March 7, 2026
জব্বার হোসেন॥ শ্লীলতাহানির ঘটনা এই প্রথম নয়, এমন ঘটনা আগেও ঘটেছে। এ ধরনের ঘটনার পর আমরা কী আশা করি, আশা করি যে, এমন ঘটনা আর ঘটবে না। কিন্তু আমাদের এই আশা, আশাই থেকে যায়, স্বপ্নই থেকে যায়, বাস্তবে রূপ নেয় না। কারণ আমরা বাস্তবে রূপ দিই না এবং রূপ দিতে চাই না বলেই, এমন ঘটনা বারবার ঘটতে থাকে। যখন আমাদের জীবনে কোনও কিছু প্রাত্যহিক হয়ে যায়, নিত্যদিনের হয়ে যায়, তখন সেটা আমাদের সংস্কৃতির অংশ বলেই আমরা মনে করি। শ্লীলতাহানি, যৌন হয়রানি, যৌন নিপীড়ন এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, এটা আমাদের সংস্কৃতি হয়ে গেছে।
সংস্কৃতির নানান দিক থাকে। কোনও কোনও সংস্কৃতিকে আমরা টিকিয়ে রাখতে চাই, কোনও কোনও সংস্কৃতিতে আমরা টিকিয়ে রাখতে চাই না। আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতির অনেক কিছুই হারিয়ে গেছে। সেগুলো হারিয়ে গেছে চর্চা নেই বলেই। যে সংস্কৃতিগুলো টিকে আছে, সেগুলোর চর্চা রয়েছে বলেই টিকে আছে। শ্লীলতাহানি আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের একটা অনুষঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখন যখন-তখন, যত্রতত্র আমরা শ্লীলতাহানির ঘটনার কথা শুনি। এই শ্লীলতাহানি কখনও শিক্ষক করে, কখনও অফিস কর্মকর্তা করে, কখনও সাংবাদিক করে, কখনও পুলিশ করে, কখনও আমলা করে, কখনও রাজনীতিবিদেরা করে, কখনও মুখোশধারী বুদ্ধিজীবীরাও করে। শ্লীলতাহানির কিছু ঘটনা প্রকাশ হয় বলে আমরা জানি। কিছু জানি না, প্রকাশিত হয় না বলেই।
আইন তৈরিই হয়েছে যেন মানুষ একটা শৃঙ্খলার মধ্যে থাকে, যেন মানুষ অন্যের ক্ষতিকর কিছু না করতে পারে। কিন্তু সেই আইন যখন শুধু বইয়ের পাতায় পড়ে থাকে বইয়ের সূত্র হয়ে, সে আইনের যখন কোনও কার্যকারিতা থাকে না, মানুষ তখন সেই আইনকে মানেও না।
জানি যেগুলো, সেগুলোর মাত্রাই এত ভয়াবহ। আর জানি না যেগুলো, যেসব প্রকাশিত হয় না, সব এক জায়গায় মিলালে সেগুলোর সংখ্যা অসংখ্য, অগণিত। শ্লীলতাহানি বন্ধ হয় না, কারণ এই শ্লীলতাহানি আমরা বন্ধ করি না। হত্যা বন্ধ হবে না, যদি না হত্যা বন্ধ করি। অপহরণ বন্ধ হবে না, যদি না অপহরণ বন্ধ করি। ধর্ষণ বন্ধ হবে না, যদি না ধর্ষণ বন্ধ করি। অ্যাসিড নিক্ষেপ বন্ধ হবে না, যদি না অ্যাসিড নিক্ষেপ বন্ধ করি। যৌন হয়রানি বন্ধ হবে না, যদি না যৌন হয়রানি বন্ধ করি। যেকোনও অন্যায়ই বন্ধ হবে না কখনোই, যদি আমরা তা বন্ধ না করি।
