পৃথিবীকে জেনে নিন আপনার ভাষায়….24 Hrs Online Newspaper

ভারতীয় গণতন্ত্র, আপ কা আদালত এবং আমাদের কিছু কথা

Posted on December 9, 2014 | in নির্বাচিত কলাম | by

35518_0ডেস্ক রিপোর্ট : সারা বিশ্ব অবলোকন করলেন, স্টার টিভির বদৌলতে- যদিও স্টার টিভির প্রায় সকল প্রোগ্রামের মান এবং থিম নিয়ে অনেকেরই প্রশ্ন এবং বিতর্ক রয়ে গেছে। আমাদের সমাজ, সভ্যতা ও সংস্কৃতি এবং পারিবারিক ঐতিহ্যের সাথে সম্পূর্ণ বিপরীতই শুধু নয়, বলা যায় কোন ভাবেই মানানসইও নয়। সেকারণে স্টার টিভির সেই সব প্রোগ্রাম থেকে আমাদের তরুণ প্রজন্মের ভালো কিছু শেখার পরিবর্তে নেতিবাচক শিক্ষাই দিয়ে থাকে বলেই অনেকের সাথে আমিও একমত। কিন্তু গতানুগতিক নেতিবাচক প্রোগ্রাম ও শিক্ষণীয় ম্যাসেজের বিপরীতে স্টার টিভি গতকাল সন্ধ্যায় বিশ্বব্যাপী যে লাইভ প্রোগ্রাম প্রচার করে তাতে যেমন অনেক শিক্ষণীয় এবং অনুকরণীয় বিষয় রয়েছে একই সাথে ভারতীয় উদার গণতান্ত্রিক একটা সুন্দর ও পরমত সহিঞ্চুতার ম্যাসেজ পৌঁছে দিয়েছে আন্তরিকতার সাথেই। মূলত: আজকের সেই সুন্দর দিকটার অবতারণা নিয়েই কিছু কথা।
) অনেক মন্দের এবং অনেক ধর্মীয় উন্মাদনার মধ্যেও ভারতীয় গণমাধ্যম স্টার টিভিতে গত সন্ধ্যায় আপ কা আদালত এর ২১ বছর পূর্ণ উপলক্ষে এর উপস্থাপক রজত শর্মাকে নিয়ে যে অনুষ্ঠান প্রচার করা হয়েছিলো, তাতে ভারতের রাষ্ট্রপতি শ্রী প্রণব বাবু, ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী শ্রী নরেন্দ্র মোদী সহ নামকরা সকল রাজনীতিবিদ, সচিব এবং তারকাঙ্গনের শ্রেষ্ট ও খ্যাতিমান সকল ব্যক্তিত্বই অংশ গ্রহণ করেছিলেন। অনুষ্ঠানটি সরাসরি (লাইভ) টেলিকাস্ট করা হচ্ছিলো মোম্বাই থেকে। অনুষ্ঠানে দেখা গেলো ভারতীয় সিনেমার তিন খান একত্রিত হয়ে মঞ্চে
এসে আপ কা আদালতে প্রেজেন্টারকে যেমন সম্মানিত করছেন, একই সাথে রজত শর্মার আদলে আদালতে দাঁড় করিয়ে তার ব্যক্তিগত সেই সব স্মৃতিময় অভিজ্ঞতাগুলো দর্শকদের সাথে সরাসরি শেয়ার করছেন। আর দর্শকসারিতে বসে ভারতের রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, সচিব, বিরোধী রাজনীতিবিদ, চলচ্চিত্র তারকা সকলেই উপভোগ করছেন।
