April 18, 2026
নিউজ ডেস্ক: পৌরসভা নির্বাচনে প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র জমা ও বাছাইপর্বেই প্রশ্নের মুখে পড়েছে নির্বাচন কমিশন। ফেনীর তিন পৌরসভায় ‘অস্বাভাবিক কর্মকাণ্ড’ ঘটলেও নির্বাচন কমিশন কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। ক্ষমতাসীন দল এক পৌরসভায় দুজন প্রার্থী মনোনয়ন দেওয়ার পরও বিধি অনুযায়ী কারোরই প্রার্থিতা বাতিল করা হয়নি।
এ ছাড়া বিএনপির মনোনীত প্রার্থী এবং আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র বাতিল করা নিয়েও কমিশনের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষতা রক্ষা না করার অভিযোগ তুলেছেন প্রার্থীরা। কমিশন দাবি করেছে, এসব বিষয়ে সর্বময় ক্ষমতার মালিক রিটার্নিং কর্মকর্তা।
গত শনিবার ও গতকাল রোববার ২৩৪ পৌরসভায় প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র বাছাই করা হয়েছে। প্রথম আলোর নিজস্ব প্রতিবেদক ও জেলা প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্য অনুযায়ী বিএনপির মোট ১০ জন এবং আওয়ামী লীগ-মনোনীত তিনজন মেয়র প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে। এ ছাড়া ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও বিএনপির শতাধিক বিদ্রোহী প্রার্থীর মনোনয়নপত্রও বাতিল হয়েছে। এসব পৌরসভার বেশির ভাগে রিটার্নিং কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) অথবা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও)।
নির্বাচন কমিশনের নিজস্ব জনবল থাকা সত্ত্বেও এবারের নির্বাচনে ১৭৫টি পৌরসভায় অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক ও ইউএনওদের রিটার্নিং কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ৫৯টি পৌরসভায় নির্বাচন কমিশনের নিজস্ব কর্মকর্তাদের রিটার্নিং কর্মকর্তা করা হয়েছে। এ নিয়ে শুরুতেই প্রশ্নের মুখে পড়েছিল কমিশন।
জানতে চাইলে সাবেক নির্বাচন কমিশনার এম সাখাওয়াত হোসেন গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, অতীতেও এমন হয়েছে। প্রশাসনের কর্মকর্তারা কমিশনের নির্দেশ আমলে নিতে চান না। দলের মন্ত্রী-সাংসদদের কথামতো কাজ করেন। এর অন্যতম কারণ সরকার তাঁদের পদোন্নতি দিয়ে থাকে। কমিশনের নিজস্ব কর্মকর্তাদের দিয়ে নির্বাচন করালে এসব ক্ষেত্রে রাশ টানা যেত।
ফেনীতে ৩৪ কাউন্সিলর ও এক মেয়র পদে একজন করে প্রার্থী: ফেনী জেলার তিনটি পৌরসভার ৪৮টি ওয়ার্ডের মধ্যে ৩৩টি ওয়ার্ডে কাউন্সিলর পদে একজন করে প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। স্থানীয় বিএনপি অভিযোগ করেছে, ভয়ভীতি দেখিয়ে তাদের সমর্থিত প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র জমা দিতে দেওয়া হয়নি। তবে তিন পৌরসভায় মেয়র পদে প্রার্থী হতে পেরেছে বিএনপি।
এরপর গত দুই দিনের বাছাইয়ে পরশুরাম পৌরসভায় বিএনপি প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়। ফলে সেখানে এখন আওয়ামী লীগের প্রার্থীই একমাত্র মাঠে আছেন। ফেনী পৌরসভায়ও বিএনপি প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে। তবে সেখানে জাতীয় পার্টির একজন প্রার্থী এখনো আছেন। সর্বশেষ গতকাল ফেনী পৌরসভায় বিএনপি-সমর্থিত একজন কাউন্সিলর প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে। ফলে এই জেলায় এখন একজন মেয়র এবং ৩৪ জন কাউন্সিলর বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার পথে।
সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ফেনী পৌরসভায় ২৪টি কাউন্সিলর পদের মধ্যে ১৭টি, পরশুরাম পৌরসভায় ১২টির মধ্যে ১০টি এবং দাগনভূঞা পৌরসভায় ১২টির মধ্যে ৭টিতে একজন করে কাউন্সিলর প্রার্থী আছেন। এঁদের প্রায় সবাই আওয়ামী লীগ-সমর্থিত।
ফেনীর এই অস্বাভাবিক পরিস্থিতির তথ্য জেনে গত বৃহস্পতিবার বিস্ময় প্রকাশ করেছিলেন নির্বাচন কমিশনার আবদুল মোবারক। তিনি প্রথম আলোকে বলেছিলেন, বিষয়টি কমিশনের বৈঠকে আলোচনা করা হবে।
গতকাল কমিশনের বৈঠকে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হলেও প্রতিকারমূলক কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার মো. শাহ নেওয়াজ প্রথম আলোকে বলেন, ফেনী থেকে একটি অভিযোগও আসেনি। যে কারণে ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। তবে কেউ সংক্ষুব্ধ হলে তিনি আপিল কর্তৃপক্ষ (জেলা প্রশাসক) অথবা আদালতে যেতে পারবেন।
কিন্তু নির্বাচন পরিচালনা বিধিতে বলা আছে, নির্বাচন কমিশনের কাছে সন্তোষজনক মনে না হলে কমিশন ভোট গ্রহণসহ নির্বাচনের যেকোনো পর্যায়ে সামগ্রিক নির্বাচন বন্ধ করে দিতে পারে। আচরণবিধি লঙ্ঘনের কারণে কমিশন প্রার্থীর প্রার্থিতাও বাতিল করতে পারে।
এ বিষয়ে এম সাখাওয়াত হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, নির্বাচনে কোনো ঘটনাকে সন্দেহজনক মনে হলে বা সন্তোষজনক মনে না হলে কমিশন নির্বাচন বাতিল করে দিতে পারে। কিন্তু এই কমিশন সেটা করবে না।
আওয়ামী লীগের দুজন করে প্রার্থী: নির্বাচন পরিচালনা বিধিতে বলা আছে, কোনো দল থেকে একজনের বেশি প্রার্থী মনোনয়ন দেওয়া যাবে না। কোনো পৌরসভায় এক দলের একাধিক মনোনয়নপত্র জমা পড়লে সব কটি বাতিল হয়ে যাবে। বিষয়টি ২৪ নভেম্বর তফসিল ঘোষণা অনুষ্ঠানে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ একাধিকবার উচ্চারণ করেছিলেন। কিন্তু শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত অন্তত তিনজন রিটার্নিং কর্মকর্তা আইনটি মানেননি।
বরগুনার বেতাগীতে আওয়ামী লীগের দলীয় প্রধানের সই নিয়ে বর্তমান মেয়র আলতাফ হোসেন ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি গোলাম কবির মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। পরে আওয়ামী লীগ থেকে চিঠি দিয়ে রিটার্নিং কর্মকর্তাকে বলা হয়েছে, তাদের প্রার্থী গোলাম কবির।
রিটার্নিং কর্মকর্তা দুলাল তালুকদার প্রথম আলোকে বলেন, আওয়ামী লীগের চিঠি অনুযায়ী একজনকে বাদ দিয়ে অন্যজনের মনোনয়নপত্র বৈধ করা হয়েছে।
নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের দলভিত্তিক মেয়র প্রার্থীদের তালিকায় দেখা গেছে, খুলনার পাইকগাছা পৌরসভায় আওয়ামী লীগের তিনজন এবং মাগুরা সদর পৌরসভায় দুজন করে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। সংশ্লিষ্ট দুই রিটার্নিং কর্মকর্তা পাইকগাছায় সেলিম জাহাঙ্গীর এবং মাগুরায় খুরশিদ হায়দারের মনোনয়নপত্র বৈধ করে অন্যদেরটা বাতিল করে দিয়েছেন।
নির্বাচনী বিধি অনুযায়ী, এই কর্মকর্তারা তা করতে পারেন না।
