April 25, 2026
রাবি: গত কয়েক বছরে খুন, সংঘাত, প্রকাশ্যে অস্ত্র প্রদর্শনে জড়িতদের কোনো শাস্তি না হওয়ার মধ্যেই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গত রোববারের ঘটনা তদন্তে আরেকটি কমিটি কাজ শুরু করেছে। এর আগের ঘটনাগুলোর ক্ষেত্রে তদন্ত কমিটিগুলোর সুপারিশ বাস্তবায়িত না হওয়া নতুন ঘটনার জন্ম দিচ্ছে বলে মনে করেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। এটা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক দুর্বলতা বলেও মন্তব্য করেছেন এক শিক্ষক। ব্যবস্থা না নেয়ার জন্য প্রশাসনে থাকা সাবেক শিক্ষকরা নানা অজুহাত দেখালেও এখনকার উপউপাচার্য অধ্যাপক চৌধুরী সারওয়ার জাহান সজল এক্ষেত্রে দায় চাপিয়েছেন রাষ্ট্রীয় প্রশাসনকে।
আগের নজির না থাকলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মিজানউদ্দিন বলেছেন, তদন্তে দায়ী বলে যারা চিহ্নিত হবে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। বর্ধিত ফি ও সান্ধ্য কোর্স বাতিলের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর গত ২ ফেব্রুয়ারি রোববার অস্ত্র হাতে চড়াও হয় ছাত্রলীগের এক দল নেতা-কর্মী। এরপর ক্যাম্পাসে ভাংচুর চলে, যাতে ছাত্রদল ও ইসলামী ছাত্রশিবির জড়িত বলে অভিযোগ উঠেছে। এই ঘটনা তদন্তে প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক খালিকুজ্জামানকে প্রধান করে রোববার রাতেই সিন্ডিকেট পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন- রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক নজরুল ইসলাম, ফলিত গণিত বিভাগের অধ্যাপক শামসুল আলম সরকার, সিন্ডিকেট সদস্য ইব্রাহিম হোসেন। সদস্য সচিব হিসেবে থাকছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের নিবন্ধক অধ্যাপক এন্তাজুল হক। ২০০৯ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি ছাত্রলীগ-পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে সংঘর্ষে ছাত্রশিবিরের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক শরীফুজ্জামান নোমানী নিহত হওয়ার পর গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে সিন্ডিকেট দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার কথা বললেও প্রশাসন কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। এর এক বছর পর ২০১০ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচটি আবাসিক হলে একসঙ্গে হামলা চালায় ছাত্রশিবির। ওই রাতে গণিত বিভাগের শিক্ষার্থী ফারুক হোসেনকে কুপিয়ে হত্যার পর লাশ ফেলে দেয়া হয় ম্যানহোলে। রগ কেটে দেয়া হয় কয়েকজন ছাত্রলীগ নেতার।
ওই ঘটনায় উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক গোলাম কবিরের নেতৃত্বে গঠিত তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি যেসব সুপারিশ করেছিল, তা সিন্ডিকেটের অনুমোদনই পায়নি। একই ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন নিবন্ধক অধ্যাপক এম এ বারীর নেতৃত্বে আরেকটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল। সেই কমিটি হত্যাকাণ্ডে জড়িত ১০ শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশ করলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি।
২০১০ সালেরই ১৫ অগাস্ট জাতীয় শোক দিবসের অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে ছাত্রলীগের সংঘর্ষে ইসলামের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী নাসিরুল্লাহ নাসিমকে শাহ মখদুম আবাসিক হলের দ্বিতীয় তলা থেকে ফেলে দেয়া হয়। ২৩ আগস্ট ঢাকায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি।
