February 23, 2026
নাশরাত আর্শিয়ানা চৌধুরী : সরকারের দুর্নীতির শ্বেতপত্র তৈরি হচ্ছে লন্ডনে। ওই শ্বেতপত্রে রয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, শেখ রেহানা, শেখ হাসিনা পুত্র সজিব ওয়াজেদ জয়সহ গত আওয়ামী লীগ সরকারের ও বর্তমান সরকারের টপ শতাধিক মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও এমপির দুর্নীতির তথ্য। বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান ওই দুর্নীতির শ্বেতপত্র তৈরি করাচ্ছেন। এই জন্য কাজ করছে লন্ডনে ও দেশে একাধিক টিম। তারা গোপনেই কাজটি করছেন। তারা দেশ থেকে নানাভাবে তথ্য সংগ্রহ করছেন। তার এই এ্যাসাইনমেন্টে নিয়োজিত সদস্যরা এই সংক্রান্ত সব তথ্য সংগ্রহ করে পাঠিয়ে দিচ্ছে লন্ডনে। দেশে থাকা টিম বিভিন্ন সরকারি দলের মন্ত্রী ও নেতাদের তথ্য সংগ্রহ করে সেই সঙ্গে প্রমাণ সংগ্রহ করে তা পাঠাচ্ছেন। প্রাপ্ত সকল তথ্য সংকলিত করেই সেটা প্রকাশ করা হবে। তারেক রহমানের ঘনিষ্ট একটি সূত্র লন্ডন থেকে এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, দুর্নীতর শ্বেতপত্র প্রকাশ করার জন্য এটি প্রায় তৈরি গেছে। কাজ শেষ। এখন প্রকাশের অপেক্ষায় রয়েছে। সময় অনুকূলে বিবেচনা করে প্রকাশ করা হবে। প্রথমটিতে থাকছে গত আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের প্রধানমন্ত্রী, তার পরিবারের সদস্যদের দুর্নীতির বিষয় ছাড়াও বিভিন্ন মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও এপিএসদের ব্যাপারে তথ্য। প্রধানমন্ত্রীর ওই সময়ের তিনজন প্রভাবশালী উপদেষ্টার দুর্নীতিরও তথ্য রয়েছে। গত সরকারের পাঁচ বছরের শাসনামলকে আলাদা করে একটি শ্বেতপত্র প্রকাশ করা হবে। আর একটি শ্বেতপত্র প্রকাশ করা হবে বর্তমান সরকারের দুর্নীতি নিয়ে। এনিয়ে কাজ চলছে। যে সকল ক্ষেত্রে দুর্নীতি হচ্ছে এর সবগুলো বিষয়ই তারা বের করেছে। এরমধ্যে তারা যে শ্বেতপত্র প্রকাশ করতে যাচ্ছে এরমধ্যে বিদ্যুৎ খাতের ও টেলি যোগাযোগ খাতের বেশি দুর্নীতির তথ্য রয়েছে। কোন মন্ত্রণালয় থেকে কে কি পরিমাণ সম্পদ লুটপাট করেছে, এর সঙ্গে জড়িত কারা তাদের তালিকাও প্রকাশ করা হবে।
তারেক রহমানের ঘনিষ্ট সূত্র জানায়, সরকারের ১০০ জনের বেশি মন্ত্রী প্রতিমন্ত্রী এমপির দুর্নীতির তথ্য লন্ডন থেকে সরকারের বিরুদ্ধে একটি শ্বেতপত্র প্রকাশ করবেন বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তার ঘনিষ্ট একটি সূত্র বলেছে, তার এই শ্বেতপত্রে আওয়ামী লীগ সরকারের বিভিন্ন দুর্নীতির কথা থাকবে।
এদিকে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াও সরকারের দুর্নীতির শ্বেতপত্র প্রকাশ করার কথা নিশ্চিত করেছেন। বাহ্মণবাড়িয়াতে তিনি ভাষণ দেয়ার সময় বলেছেন, সরকারের দুর্নীতির শ্বেতপত্র প্রকাশ করা হবে। আর দুর্নীতির শ্বেতপত্র প্রকাশ করা হলে তারা রেহাই পাবেন না। সরকারের সমলোচনা করেছেন। তিনি তাদেরকে আগাম পাসপোর্ট বানিয়ে রেখে ও ভিসা টিকিট লাগিয়ে রাখারও পরামর্শ দিয়েছেন। সেটা করা না হলে পালাবারও সময় পাবে না বলে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন।
সূত্র জানায়, তারেক রহমান নির্দেশ দিয়েছেন শ্বেতপত্রে এমন কোন তথ্য যাতে না থাকে যেই সব অভিযোগের কোন সত্যতা নেই। যে সব অভিযোগ সত্য ও ওই সব অভিযোগের স্বপক্ষে প্রমাণ ও নথি রয়েছে সেই সব দুর্নীতির তথ্য শ্বেতপত্রে প্রকাশ করা হবে। আর যেগুলোর নথি প্রমাণ এখনো সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি কিন্তু দুর্নীতি হয়েছে ওই সব অভিযোগ রেখে দিয়ে এর স্বপক্ষে প্রমাণ যোগাড় করার জন্যও নির্দেশ দিয়েছেন। প্রয়োজনে পরে হলেও তিনি তা প্রকাশ করবেন। কিন্তু এমন কোন দুর্নীতির শ্বেতপ্রকাশ করতে চান না যাতে করে কোন অভিযোগ মিথ্যে প্রমাণিত হয়। সূত্র জানায়, এই দুর্নীতি প্রকাশ করার জন্য বিভিন্ন স্তরের বিএনপি সমর্থিত কর্মকর্তাদের সহায়তাও পাচ্ছেন তারা।