বিএনপির মেয়র প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল: ফেনী সদর ও পরশুরাম, চাঁদপুরের ছেংগারচর এবং কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামসহ ১০ পৌরসভায় বিএনপির প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে। ছেংগারচরের রিটার্নিং কর্মকর্তা ও চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা মফিজুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেছেন, বিএনপির প্রার্থীর মনোনয়নপত্রটি অসম্পূর্ণ থাকায় বাতিল করা হয়েছে।
কিন্তু প্রার্থী সারোয়ারুল আবেদীন গতকাল রাতে প্রথম আলোকে বলেন, মনোনয়নপত্রের সঙ্গে তিনি এসএসসি ও এইচএসসির সনদ সংযুক্ত করে দিয়েছেন। রিটার্নিং কর্মকর্তার দপ্তরের কেউ সেটা সরিয়ে ফেলে এখন বলছেন মনোনয়নপত্রটি অসম্পূর্ণ।
চৌদ্দগ্রামে বিএনপির প্রার্থী গোলাম রাব্বানীর মনোনয়নপত্র বাতিল প্রসঙ্গে তাঁর মা ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলর মেহেরুন্নেসা হক প্রথম আলোকে বলেন, তাঁর ছেলে পুলিশি হয়রানির কারণে এলাকায় ঢুকতে পারছেন না। ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ডে টাকা বকেয়া থাকায় রিটার্নিং কর্মকর্তা ও ইউএনও রাব্বানীর মনোনয়নপত্র বাতিল করেছেন। বিষয়টি ঋণ খেলাপের আওতায় পড়ে কি না, সেটা নিয়ে তাঁদের প্রশ্ন আছে।
আওয়ামী লীগের বিদ্রোহীদের মনোনয়নপত্র বাতিল: নির্বাচনী আইনে বলা হয়েছে, স্বতন্ত্র প্রার্থী হতে হলে প্রার্থীদের ১০০ জন ভোটারের সমর্থনসূচক সই সংগ্রহ করে মনোনয়নপত্রের সঙ্গে জমা দিতে হবে। দল থেকে মনোনয়ন না পাওয়ায় আওয়ামী লীগ ও বিএনপির অনেক বিদ্রোহী স্বতন্ত্রভাবে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। গত দুই দিনে রিটার্নিং কর্মকর্তারা এমন শতাধিক প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল করে দিয়েছেন।
আইন অনুযায়ী স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ১০০ ভোটারের সমর্থনসূচক সই নিয়ে তা মনোনয়নপত্রের সঙ্গে জমা দিয়েছেন। পরে এসব সমর্থনকারীই লিখিতভাবে রিটার্নিং কর্মকর্তাকে জানিয়েছেন, তাঁরা স্বতন্ত্র প্রার্থীর পক্ষে সই করেননি। যে কারণে রিটার্নিং কর্মকর্তারা তাঁদের মনোনয়নপত্র বাতিল করেছেন। কিন্তু রাজশাহীর বাগমারার ভবানীগঞ্জ পৌরসভায় বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী শাহিনুল ইসলামসহ একাধিক বিদ্রোহী প্রার্থী প্রথম আলোকে বলেছেন, দলীয় প্রার্থীরা ভোটার-সমর্থকদের ভয়ভীতি দেখিয়ে এটা করিয়েছেন।
লিখিত অভিযোগ তিনটি: কমিশন সচিবালয়ে এ পর্যন্ত মাত্র তিনটি অভিযোগ জমা পড়েছে। দাউদকান্দি পৌরসভার নাজমা আক্তার ও শাহজাহান মিয়া অভিযোগ করেছেন, ৩ ডিসেম্বর প্রতিপক্ষের লোকজন উপজেলা পরিষদের প্রধান ফটকে আটকে রাখায় তাঁরা মেয়র পদে মনোনয়নপত্র জমা দিতে পারেননি।
গতকাল অভিযোগ জমা দিয়েছেন মৌলভীবাজারের কুলাউড়া পৌরসভার আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী এ কে এম শফি আহমেদ। তবে তাঁর অভিযোগের বিষয়বস্তু জানা যায়নি।
নিয়ম অনুযায়ী অভিযোগ যাচাইয়ের জন্য কমিশন সচিবালয়ের আইন শাখায় পাঠানোর কথা। কিন্তু আইন শাখা থেকে জানা গেছে, সেখানে এখনো কোনো অভিযোগপত্র যায়নি।
তবে আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে কমিশন গতকাল তিন সাংসদকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছে। অভিযুক্ত সাংসদেরা হলেন হাচারনুর রহমান (বরগুনা-২), এম মালেক (ঢাকা-২০) ও শফিকুল ইসলাম (নাটোর-২)। সুত্র….প্রথম অলাে