পৃথিবীকে জেনে নিন আপনার ভাষায়….24 Hrs Online Newspaper

মমতা দিদি, আরেকটু হাসুন

Posted on November 23, 2014 | in নির্বাচিত কলাম | by

image50সোহরাব হাসান : দিন আগে ঢাকায় অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ ও ভারতের সাবেক হাইকমিশনারদের শীর্ষ বৈঠকটি যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি অভিনবত্ব দাবি করতে পারে। যাঁরা এত দিন নিজ নিজ সরকারের নীতি ও কর্মসূচি বাস্তবায়নে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন, সরকারের হয়ে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে ধারালো ও জোরালো যুক্তি দাঁড় করতেন, তাঁরাই এখন প্রায় অভিন্ন সুরে কথা বলছেন। দুই দেশের সাবেক হাইকমিশনাররা একবাক্যে স্বীকার করেছেন, বকেয়া সমস্যাগুলো না মিটিয়ে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে খুব বেশি দূর এগিয়ে নেওয়া যাবে না। পারস্পরিক আস্থা ও বিশ্বাসের জায়গাটি নড়বড়ে থেকে যাবে। অভিন্ন সমাজ ও সংস্কৃতির উত্তরাধিকার এবং সময়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ বন্ধুত্বের দাবিদার দুটি দেশের মধ্যে সেটি কখনোই কাম্য নয়। বৈঠক শেষে নয় দফা ঘোষণায় দুই দেশের সাধারণ মানুষ ও নাগরিক সমাজ পর্যায়ে যোগাযোগ বাড়ানোর যে তাগিদ দেওয়া হয়েছে, তা-ও সবিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।
এই বৈঠকের দুদিন পরই আমরা পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মুখে আশার বাণী শুনলাম। তবে সেটি পুরো আশা নয়। বলা যায়, আধেক আশা। আধেক নিরাশা। গঙ্গা–ভাগীরথীর পানি অনেক ঘোলা করে শেষ পর্যন্ত তিনি সীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়নে তাঁর সম্মতির কথা জানালেন। কিন্তু তিস্তার ব্যাপারে এখনো অনড়।
কংগ্রেস সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধীর আমন্ত্রণে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় গেল সপ্তাহে দিল্লি গিয়েছিলেন। উপলক্ষ ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর ১২৫তম জন্মবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে যোগদান। সেই অনুষ্ঠানে ক্ষমতাসীন বিজেপি ছাড়া প্রায় সব দলের নেতারা ছিলেন। পর্যবেক্ষকদের মতে, এটা ছিল ধর্মাশ্রয়ী রাজনীতির বিরুদ্ধে ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতির মহাসম্মেলন, যাতে তৃণমূলের মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় থেকে শুরু করে সিপিএমের প্রকাশ কারাত—সবাই ছিলেন। পশ্চিমবঙ্গেও কংগ্রেস, তৃণমূল ও বামদের মধ্যে সমঝোতার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। বিজেপিকে মোকাবিলার এটাই একমাত্র উপায়।
গত সোমবার দিল্লিতে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলোচনাকালে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ছিটমহল বিনিময়ে তাঁর আপত্তি নেই। যদি স্থানীয় মানুষ একমত হন তাহলে তিনি ছিটমহল বিনিময়ের পক্ষে। এত দিন তিনি ছিটমহলের সংখ্যা ও জমির আকার নিয়ে আপত্তি তুলেছিলেন। ভারতের ভেতরে বাংলাদেশের ৫১টি ছিটমহলে আছে ৭১১০ একর জমি, আর বাংলাদেশের ভেতরে ভারতের ১১১টি ছিটমহলে জমির পরিমাণ ১৭১৫৮ হাজার একর। জনসংখ্যা যথাক্রমে ভারতের অংশে ১৪২১৫ এবং বাংলাদেশের অংশে ৩৭৩৬৯। (সূত্র: ইন্ডিয়া–বাংলাদেশ: এনক্ল্যাভস ডিসপিউট, অলক কুমার গুপ্ত, আইপিসিএস)
ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে এরা নিজ ভূখণ্ডে পরবাসী হয়ে আছেন। কেউ নিজ দেশের মূল ভূখণ্ডের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন না। ছিটমহল সমস্যার সমাধানে একবার ১৯৫৮ সালে নুন-নেহরু এবং ১৯৭৪ সালে মুজিব–ইন্দিরা চুক্তি হলেও কার্যকর হয়নি রাষ্ট্রনেতাদের সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির কারণে। এমনকি ভারত সরকার ১৯৭৪ সালের চুক্তিটি সংসদে অনুমোদনও করেনি মামলার অজুহাত দেখিয়ে।
অবশেষে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন, ‘আমি চাই ছিটমহলের লোকেরা তাদের অধিকার ফিরে পাক। তবে তাঁর শর্ত হচ্ছে বাংলাদেশের অংশের ছিটমহল থেকে যেসব মানুষ আসবে, তাদের পুনর্বাসনে কেন্দ্রকে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। রাজ্য সরকারের সঙ্গে আলোচনা করতে হবে।’ এটি যুক্তির কথা। বাংলাদেশের ভেতরে ভারতীয় ছিটমহলের বাসিন্দারা যদি ভারতে চলে যান তাদের পুনর্বাসনের দায়িত্ব কেন্দ্রকেই নিতে হবে। আবার ভারতের ভেতরে অবস্থিত বাংলাদেশি ছিটমহলের বাসিন্দারা ফিরে আসতে চাইলে তাদেরও পুনর্বাসন করতে হবে বাংলাদেশ সরকারকে। ২০১১ সালে চুক্তি বাস্তবায়ন হলে এত দিনে ছিটমহলের বাসিন্দাদের পুনর্বাসন কাজও শেষ হয়ে যেত।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যখন দিল্লিতে যান তখন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি অস্ট্রেলিয়া সফরে ছিলেন। তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং ও বিজিপির প্রবীণ নেতা এল কে আদভানির সঙ্গে দেখা করেছেন। কলকাতায় ফিরে এসে তিনি ফেসবুকে রাজ্যের একটি হাসপাতালে ২২ কোটি রুপি অর্থসহায়তা দেওয়ায় কেন্দ্রীয় সরকারের প্রশংসাও করেছেন। কারও কারও মতে, এটি বরফ গলানোর চেষ্টা।
এই মুহূর্তে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে দুটি বকেয়া সমস্যা সীমান্ত চুক্তির বাস্তবায়ন ও তিস্তার পানিবণ্টন। কিন্তু মমতা শর্ত সাপেক্ষে সীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়নে রাজি থাকলেও তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি না করার ব্যাপারে এখনো অনমনীয়। তিনি বলেছেন, ‘তিস্তা নিয়ে আমি একমত নই। এ নিয়ে আরও ভাবার দরকার আছে।’ তিন বছর পার হয়ে গেল। দিদি আর কত ভাববেন?
উল্লেখ করা জরুরি যে দীর্ঘ আলোচনার পর ২০১১ সালের সেপ্টেম্বরে দুটি বিষয়েই বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সমঝোতা হয় এবং চুক্তি সই করতে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং ঢাকায় আসেন। তাঁর সঙ্গে আসেন তৎকালীন বিরোধী দল বিজেপির সাংসদ ও বাংলাদেশের প্রতিবেশী তিন রাজ্য আসাম, মেঘালয় ও ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রীরা। কিন্তু শেষ মুহূর্তে বেঁকে বসেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি বলেন, ‘ঢাকায় যাব না, চুক্তি করতেও দেব না।’ ফলে মনমোহনের বহুল আলোচিত ঢাকা সফরটি কার্যত নিষ্ফল হয়। সে সময় সীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়নে একটি নামকাওয়াস্তে প্রটোকল সই হলেও সেটি বাস্তবায়ন হয়নি, সংসদের অনুমোদন লাভেও ব্যর্থ হয় বিরোধী দলের আপত্তির কারণে। এর পরই ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে নানা জটিলতা দেখা দেয়। ট্রানজিটের বিষয়টি ঝুলে থাকে। অবশ্য কংগ্রেস নেতৃত্ব এ কারণে ধন্যবাদ পেতে পারে যে শেষ মুহূর্তে তারা বিলটি রাজ্যসভায় পেশ করে যেতে পেরেছিল।