এদিকে সূত্র জানায়, দুর্নীতির শ্বেতপত্র প্রকাশ করার পাশাপাশি দেশে যে অনিয়ম, অত্যাচার, নির্যাতন, বিভিন্ন নেতা কর্মীদের নামে রাজনৈতিক হয়রানিমূলক মামলা, তাদের উপর নির্যাতন করা হয়েছে সেই সব চিত্র তুলে ধরবেন। পাশাপাশি আলোচিত যে সব হত্যাকান্ডের ঘটনায় সরকারের বিভিন্ন বাহিনীর জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে তাও তুলে ধরবেন। এছাড়াও বিচার বহির্ভুত হত্যাকান্ড, অপহরণ, গুমসহ বিভিন্ন তথ্যও তারা বই আকারে প্রকাশ করবেন।
সূত্র জানায়, বিএনপি আগামীতে ক্ষমতাসীন হতে পারলে দুর্নীতির বিচার করা ছাড়াও যাতে করে বিভিন্ন ঘটনার বিচার করা সম্ভব হয় এই জন্য তারা এখন থেকে সব সংগ্রহে রাখছেন। তারা আশঙ্কা করছেন, সরকার ওই সব নথিপত্র নষ্ট করে ফেলতে পারে। এছাড়াও হত্যা ও গুমের একটি তালিকাও প্রকাশ করবেন তিনি। সূত্র জানায়, শিগগিরই এই শ্বেতপত্র প্রকাশ করা হবে।
সূত্র জানায়, আলোচিত দুর্নীতির ঘটনার মধ্যে ২০০৯-২০১৪ পর্যন্ত বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও মন্ত্রীদের দুর্নীতির চিত্র, গত পাঁচ বছর, চলতি সরকারের নয় মাসে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের দুর্নীতির চিত্র ও হিসাব, শেয়ার বাজারে সিন্ডিকেট করে টাকা হাতিয়ে নেয়ার ঘটনা, ওই ঘটনার পরিকল্পানাকারী ও সুবিধাবাদীদের দুর্নীতির চিত্র, পদ্মাসেতু প্রকল্পের দুর্নীতি, হলমার্ক কর্তৃক সোনালী ব্যাংক থেকে টাকা আতœসাৎ করার ঘটনা, ডেসটিনি কর্তৃক দুর্নীতি, বিসমিল্লাহ গ্র“প কর্তৃক সরকারি ব্যাংক থেকে লুটপাটের ঘটনা, কুইক রেন্টাল কেন্দ্র স্থাপনে দুর্নীতি, রি পাওয়ারিংয়ের দুর্নীতি, বেসিক ব্যাংকসহ বিভিন্ন ব্যাংক থেকে টাকা আতœসাৎ করার ঘটনাসহ বিভিন্ন ব্যাংকের দুর্নীতি এর সঙ্গে সরকারের যেসব মন্ত্রী ও উপদেষ্টা ও সরকারি দলের নেতারা জড়িত তাদের ব্যাপারেও দুর্নীতির তালিকা, এর সঙ্গে জড়িতদের তালিকাও দেয়া হবে শ্বেতপত্রে। এছাড়া এই যাবতকালে বিমানবন্দর ও স্থল বন্দর দিয়ে যে সব টাকা পাচার হয়েছে, যারা কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, অষ্ট্রেলিয়া, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর সহ বিভিন্ন দেশে টাকা পাচার করে সম্পদ গড়েছেন ও সুইস ব্যাংকে টাকা পাচার করেছেন তাদের ব্যাপারেও তথ্য তুলে ধরবেন।
সূত্র জানায়, দুর্নীতির বিভিন্ন চিত্র ছাড়াও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দুর্নীতির চিত্র তুলে ধরা হবে। কি কারণে আইন শৃঙ্খলাবাহিনীর সদস্যরা বিএনপি জামায়াত সহ ২০ দলীয় জোটের নেতা কর্মীদের উপর হামলা করেছে, নির্যাতন করেছে, বিএনপির ইলয়াস আলী সহ বিভিন্ন নেতা কর্মী ও সাধারণ মানুষকে গুম, হত্যা, অপহরণ করেছে, মিথ্যা মামলায় দিয়ে নেতা কর্মীদের আটক রাখে, এই জন্য তাদেরকে নির্দেশ দেয়ার কর্মকর্তা, ও ওই নির্দেশ বাস্তবায়নকারী কর্মকর্তাদের তালিকাও করা হয়েছে। ওই সব কর্মকর্তাদের কারা কি সুবিধা পেয়েছেন সেই ব্যাপারেও তথ্য সংগ্রহ করেছেন। এই সরকারের আমলে নারায়ণগঞ্জের সাতখুনের ঘটনা সহ আলোচিত ও চাঞ্চল্যকর হত্যার নেপথ্যের কাহিনীও প্রকাশ করবে। সেই সঙ্গে সাংবাদিক সাগর রুনীর হত্যাকান্ডের পেছনের খবরও রয়েছে, এরসঙ্গে জড়িতদেরও পরিচয় প্রকাশ করবে, বিএনপি ক্ষমতাসীন হলে তাদের ব্যাপারেও ব্যবস্থা নিবেন। এছাড়াও বিএনপির আন্দোলন চলাকালে বিএনপির নেতা কর্মীদের বাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে যে সব হামলা হয়েছে ওই সব ঘটনারও বিচার করবে। প্রতিষ্ঠানে হামলা এমন ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের একটি তালিকা তারেক রহমানের কাছে পাঠানো হয়েছে বলে জানান লন্ডনে অবস্থানরত বিএনপির এক নেতা।
সূত্র জানায়, বিএনপির নেতা কর্মীদের হয়রানি করে ও আটকে রেখে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা কী পরিমাণ টাকা নিয়েছেন তারও তালিকা তৈরি করা হয়েছে। বেগম খালেদা জিয়াকে বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করার সময় তার সম্মান নষ্ট করার জন্য যেসব কর্মকর্তারা কাজ করেছেন, তাকে অপমান করেছেন ওই সব কর্মকর্তার নামেও তারা তথ্য প্রকাশ করবেন, ওই সব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থাও নিবে ক্ষমতাসীন হতে পারলে। বিচার বিভাগের দুর্নীতি তুলে ধরবেন। এই জন্যও একটি তালিকা করেছেন। মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার ও বিচারের রায়ের ব্যাপারেও তারা তথ্য তুলে ধরবেন। এছাড়াও বিডিআরের ঘটনার পেছনের ব্যক্তিদের পরিচয়ও শ্বেতপত্রে তুলে ধরা হবে। ইন্ধনদাতাদের তালিকাও রয়েছে তাদের হাতে। কেন নাসির উদ্দিন পিন্টুকে আসামি করা হয়েছে সেই ঘটনাও তুলে ধরা হবে। এছাড়াও এই ঘটনার পেছনের ঘটনা তুলে ধরে ওই ঘটনায় যারা বিচারের বাইরে রয়ে গেছে তা তুলে ধরে এই ঘটনায় মামলা করে বিচার করার জন্য চেষ্টা করবে। সেই তথ্যও তুলে ধরবে।
সূত্র জানায়, তারেক রহমান দুর্নীতির যে শ্বেতপত্র প্রকাশ করছেন এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অনেক নেতা, কর্মী, সন্ত্রাসী, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের নাম, অনেকের ভিডিওচিত্র, স্থিরচিত্র এবং কথোপকথনের টেপও সংগ্রহ করিয়েছেন। সেগুলোও প্রকাশ করাবেন। কথোপকথনের টেপগুলা ইউটিউবে ও সামজিক যোগাযোগ নেটওয়ার্কেও ছেড়ে দিবেন। সূত্র জানায়, দুর্নীতির শ্বেতপত্র প্রকাশ করার জন্য তারেক রহমানের নিজস্ব সেল রয়েছে। তারা লন্ডনে কাজ করছেন। দেশে সরকারি কর্মকর্তাদের কেউ কেউ, ব্যাংক কর্মকর্তা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ বিভিন্ন সংস্থার বিএনপি-জামায়াত সমর্থক সদস্যরা, সাংবাদিকদেরও কেউ কেউ কাজ করছেন। তারা ছবি ও ভিডিও দিয়েও সহায়তা করছেন।
বিএনপির সিনিয়র একজন নেতা বলেন, গত সরকার ও এই সরকারের আমলে কত দুর্নীতি হয়েছে এর কোন হিসাব নেই। বিশেষ করে ৫ জানুয়ারির নির্বাচন করার জন্য যে টাকা লেনদেন হয়েছে সেই চিত্রও তারেক রহমান তুলে ধরবেন। ইতোমধ্যে ওই তালিকাও সংগ্রহ করেছেন বলে একটি বিশ্বস্ত সূত্র জানিয়েছে। তিনি জানান, এটা লন্ডন থেকেও প্রকাশ করা হতে পারে। দেশ থেকে প্রকাশ করা হলে যিনি করবেন তিনি সরকারের রোষানলে পড়বেন বিবেচনা করেই এটা করতে চাইছেন। তবে একটি সূত্র জানায়, বিএনপি নির্বাচনে যাওয়ার পথ সুগম হলেই এই দুর্নীতির শ্বেতপত্র প্রকাশ করা হবে। যাতে করে আওয়ামী লীগ নির্বাচনে ভাল করতে না পারে। ক্ষমতাসীন হল দুর্নীতির বিচার করা ছাড়াও এর আগে তারা আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে পরাজিত করার হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করতে চাইছে।