February 17, 2026
বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে চেষ্টা করার পরেও দেশের প্রথম স্যাটেলাইট ‘বঙ্গবন্ধু-১’ উৎক্ষেপণে জটিলতার অবসান হচ্ছে না। অর্থনৈতিক সমস্যা থাকলেও সম্প্রতি স্যাটেলাইট উৎক্ষেপনের খরচ যোগাতে আগ্রহ দেখিয়েছে ৬টি বিদেশী ব্যাংক এবং অর্থলগ্নীকারী প্রতিষ্ঠান। ফলের টাকার সমস্যা শেষ হলেও স্লট নিয়ে জটিলতা কাটছে না। যদিও ইতোমধ্যেই স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণে ১০২ ডিগ্রিতে স্লট চেয়ে জাতিসংঘের ইন্টারন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন ইউনিয়ন (আইটিইউ)-এর কাছে আবেদন করে বিটিআরসি।
বাংলাদেশের বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট উৎক্ষেপনে সবার আগে আগ্রহ দেখিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এক্সিম ব্যাংক। গত বছরের শুরুতে তারা এখানে অর্থ সহায়তার আগ্রহ দেখায়। পরে তালিকায় যুক্ত হয় এইচএসবিসি ফ্রান্স, জাপান ব্যাংক অব ইন্টারন্যাশনাল, সিডব্লিউজি গালফ ইন্টারন্যাশনাল অব ইউকে এবং চায়না গ্রেটওয়াল ইন্ডাস্ট্রি কর্পোরেশন।
এ সংক্রান্ত সরকার যেসব প্রস্তাব পেয়েছেন তার সবগুলোই অর্থ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগে পাঠিয়েছেন। এখন তারাই প্রস্তাবগুলো বিচার বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নেবেন। সরকার চায় এদের যে কোনও একটি থেকে ১ হাজার ৬৮০ কোটি টাকা নিতে। প্রকল্পের মোট খরচ ধরা হয়েছে ৩ হাজার ২৪৮ কোটি ৭৯ লাখ ৮২ হাজার টাকা। এই টাকার মধ্যে বাকিটা সরকারের অংশ রাখা হয়েছে ১ হাজার ৫৬০ কোটি ৪৩ লাখ। আগামী তিন বছরে এই টাকা খরচ করবে সরকার। যার পুরোটাই আসবে বিটিআরসি’র কোষাগার থেকে।
এদিকে বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ নিয়ে জটিলতা নিরসনে জাতিসংঘের সাথে কথা বলেছে বাংলাদেশ। স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণে ১০২ ডিগ্রিতে স্লট চেয়ে জাতিসংঘের ইন্টারন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন ইউনিয়ন (আইটিইউ)-এর কাছে আবেদন করেছে বিটিআরসি। কারণ এ স্লট দেয়ার কর্তৃপক্ষ হচ্ছে আইটিইউ। এদিকে যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, রাশিয়া, অস্ট্রেলিয়াসহ এশিয়া মহাদেশ ও মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশ আপত্তি জানায়। এসব দেশের বক্তব্য, ১০২ ডিগ্রিতে বাংলাদেশের স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করা হলে তাদের স্যাটেলাইটে ফ্রিকোয়েন্সি পেতে সমস্যা তৈরি হতে পারে।
একই সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে বিকল্প উপায়ও খুঁজছে বাংলাদেশ। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ যদি ১০২ ডিগ্রিতে স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের অনুমোদন না পায়, তাহলে বিকল্প প্রস্তাব দেয়া হবে ৬৯ ডিগ্রি পূর্বে। তবে এতে একই কারণ দেখিয়ে মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, চীনের মতো দেশ আপত্তি জানাতে পারে। বিটিআরসি জানায়, এসপিআই বিষয়টি সমন্বয় করবে, যাতে কোন দেশের জন্যই সমস্যা না হয়। বর্তমানে বিদেশী স্যাটেলাইটের ফ্রিকোয়েন্সি ভাড়া নিয়ে টেলিভিশন চ্যানেল, টেলিফোন, রেডিওসহ অন্যান্য যোগাযোগ রক্ষা করা হচ্ছে। এতে প্রতি বছর ভাড়া বাবদ বাংলাদেশকে ১১ মিলিয়ন ডলার গুণতে হয়।