ইতিমধ্যে দিল্লির রাজদরবারে অনেক ঘটনা ঘটেছে। পশ্চিমবঙ্গেও তার প্রভাব-প্রতিক্রিয়া কম নয়। লোকসভা নির্বাচনে কংগ্রেসকে গো-হারা হারিয়ে প্রধানমন্ত্রীর আসনে বসেন বিজেপি নেতা নরেন্দ্র মোদি। লোকসভা নির্বাচনের সময় মমতার সঙ্গে তাঁর যে বাগ্যুদ্ধ শুরু হয়েছিল, সেটি এখনো অব্যাহত আছে এবং একটার পর একটা ঘটনায় বিজেপি ও তৃণমূলের মধ্যে ঝগড়ার মাত্রা বাড়ছেই। পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেস ও বামফ্রন্টের পর বিজেপি এখন তৃণমূলের দুর্গে হানা দিয়েছে। লোকসভায় প্রথমবারের মতো দুটি আসন পাওয়ায় এবং বিধানসভায় উপনির্বাচনে তৃণমূলের আসন ছিনিয়ে নেওয়ায় অনেকটাই বেকায়দায় আছেন মমতা। বামফ্রন্টের বিরুদ্ধে বাংলাদেশি অভিবাসীদের ম“ দেওয়ার যে অভিযোগ এত দিন তিনি করতেন, সেই অভিযোগ এখন তাঁর বিরুদ্ধে আনছেন বিজেপি নেতারা।
সারদা কাণ্ড এবং গত ২ অক্টোবর বর্ধমানে সংঘটিত জঙ্গিদের বোমা বিস্ফোরণের ঘটনা মমতার অবস্থানকে আরও দুর্বল করেছে বলেই রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের ধারণা।
এ অবস্থায় কেন্দ্রের বিরুদ্ধে সম্মুখ সমরে নামাটা সঠিক মনে করছেন না পশ্চিমবঙ্গের অধিশ্বরী। মনমোহন সিংয়ের সরকার ছিল দুর্বল, ব্যক্তিগতভাবে মনমোহন কিংবা সোনিয়া গান্ধী কখনো মমতার বিরুদ্ধে একটি কথাও বলেননি। এমনকি মনমোহনের ঢাকা সফর ‘ব্যর্থ’ করে দেওয়ার পরও তাঁরা ছিলেন চুপচাপ। কিন্তু নরেন্দ্র মোদি যে চুপচাপ থাকার মানুষ নন, সেটি পশ্চিমবঙ্গ গত সাত মাসেই টের পেয়েছে। ফলে নিরুপায় আপসহীন মমতাকে কেন্দ্রের সঙ্গে একটি বোঝাপড়ায় আসতে হচ্ছে। সীমান্ত চুক্তির বাস্তবায়ন সেই আপসরফার অংশ বলেই আমাদের ধারণা।
ঢাকা-দিল্লির রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক মহলে এ কথা চাউর আছে যে মোদি সরকার লোকসভার চলতি অধিবেশনেই সীমান্ত চুক্তি অনুমোদন করিয়ে নিতে চায়। এবং সেটি সম্ভব হলে আগামী মাসে মোদির ঢাকা সফরও অসম্ভব নয়। আওয়ামী লীগের সঙ্গে ঐতিহাসিকভাবে মৈত্রীর বন্ধনে আবদ্ধ কংগ্রেসের ব্যর্থতার বেদিতেই সাফল্যের পদ্মফুল ফোটাতে চায় বিজেপি সরকার।
অতএব, মমতার কৌশল বদল করা ছাড়া উপায় কী? তিনি এখন মোদি ও বাংলাদেশকে বোঝাতে চাইছেন যে কংগ্রেসের ব্যর্থতার কারণেই চুক্তিটি বাস্তবায়িত হয়নি। তিনি এও মনে করছেন যে সীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়নে তাঁর ভোট কমার আশঙ্কা কম। কেননা, ছিটমহল নিয়ে মূল ভূখণ্ডের মানুষ ভাবেই না। কিন্তু তিস্তার পানিবণ্টনকে এখনো ভোটের হাতিয়ার করতে উদ্গ্রীব তৃণমূল নেত্রী। বাংলাদেশের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক খারাপ করার জন্য কংগ্রেস সরকার দায়ী বলেও মন্তব্য করেন তিনি। মমতার অভিযোগ, আলোচনার পর্যায়ে তিস্তার পানিবণ্টন সম্পর্কে তাঁকে যে ধারণা দেওয়া হয়েছিল, চুক্তির খসড়ায় তার বিপরীতটাই দেখা গেছে। যে কারণে তিনি চুক্তির বিরোধিতা করেছেন।
কিন্তু মমতাকে একটি প্রশ্ন করতেই হয়। তিন বছর আগে কল্যাণ রুদ্রের নেতৃত্বে তিনি তিস্তার বিষয়ে যে কমিটি গঠন করেছিলেন, তার রিপোর্টটি আজও কেন জনগণের সামনে তুলে ধরলেন না? তাঁকে বুঝতে হবে শুকনো মৌসুমে উভয় েেদশ পানির সংকট থাকলেও ভাটির দেশ হিসেবে বাংলাদেশের মানুষকেই বেশি দুর্ভোগ পোহাতে হয়।
তাই পশ্চিমবঙ্গেশ্বরীকে বলব, এক কদম এগিয়েছেন। আরেক কদম আগান। দিদি, আরেকটু হাসুন।
সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।

Comments are closed.

সর্বশেষ খবর

আজকের ছবি

www.facebook.com

Tag Cloud