নাসিমের মৃত্যুতে শাহ মখদুম হলের আবাসিক শিক্ষক ড. রুহুল আমিনকে আহ্বায়ক করে গঠিত ১০ সদেস্যের তদন্ত কমিটির সুপারিশের ভাগ্যেও জোটে একই পরিণতি। ফলে কমিটির প্রতিবেদনে যে ১০ শিক্ষার্থীর নাম আসে, শাস্তি হয়নি তাদের কারোরই। নাসিম হত্যাকাণ্ডের পর বিশ্ববিদ্যালয় শাখা বিলুপ্ত করে দেয় কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ। এর ১০ মাস পর ২০১১ সালের ২৫ জুন নতুন কমিটি দেয়া হয়। ২০১২ সালের ১৬ জুলাই নিজের দলের কর্মীদের হাতে খুন হন ছাত্রলীগকর্মী ও সমাজবিজ্ঞান বিভাগের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র আব্দুল্লাহ আল সোহেল। পদ্মা সেতুর নামে চাঁদা তোলা নিয়ে আবাসিক হলে গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়।
সোহেল হত্যার তদন্তের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ অধ্যাপক গোলাম কবীরের সঙ্গে আরো পাঁচ শিক্ষককে দায়িত্ব দেন। কমিটি গত ২০১২ সালের ২৯ অগাস্ট প্রশাসনের কাছে প্রতিবেদন জমা দেয়, কিন্তু এই প্রতিবেদনও আলোর মুখ দেখেনি। তদন্ত কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়ন না হওয়াকে ‘প্রশাসনিক দুর্বলতা’ বলে মন্তব্য করে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক সুলতান উল ইসলাম বলেন, “কর্তৃপক্ষ যদি কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করত, তাহলে ক্যাম্পাসে সহিংস ঘটনা যুগ যুগ ধরে চলত না।”
শাস্তি না হওয়ায় বারবার পার পেয়ে যাচ্ছে বলে অপরাধীরা আবার অপরাধ সংঘটনের সুযোগ পাচ্ছে বলে মনে করেন ছাত্র ইউনিয়নের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি আয়াতুল্লাহ খোমেনী। তিনি বলেন, “অন্যায়কারীদের আশ্রয় দিলে তারাও যে এক সময় আশ্রয়দাতাদের জন্য ভয়ের কারণ হতে পারে, সে কথাটি প্রশাসনের মনে রাখা উচিত।” বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের আহ্বায়ক আরাফাত রেজা আশিক বলেন, “প্রশাসন কার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে? নিজেদের ছেলেদের (ছাত্রলীগ) বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার ক্ষমতা তো প্রশাসনের নেই।”
তবে ছাত্রলীগের সভাপতি মিজানুর রহমান রানা ও তৌহিদ আল হাসান তুহিন বলছেন, তদন্ত কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়ন হলে তারা ‘খুশি’ হতেন। রোববারের ঘটনা তদন্তে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটি একটি তদন্ত কমিটি করেছে। দুজনকে বহিষ্কারও করেছে ইতোমধ্যে। তদন্ত কমিটির সুপারিশে ব্যবস্থা না নেয়ার বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আব্দুল খালেক
বলেন, “শিক্ষার্থীর শাস্তির বিষয়টি আসলে স্পর্শকাতর বিষয়। বড় ধরনের শাস্তি দিলে বিষয়টি শিক্ষার্থীদের পরিবারকেও প্রভাবিত করে থাকে। “শিক্ষার্থীদের শাস্তি দিলেও মুশকিল, আবার না দিলেও মুশকিল।” নিজের সময়ে গঠিত তদন্ত কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী শাস্তি দিতে না পারার সমলোচনা স্বীকার করে সাবেক আরেক উপাচার্য অধ্যাপক সাইদুর রহমান খান
বলেন, “এখানে অনেক বিষয় কাজ করে। “যেমন তদন্ত কমিটির রিপোর্ট তৈরিতে গড়িমসি ও দেরি করা। তদন্ত কমিটির সদস্যদের কাছে ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী শিক্ষার্থীরা সাক্ষ্য দিতে অস্বীকৃতি জানানো। যার কারণে যথাযথভাবে যথাসময়ে তদন্ত রিপোর্ট তৈরি হয় না, সাফল্যের মুখও দেখে না।” বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান উপউপাচার্য অধ্যাপক সারওয়ার জাহান
বলেন, “সহিংস ও হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনাগুলো ক্রিমিনাল কেস হওয়ায় কোর্টেরও সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের একার পক্ষে সব কিছু করা সম্ভব নয়।” আগের তদন্ত কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়ন না হওয়ার জন্য সে সময়কার প্রশাসনকে দায়ী করেন তিনি। তার দাবি, বর্তমান প্রশাসন এক্ষেত্রে ছাড় দেবে না। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, সম্প্রতি যৌন হয়রানির অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার ব্যবস্থাপনার বিভাগের প্রভাষক শাওন উদ্দিনকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। …….বিডিনিউজ