এর আগে ২০১১ সালে একনেকের একটি বৈঠকে ৩ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প অনুমোদিত হয়। তখন প্রকল্পের মেয়াদ ধরা হয়েছিলো জুন ২০১৫। ডিপিপিতে দেখা গেছে এ মেয়াদ জুন ২০১৬ পর্যন্ত রাখা হয়েছে। এর মধ্যে রাশিয়ার স্পুটনিকের সঙ্গে অরবিটাল স্লটের জন্যে চুক্তি করেছে বিটিআরসি। নন বাইন্ডিং অ্যাগ্রিমেন্টের এই চুক্তিতে প্রাথমিকভাবে খরচ হয়েছে দুই মিলিয়ন ডলার। তবে তাদেরকে আরও ২৮ মিলিয়ন ডলার দিতে হবে।
এ প্রসঙ্গে বিটিআরসির চেয়ারম্যান সুনীল কান্তি বোস বলেন, স্যাটেলাইট প্রজেক্ট নিয়ে এরই মধ্যে যে সঙ্কট তৈরি হয়েছে তা নিয়ে নতুন করে কাজ করা হবে। তিনি বলেন, বেশ কয়েকটি দেশ স্যাটেলাইটের রুট নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে। তবে আমাদের আরও বেশ কয়েকটি বিকল্প ব্যবস্থা রয়েছে। তিনি বলেন, এ নিয়ে একটি টিম জাতিসংঘের জেনেভায় যাচ্ছে। সেখানে আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টির সমাধান হবে। গত বছর ২৮ মার্চ বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের জন্য পরামর্শক প্রতিষ্ঠান স্পেস পার্টনারশিপ ইন্টারন্যাশনালের (এসপিআই) সঙ্গে চুক্তি করে বিটিআরসি। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, আপত্তি জানানো দেশগুলোর সঙ্গে এসপিআই আলোচনায় বসে এর সমাধান করবে।
কমিটি জানায়, আমরা ১০২ ডিগ্রি না ১৩২ ডিগ্রিতে স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করবো এটা আমাদের বিষয়। আইটিও এ ব্যাপারে যথাযথ সিদ্ধান্ত দেবে। কোন দেশ আপত্তি জানালো এ নিয়ে আমাদের কোন মাথাব্যথা নেই। এদিকে স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণে স্লট পাওয়ার পরই বিটিআরসি কোম্পানি গঠন করবে বলে জানান সুনীল কান্তি বোস। কারণ, নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে বিটিআরসি স্যাটেলাইট পরিচালনা করতে পারে না।
প্রসঙ্গত, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট চালু করতে পারলে দেশে শুধু বৈদেশিক মুদ্রারই সাশ্রয়ই হবে না, স্যাটেলাইটের অব্যবহৃত অংশ নেপাল, ভুটান ও মিয়ানমারের মতো দেশে ভাড়া দিয়ে প্রতি বছর ৫০ মিলিয়ন ডলার অর্থ আয় করা যাবে। বর্তমানে আইটিইউতে ২৪টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ কাউন্সিলর হিসেবে প্রতিনিধিত্ব করছে। এ হিসেবে আইটিইউ’র কাছে বাংলাদেশের গুরুত্ব একটু বেশিই হবে বলে সংশ্লিষ্টরা প্রত্যাশা করছেন। এর আগে বিষয়টি নিয়ে টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয় বিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতেও আলোচনা হয়। ওই সময় কমিটির পক্ষ থেকে বলা হয়, এ নিয়ে কোন বাধা মেনে নেয়া হবে না। সরকার স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ নিয়ে যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে তা যুগান্তকারী। বাংলাদেশের আকাশসীমা নিয়ে অন্য কোন দেশের হস্তক্ষেপ অযৌক্তিক। কারণ মহাকাশ কারও জমিদারি নয়। বাংলাদেশ আইন অনুযায়ী এগোচ্ছে।