April 30, 2026
নিজস্ব প্রতিবেদক: মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় বাগেরহাটের সিরাজ মাস্টার(কসাই সিরাজ) ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদ- ও , খান আকরাম হোসেনকে আমৃত্যু কারাদ-ের আদেশ দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল।
মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিমের নেতৃত্বাধীন ৩ সদস্যর বেঞ্চ এ আদেশ দেন। বেঞ্চের অপর দুই সদস্য হলেন, বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন সেলিম ও বিচারপতি আনোয়ারুল হক।
রায় ঘোষণার সময় আদালতে চিফ প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট গোলাম আরিফ টিপু, সৈয়দ হায়দার আলী, জেয়াদ আল মালুম, সায়েদুল হক সুমন উপস্থিত ছিলেন।
সিরাজ মাস্টারের পক্ষে ছিলেন রাষ্ট্র নিযুক্ত আইনজীবী আবুল হাসান ও খান আকরামের পক্ষে ব্যারিস্টার সারোয়ার হোসেন উপস্থিত ছিলেন। সকাল ১১ টা ৫ মিনিটে রায় পড়া শুরু হয়।
মোট ১৩৩ পৃষ্টা রায়ের প্রথমাংশ পাঠ করেন সদস্য বিচারপতি বিচারপতি আনোয়ারুল হক। দ্বিতীয়াংশ পাঠ করেন অপর সদস্য বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন। রায়ের মূল অংশ পাঠ করেন চেয়ারম্যান বিচারপতি এম.ইনায়েতুর রহিম।
এর আগে সকাল সাড়ে ৮ টার দিকে এই দুইজনকে কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে পুলিশি প্রহরায় ট্রাইব্যুনালে নিয়ে আসা হয়।
গত ৫ আগস্ট সিরাজ মাস্টার(কসাই সিরাজ)ও খান আকরাম হোসেনের বিরুদ্ধে রায় ঘোষণার জন্য আজকের দিন ধার্যে করেছিলেন ট্রাইব্যুনাল।
এ মামলার তিনজন আসামির মধ্যে আব্দুল লতিফ তালুকদার গত ২৮ জুলাই অসুস্থতাজনিত কারণে মারা যান।
লতিফ তালুকদারের মৃত্যু হওয়ায় তার মামলার কার্যক্রমও সমাপ্ত ঘোষণা করা হয় এদিন।
গত ২৩ জুন উভয়পক্ষের চূড়ান্ত যুক্তি উপস্থাপন শেষে মামলাটি রায় ঘোষণার জন্য অপেক্ষামাণ রাখা হয়।
আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট সৈয়দ হায়দার আলী ও ব্যারিস্টার সায়েদুল হক সুমন চূড়ান্ত যুক্তি উপস্থাপন করেন।
সিরাজ মাষ্টারের পক্ষে রাষ্ট্র নিযুক্ত আইনজীবী আবুল হাসান ও খান আকরাম হোসেন ও লতিফ তালুকদারের পক্ষে ব্যারিস্টার মীর সারোয়ার হোসেন চূড়ান্ত যুক্তি উপস্থাপন করেন।
গত ২১ জুন অভিযোগের উপর যুক্তি উপস্থাপন শেষ করেন আসামিপক্ষ।
গত ১৫ জুন আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে যুক্তি উপস্থাপন শুরু করেন ব্যারিস্টার সায়েদুল হক সুমন। গত ২৯ মার্চ রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়। গত বছরের ৫ নভেম্বর তিন জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন ট্রাইব্যুনাল।
যত অভিযোগ: মানবতাবিরোধী অপরাধে সিরাজ মাস্টার, আব্দুল লতিফ ও খান আকরামের বিরুদ্ধে হত্যা,ধর্ষণ ও অগ্নিসংযোগের মোট ৭ অভিযোগ আনে রাষ্ট্রপক্ষ। অভিযোগগুলো হল:
অভিযোগ ১: গণহত্যা, হত্যা, লুটপাট এবং অগ্নিসংযোগঃ ১৯৭১ সালের ১৩ মে ততকালীন বাগেরহাট মহকুমার রাজাকার বাহিনীর ডেপুটি কমা-ার সিরাজ মাস্টারের নেতৃত্বে রজব আলী ফক্রি এবং ৫০/৬০ জন রাজাকার বাগেরহাট জেলার রঞ্জিতপুর গ্রামে হামলা চালিয়ে বাড়িঘর লুট এবং অগ্নিসংযোগ। এসময় হিন্দু সম্প্রদায়ের ৪০-৫০ জন নিরীহ নিরস্ত্র মানুষকে হত্যা।
অভিযোগ ২: গণহত্যা, হত্যা, লুটপাট এবং অগ্নিসংযোগঃ বাগেরহাট জেলার রামপাল থানার ডাকরার কালীমন্দিরে ভারতের শরণার্থী শিবিরে যাওয়ার উদ্দেশ্যে জড়ো হয় হিন্দু সম্প্রদায়ের দুই-তিন হাজার লোক। ১৯৭১ সালের ২১ মে বেলা ৩টা থেকে ৫টা পর্যন্ত ততকালীন বাগেরহাট মহকুমার রাজাকার বাহিনীর ডেপুটি কমা-ার সিরাজ মাস্টারের নেতৃত্বে রজব আলী ফক্রি এবং ৫০/৬০ জন রাজাকার তাদের ওপর সশস্ত্র হামলা চালিয়ে ৬০০-৭০০ জনকে হত্যা করা হয়। এছাড়া ডাকরা গ্রামে হামলা চালিয়ে বাড়িঘর লুট এবং অগ্নিসংযোগ।
অভিযোগ ৩: হত্যা, অপহরণ, আটক এবং নির্যাতনঃ ১৯৭১ সালের ১৮ জুন সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সদর থানার বেসরগাতী, কান্দাপাড়া এলাকায় ততকালীন বাগেরহাট মহকুমার রাজাকার বাহিনীর ডেপুটি কমা-ার সিরাজ মাস্টারের নেতৃত্বে ২০/২৫ জন পাক সেনা এবং ৩০/৩৫ জন রাজাকার হামলা চালিয়ে ২০ জন নিরীহ নিরস্ত্র লোককে অপহরণ, আটক, নির্যাতন, ও পরে ১৯ জনকে হত্যা করা হয়।
অভিযোগ ৪: অপহরণ এবং হত্যাঃ ১৯৭১ সালের ১৪ অক্টোবর সকাল ১০টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত ততকালীন বাগেরহাট মহকুমার রাজাকার বাহিনীর ডেপুটি কমা-ার সিরাজ মাস্টারের নেতৃত্বে ১০০/১৫০ জন রাজাকার সদর থানার চূলকাঠি বাজার, চূলকাঠি, ঘনশেম্পুর এবং এর পার্শ্ববর্তি এলাকায় হামলা চালিয়ে ৪২টি বাড়ি লুট ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। এসময় সাতজন নিরস্ত্র মানুষকে আটক এবং নির্যাতন করে হত্যা করা হয়।
অভিযোগ ৫: অপহরণ এবং হত্যাঃ ১৯৭১ সালের ৫ নভেম্বর দুপুর ৩টায় সিরাজ মাস্টার, খান আকরাম এবং লতিফ তালুকদার এবং ৫০/৬০ জন রাজাকার কচুয়া থানার শাখারিকাঠি বাজারে হামলা চালিয়ে ৪০জন হিন্দুসহ ৪২ জনকে আটক, নির্যাতন ও পরে গুলি করে এবং বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করা হয়। এসময় অনেক বাড়ির মালামাল লুট ও অগ্নিসংযোগ করা হয়।
অভিযোগ ৬: অপহরণ এবং হত্যাঃ ১৯৭১ সালের ২২ অক্টোবর সকাল ১০টা থেকে বিকাল আনুমানিক ৫টা পর্যন্ত সিরাজ মাস্টার, খান আকরাম এবং লতিফ তালুকদার টেংরাখালি গ্রাম থেকে সতিশ চন্দ্র ম-ল, কচুয়া গ্রাম থেকে বাবু খান, হাজরাখালি গ্রাম থেকে নজ্রুল ইসলাম শেখ, বাড়ুইখালি গ্রাম থেকে মনিন্দ্র নাথ সাহা, চর টেংরাখালি গ্রাম থেকে হাসেম আলি শেখকে আটক ও পরে হত্যা করা হয়।
অভিযোগ ৭: অপহরণ এবং হত্যাঃ ১৯৭১ সালের ১৩ ডিসেম্বর সন্ধ্যা আনুমানিক ৭টায় জেলার মোড়েলগঞ্জ থানার তেলিগাতীতে খান আকরাম এবং লতিফ তালুকদার তাদের সঙ্গীয় রাজাকারদের নিয়ে মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমান শিকদারকে আটক, নির্যাতন ও পরে গুলি করে হত্যা করা হয়।