) মজার ব্যাপার হলো সরাসরি সেই অনুষ্ঠানে দেখা গেলো অনুষ্ঠানের বিভিন্ন পর্যায়ের সেই সব প্রেজেন্টাররা ঘুরে ফিরে দর্শক আর নেতাদেরকেও প্রশ্ন করে অনুভূতি জানতে চাচ্ছেন এবং তারাও সাবলীলভাবে জবাব দিয়ে চলেছেন। এক পর্যায়ে ভারতের রাষ্ট্রপতি এবং প্রধানমন্ত্রীর কাছে প্রেজেন্টার প্রশ্ন নিয়ে আসলে তারা পর্যায়ক্রমে দুজনই দাঁড়িয়ে বিনয়ের সাথে প্রেজেন্টারের প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন। নরেন্দ্র মোদী আরো একধাপ এগিয়ে। দাঁড়িয়ে করজোরে হাত তুলে সকলকে সালাম, নমস্কার জানিয়ে জবাব দেন। এক পর্যায়ে একজন প্রেজেন্টার নরেন্দ্র মোদীর পীঠের কাঁধের উপর হাত দিয়ে আন্তরিকতার সাথে যখন প্রশ্ন করে বসেন, তখনো ব্যতিক্রম প্রধানমন্ত্রী বিনয়ের সাথে নিজের আসন থেকে হাসি মুখে দাঁড়িয়ে নমস্কার জানিয়ে জবাব দেন। প্রধানমন্ত্রী এবং রাষ্ট্রপতির আশে পাশের নিরাপত্তা বলয়েরও এতে কোন ব্যত্যয় ঘটেনি বা তাদের নিরাপত্তা রক্ষীরা দৌড়ে এসে বারণ করেননি।
) প্রিয় পাঠক ঠিক এ জায়গায় প্রশ্ন এসে যায়। ভারতেও গণতান্ত্রিক শক্তি ও রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় এবং ক্ষমতার বাইরেও রাজনৈতিক দল। তাদেরও নিরাপত্তার যেমন প্রয়োজন, ঠিক তেমনি নিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি খুবই সেনসিটিভ একটা বিষয়। অথচ ঠিক তার বিপরীতে আমাদের প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলীয় নেত্রী, সংসদের ভিতরের বিরোধী দলীয় নেত্রী, এরশাদ সহ মেনন, ইনু, কামাল, রব, মান্না কেউই হলফ করে বলতে পারবেননা, জনগণের জন্য এমন খোলামেলা ও আন্তরিকভাবে, বিনয়ের সাথে গণতান্ত্রিক মতামতের প্রতি শ্রদ্ধা পোষণ করে এভাবে প্রশ্নের জবাব দিতে। শুধু কি তাই এমন শান্ত ও সহনীয়ভাবে, নমনীয়তার সাথে একজন টেলিভিশন প্রেজেন্টারের প্রশ্নের বা জানার কোন কিছুর জবাবে ধীর স্থির ভাবে বিনয়ের সাথে জবাব দিতে দেখা যায়নি। বরং টক শোর মতো ছোট অনুষ্ঠানেও নেতা নেত্রী, শিক্ষিত, আধা-শিক্ষিত, সুশীল-অ-সুশীল সকলেই এমন তর্কে মেতে উঠেন, অপরের কোন বক্তব্যই গ্রহণ দূরে থাকুক, চেঁচা মেচি আর হাত উঁচিয়ে তর্জনী গর্জনী করে পুরো বিষয়টিকে পণ্ড করে দেন। এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হরহামেশা আমরা চ্যানেলগুলোতে দেখি। আর ভিআইপি ও ভিভিআইপিদের ক্ষেত্রে চিন্তাও করা যায়না। তাদের এতো নিরাপত্তা বেষ্টনী থাকে, সাংবাদিকের প্রশ্নের জবার দিতেও তারা উষ্মা প্রকাশ ও বিরক্তি বোধ করেন, যদি উনি হন দলীয় লোকের বাইরে তাহলেতো কথা নেই, তিরস্কার ভাগ্যে অবধারিত।