মানুষের মধ্যে অপরাধপ্রবণতা খুব অস্বাভাবিক নয়। একধরনের অপরাধপ্রবণতা মানুষের মধ্যে থাকেই। শিক্ষা, সংস্কৃতি, রুচিবোধ, মানবিকতা তাকে অপরাধ থেকে দূরে সরিয়ে রাখে। অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি জিনিস, যা মানুষকে অপরাধ থেকে দূরে সরায়, তা হচ্ছে আইন। আইন তৈরিই হয়েছে যেন মানুষ একটা শৃঙ্খলার মধ্যে থাকে, যেন মানুষ অন্যের ক্ষতিকর কিছু না করতে পারে। কিন্তু সেই আইন যখন শুধু বইয়ের পাতায় পড়ে থাকে বইয়ের সূত্র হয়ে, সে আইনের যখন কোনও কার্যকারিতা থাকে না, মানুষ তখন সেই আইনকে মানেও না। তখন অপরাধ করার একটা প্রবণতা দেখা যায় মানুষের মধ্যে।
শ্লীলতাহানি একটি বল প্রয়োগের বিষয়। একটি জবরদস্তির বিষয়। একটি জোরাজুরির বিষয়। জোরাজুরির সঙ্গে একধরনের শক্তি ও ক্ষমতার বিষয়ও জড়িত। শ্লীলতাহানি কখনও সবলকে দুর্বল করে না, দুর্বলের শ্লীলতাহানি ‘সবল’ করে। সম্প্রতি ঘটে যাওয়া যৌন হয়রানি, নিপীড়ন, শ্লীলতাহানির ঘটনায় সামনে এসেছে ছাত্রলীগ। ছাত্রলীগের সঙ্গে ক্ষমতার একটি সম্পর্ক রয়েছে। আধিপত্যবাদের একটি সম্পর্ক আছে। ছাত্রলীগ এমন একটি সংগঠন, যাদের দল এখন ক্ষমতায়। ক্ষমতা কখনও-কখনও অন্যের ক্ষমতা ও অধিকারকে নষ্ট করে। এবং ক্ষমতার কুৎসিত যে রূপ, তার একটি বিকৃতিও থাকে। আর এই বিকৃতিটাই ধারণ করেছে ছাত্রলীগ। কারণ ছাত্রলীগ দেখেছে- তাকে বারণ করার কেউ নেই, নিষেধ করার কেউ নেই, যে কারণে একধরনের স্বেচ্ছাচারী হয়ে উঠেছে ছাত্রলীগ। ছাত্রলীগের যৌন হয়রানি, যৌন নিপীড়ন, শ্লীলতাহানি, ধর্ষণ- এসব কোনওটাই নতুন নয়। ছাত্রলীগ অন্য সময় অত না, যত না তার সরকার ক্ষমতায় থাকাকালীন যৌন নিপীড়ন, যৌন হয়রানি, ধর্ষণ করে। এসব ঘটনা জসিম উদ্দিন মানিকের জন্য যেমন সত্য, সেই যুবলীগ নেতা যিনি এক নারীর শ্লীলতাহানি করে তার ভিডিও বাজারে ছেড়েছিলেন, তার ক্ষেত্রেও সত্য।
ছাত্রলীগ এমন একটি সংগঠন, যাদের দল এখন ক্ষমতায়। ক্ষমতা কখনও-কখনও অন্যের ক্ষমতা ও অধিকারকে নষ্ট করে। এবং ক্ষমতার কুৎসিত যে রূপ, তার একটি বিকৃতিও থাকে। আর এই বিকৃতিটাই ধারণ করেছে ছাত্রলীগ।
আইন সবার জন্য সমান বলা হলেও শেষ পর্যন্ত তা ক্ষমতাবানদের জন্য। তাই যদি না হয়, তাহলে অনেক ছিঁচকে ঘটনায় জেল-জরিমানা, অথচ বড় ঘটনায় কিভাবে পার পেয়ে যায় লোকে। মানিকের ঘটনায়ও সেদিন সারা দেশ তোলপাড় হয়েছিল। শুধু দেশ নয়, দেশের বাইরের মিডিয়ায়ও ঝড় উঠেছিল তার শততম ধর্ষণের খবরে। রেহনুমা আহমেদের মতো মেধাবী নৃবিজ্ঞানী শিক্ষক চাকরি ছেড়েছিলেন ঘৃণায়, প্রতিবাদে। অথচ মানিকদের কিছুই হয়নি। মানিকের মতো সোনা মানিকদের রাষ্ট্র পৃষ্ঠপোষকতা করেছে ছাড়া পেতে। শুধু তা-ই নয়, সহযোগিতা করেছে বিদেশ পাড়ি দিতে। তিরস্কারের ঘটনায় যদি পুরস্কার পাওয়া যায়, তাহলে লোকে কেন যৌন হয়রানি, ধর্ষণ করবে না? কেন বিমান টিকিট নেবে না, কেন বিদেশের নিশ্চিত জীবনকে অগ্রাহ্য করবে? মানিকের ঘটনা একটি। এরপর এসব ঘটনা আরও ঘটেছে। ছাত্রলীগ, ছাত্রদল, যৌন হয়রানি- যৌন নির্যাতন অনেক করেছে। যখনই যাদের সরকার ক্ষমতায় ছিল, রক্ষা করেছে, পৃষ্ঠপোষকতা করেছে তারা তাদের সোনা মানিকদের।
