April 21, 2026
ঢাকা: দেশের জার্সি গায়ে মাঠে ফেরার নিষেধ এখনো কাটেনি; এই অবসরে অটিস্টিক শিশুদের পাশে এসে দাঁড়ালেন দেশসেরা ক্রিকেটার সাকিব আল হাসান, ডাকলেন অন্যদেরও। স্ত্রী উম্মে আহমেদ শিশিরকে সঙ্গে নিয়ে মঙ্গলবার দুপুরে রাজধানীর শ্যামলীতে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন সোসাইটি ফর দ্যা ওয়েলফেয়ার অব অটিস্টিক চিলড্রেন (সোয়াক) কার্যালয়ে আসেন সাকিব। সেখানে তারা অটিস্টিক শিশুদের সঙ্গে প্রায় দেড় ঘণ্টা সময় কাটান; কথা বলেন তাদের অভিভাবকদের সঙ্গে। সোয়াক ভবনের চতুর্থ তলায় কাপড়ে ব্লকের কাজ শিখছিল ১২ বছর বয়সী রিহিন। টেস্ট ক্রিকেটে বিশ্বের সেরা অলরাউন্ডারকে চিনতে পেরেই কপালে হাত ঠেকিয়ে তার লম্বা সালাম। সাকিবও এগিয়ে এসে হাত মেলালেন, পরিচিত হয়ে চাপড়ে দিলেন পিঠ। ছয়তলা এই ভবনের কোথাও অটিস্টিক শিশুদের ছবি আঁকা বা পড়তে শেখানো হচ্ছে, কোথাও আবার চলছে বিভিন্ন প্রশিক্ষ
ণ। অটিস্টিকদের জন্য ফিজিও থেরাপি ও চিকিৎসার ব্যবস্থাও রয়েছে। প্রতিটি তলায় ঘুরে ঘুরে শিশুদের কাজ দেখার পাশাপাশি তাদের বিষয়ে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আনার ওপর গুরুত্ব দিলেন সাকিব। পাঁচ তলায় স্টাডি রুমে এক অটিস্টিক কিশোরকে লিখতে দেখে সাকিব এগিয়ে গেলে ছেলেটির পাশ থেকে তার মা বলে ওঠেন- “দেখতো বাবা কে এসেছে?” সাকিবের দিকে একনজর তাকিয়ে সেই কিশোরের ছোট্ট উত্তর- ‘ক্রিকেট!’এই শিশুদের সঙ্গে সময় কাটিয়ে সাকিবও আপ্লুত। বললেন, “বাচ্চাদের একটু খুশি করতে পেরেছি… তাদের অনেকে আমাকে চিনতেও পেরেছে। এটাই আমার প্রাপ্তি।” বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের নিষেধাজ্ঞার কারণে গত জুলাই থেকে সাকিবের সময় কাটছে মাঠের বাইরে। হাসতে হাসতে তিনি বললেন, “এই দু মাস অনেক ধরনের কাজ করতে পারছি। কোনো খেলোয়াড়ই মাঠের বাইরে থাকতে চায় না। তবে নিষেধাজ্ঞার এই একটা ভালো দিক।”
এই ক্রিকেটার জানালেন, অটিস্টিক শিশুদের নিয়ে কাজ করছে এমন কয়েকটি সংগঠনের সঙ্গে তার নিয়মিত যোগাযোগ আছে। নিজের মনের তাগিদেই তিনি সোয়াকে এসেছেন এই শিশুদের সঙ্গে সময় কাটাতে। “আমি মনে করি সমাজের সকলেরই অটিস্টিকদের পাশে দাঁড়ানো উচিৎ। এটা আমাদের দায়িত্ববোধের মধ্যে পরে।” শৈশবের কোনো পর্যায়ে বুদ্ধিমত্তার স্বাভাবিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হলে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় তাকে বলা হয় অটিজম। এ ধরনের শিশুদের মস্তিষ্কের গঠন হয় অন্যদের চেয়ে আলাদা। ফলে তারা অন্যদের মতো করে নিজের যত্ন নেয়া শেখে না। নিজে নিজে খাওয়া বা টয়লেট করা কিংবা অন্যদের কাছে নিজের প্রয়োজন বা ইচ্ছার কথা প্রকাশ করা শিখতেও তাদের সমস্যা হয়। সাকিব বলেন, “কেউ ইচ্ছা করে অটিস্টিক হয় না। কেউ যেন তাদের ছোট করে না দেখে- এ আশাই করব।” এই শিশুদের নিয়ে যেসব সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়, অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলে তাও শোনেন সাকিব আর শিশির। অটিজম নিয়ে সচেতনতা বাড়ানোর বিষয়ে তাদের সঙ্গে পরামর্শ করেন। ভবনের নিচতলায় সাকিব আর শিশিরকে নিয়ে ছোট্ট আলোচনারও আয়োজন করে সোয়াক কর্তৃপক্ষ। তাদের হাতে তুলে দেয়া হয় সম্মাননাপত্র।
শিশির বলেন, “এখানে এসে আমরা দুজনেই ইমোশোনাল হয়ে গেছি। অ্যাওয়ারনেসের জন্য তো আমরা অনেক কিছু করি। এখন সারা বিশ্বে আইস বাকেট চ্যালেঞ্জ হচ্ছে। এই শিশুদের জন্য সচেতনতা তৈরিতেও এমন কিছু করা যায় কি না ভাবা দরকার।” সোয়াকের প্রোজেক্ট ম্যানেজার মো. মফিজুল ইসলাম জানান, শ্যামলীর এই ভবনে ১১০ জন অটিস্টিককে শিক্ষা, ও প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন তারা। এছাড়া সংগঠনের খরচে শিক্ষা দেয়া হচ্ছে ১৫ জন সুবিধাবঞ্চিত প্রতিবন্ধী শিশুকে। তিনি বলেন, “সাকিবের মতো একজন তারকা আজ এসেছেন। এতে অন্যরাও উৎসাহিত হবেন। এই শিশুদের প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আসবে।” প্রতিষ্ঠানটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান সুবর্ণা চাকমা, সৈয়দা শামীমা আখতারও এ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। সোয়াকের খেলার জায়গায় শিশুদের নিয়ে ক্রিকেট খেলতেও নেমে যেতে চেয়েছিলেন সাকিব। কিন্তু ভিড় বেড়ে যাওয়ায় শেষ পর্যন্ত তা আর হয়নি। আপাতত ১৫ সেপ্টেম্বরের দিতে তাকিয়ে আছেন এই তারকা ক্রিকেটার, ওইদিনই ঘরোয়া ও আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে তার নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ উঠছে। “আমি ফিরে আসতে চাই। আগে যেভাবে দলের জন্য কন্ট্রিবিউট করেছি, ফিরে এসেও ঠিক সেইভাবে কন্ট্রিবিউট করতে চাই। আপনারা দোয়া করবেন।”