আর এরকম অনুষ্ঠানে সকলকে আন্তরিকতা পূর্ণভাবে কোন প্রেজেন্টার নিয়ে আসার চিন্তা করাতো দূরে থাকুক, কল্পনাও করতে পারবেননা। আর যদি আসেন তাহলে একদিকে যেমন নিরাপত্তা ব্যবস্থা অন্যদিকে দলীয় ক্যাডার আর পাতি নেতাদের হুমকি ধমকি, সেই সব অতিক্রম করে সহজেই কোন কিছু জিজ্ঞাসা করা রীতিমত সোনার হরিণ।কোন সেলেব্রিটিও তাদেরকে কোন প্রশ্ন করতে পারেননা। যদি করেনও তাহলে কি হয়- সকলেরই জানা। অথচ ভারত কিংবা বিশ্বের অন্যান্য দেশের নেতা নেত্রীরাও রাজনীতি করেন, আমাদের নেতা নেত্রীরাও রাজনীতি করেন। ক্ষমতা আর প্রতিপত্তি পেলেই তারা হয়ে যান অস্পৃশ্য এক আজব অবস্থানে থাকেন যেখানে সাধারণ নয়, নিজের দলীয় সাধারণ মানের কণ নেতার পক্ষেও স্পর্শ নয়, কাছে যাওয়াও হয়ে যায় পাপ। তাদেরকে শুধু মূর্তির ন্যায় দেখতে হয় আর দূর থেকে গলা ফাটিয়ে শ্লোগান দিতে হয়। হায়রে আমাদের রাজনীতি আর নেতা নেত্রীরা। কারণ তারা এটা খুব আরাম আয়েশে উপভোগ করেন।
) আমি স্বপ্ন দেখি, আমাদের দেশেও এধরনের অবস্থা তৈরি হবে একদিন। যেদিন কোন নেতা নেত্রী নিজেদেরকে আর ভগবানতুল্য, অসম্ভব শক্তিশালী, ক্ষমতাধর কেউ একজন মনে করবেনা, বরং নিজেকে মনে করবে জনগণের একজন সেবক।আমাদের দেশেও আছে অসংখ্য টেলিভিশন চ্যানেল। অনেক অনুষ্ঠানই বেশ আশাব্যঞ্জক এবং স্বপ্ন জাগানিয়া। আমাদের একজন শাইখ সিরাজ, ফরিদুর রেজা সাগর, আফজাল খান, হানিফ সংকেত, আনিসুল ইসলামের মতো ব্যক্তিদের সুযোগ দিলে তারাও এধরনের শুধু নয়, এর চাইতে উন্নতমানের এবং আমাদের সমাজ, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সাথে মানিয়ে আমাদের দেশ নেতা নেত্রী আর মন্ত্রী সচিব, তারকাদের নিয়ে অনুষ্ঠান উপহার দিতে পারেন, সাধারণ জনগণের সাথে সরাসরি যোগাযোগের সমন্বয় সৃষ্টি করে দিতে পারেন সন্দেহ নাই। কিন্তু আমাদের দেশে কি সেটা সম্ভব হবে ? কেননা আমাদের এই দেশে দুর্ভাগ্যক্রমে নেতা নেত্রী আর তারকারা নিজেদেরকে অন্যজগতের অস্পৃশ্য এক মানব নিজদেরকে মনে করেন, সাধারণের কাছে মিশতে ও ঘেষতে দিতে তাদের আত্মাভিমানে আঘাত লাগে ! মানুষে মানুষে এই ভেদাভেদ যতদিন থাকবে, ততোদিন আমাদের বিশ্ব থেকে এভাবে ছিটকে পড়ে থাকতে হবে। পরমত সহিঞ্চুতা যতদিন না অর্জন করতে পারবো, ততোদিন টকশোর মতো ছোট্র এপিসোডেও আমরা মারামারি হানাহানিতে লিপ্ত হবোই। আমরা যারা সাধারণ- ১৯৪৭ সাল থেকেই স্বপ্ন দেখে আসছি, স্বপ্ন দেখে দেখেই আমরা পরপারে চলে যাচ্ছি। একদল যাচ্ছি- আরেকদল স্থান দখল করছে- স্বপ্ন কেবল স্বপ্নই রয়ে গেছে। কিন্তু স্বপ্ন কি স্বপ্নই থাকবে ?

Comments are closed.

সর্বশেষ খবর

আজকের ছবি

www.facebook.com

Tag Cloud