বহিষ্কার কোনও বিচার নয়, আইওয়াশ মাত্র। ‘বহিষ্কার’, ‘সাময়িক বহিষ্কার’ কিছুদিন দল থেকে সরে থাকা, পরে এসে দলে ভেড়া। অনেকটা পুলিশের ক্লোজড, সাসপেন্ডের মতো। কিছুদিন সরে থাকো, বেতন রেশন সব নাও, পরে এসে যোগ দাও। ততদিনে পরিবেশ নিয়ন্ত্রণে, শান্ত। ঘটনার পর কয়েকদিন পার হয়ে গেলেও জড়িতদের গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনতে পারেনি পুলিশ। পুলিশের দায়িত্বে অবহেলার বিষয়েও কোনও পদক্ষেপ নেয়নি সরকার। বিশ্ববিদ্যালয়ের আচরণও তথৈবচ। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর আমজাদ হোসেন বলেন এক কথা, উপাচার্য বলেন অন্য কথা। ১৬ এপ্রিল প্রক্টরের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, তদন্ত কমিটি গঠন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে এখনও নাম ঘোষণা করা হয়নি। উপাচার্য বলেন, আমাদের কমিটি ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছে। বুঝি না কার কথা, কোনটি সত্য?
আমরা এক অদ্ভুত সংস্কৃতি চালু করেছি, দায়িত্বহীনতার সংস্কৃতি, দায় এড়াবার সংস্কৃতি, বিচারহীনতার সংস্কৃতি, ক্ষমতাবানদের ছাড় দেওয়ার সংস্কৃতি। সেই সংস্কৃতিরই অংশ শ্লীলতাহানির সংস্কৃতি।
স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর পদ ও বক্তব্য সব সময় একই। সব সময়ই ‘দেখছি, দেখব’, ‘কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়’, ‘দোষীদের বিচার করব’। স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামালের ইতোমধ্যেই এসব বক্তব্য দেওয়াও হয়ে গেছে। তিনি তার বক্তব্য দেওয়ার মহান দায়িত্বটি পালন করেছেন। আমরা এক অদ্ভুত সংস্কৃতি চালু করেছি, দায়িত্বহীনতার সংস্কৃতি, দায় এড়াবার সংস্কৃতি, বিচারহীনতার সংস্কৃতি, ক্ষমতাবানদের ছাড় দেওয়ার সংস্কৃতি। সেই সংস্কৃতিরই অংশ শ্লীলতাহানির সংস্কৃতি। এই অপসংস্কৃতি, অসভ্যতা থেকে বের হতে না পারলে, জাতি হিসেবে লজ্জার শেষ থাকবে না। এমনটা চলতে থাকলে, হয়তো আমরা বর্বর হিসেবে চিত্রিত হব, চিহ্নিত হব। যাদের আমরা বর্বর, অসভ্য বলি, তারাই হয়তো একদিন আমাদের দিকে আঙুল তুলবে। গালি দেবে ‘অসভ্য’ বলে।
যদিও তাতে আমাদের কোনও কিছুই যায়-আসে না।
লেখক: সদস্য, ফেমিনিস্ট ডটকম, যুক্তরাষ্ট্র
পরিচালক, বাংলাদেশ সেন্টার ফর ডেভেলপমেন্ট জার্নালিজম অ্যান্ড কমিউনিকেশন
সম্পাদক, সাপ্তাহিক কাগজ ও মিডিয়াওয়াচ