বেতন উত্তোলন করতে না পারলে সব শিক্ষককে একত্রিত করে বিক্ষোভ মিছিল বের করব। কাউখালী (পিরোজপুর) সংবাদদাতা সৈয়দ বশির আহম্মেদ জানান, বেতনভাতা তুলতে না পেরে আর্থিকভাবে চরম সঙ্কটে পড়েছেন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। দেখা দিয়েছে গ্রাহকদের মধ্যে ক্ষোভ ও অসন্তোষ। কবে নাগাদ এ সমস্যার সমাধান হবে কেউ তা বলতে পারছেন না। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সাথে ব্যাংকের এ শাখা থেকে যোগাযোগ করা হলে তারা বারবার ধৈর্য্য ধরতে বলেন। মাসের প্রথমদিকে এক থেকে দেড় হাজার গ্রাহক প্রতিদিন বেতনের টাকা তুলতে আসেন। কিন্তু এ সপ্তাহে টাকা তোলার চেক জমা দিয়ে পোস্টিং না হওয়ায় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, বেসরকারি স্কুল, কলেজ ও মাদরাসার শিকক্ষ-কর্মচারীরা টাকা নিতে না পেরে ফিরে যাচ্ছেন। এ দিকে বিকাশ গ্রাহকেরাও ভোগান্তিতে পড়েছেন। জানা যায়, বিকাশের বিটুবির টাকা পিরোজপুর বিকাশ অফিস থেকে সোনালী ব্যাংকের মাধ্যমে অনলাইনে টাকা না পাঠাতে পেরে টাকা শূন্য হয়ে পড়েছে কাউখালীর বিকাশ এজেন্টগুলো। বিকাশের গ্রাহকেরা টাকা ক্যাশ আউট করার জন্য বিভিন্ন এজেন্টদের কাছে ঘুরে বেড়াচ্ছেন।
নয়াদিগন্ত