April 5, 2026
আনিসুর রহমান তপন : রেলওয়ের আইন ও বিধিতে না থাকলেও প্রতিকি মূল্যে ভূমি মন্ত্রণালয় থেকে অধিগ্রহন করা রেলভূমি স্থায়ী বরাদ্দ দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। রাজধানী খিলগাঁওয়ে অবস্থিত শতকোটি টাকা মূল্যেরও অধিক দামি এই ভূমি দেয়ার প্রক্রিয়া চলছে রেল মন্ত্রণালয় ও রেলওয়ের কিছু কর্মকর্তার যোগসাজসে। অভিযোগ উঠেছে মন্ত্রণালয়ের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সহযোগিতায় প্রায় পৌনে চার একর আয়তনের এই অমূল্য সম্পদ পেতে যাচ্ছে রাজধানীর সাউথ পয়েন্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজ নামের একটি প্রতিষ্ঠান।
জানা গেছে, ইঞ্জিনিয়ার এমএ রশিদ ফাউন্ডেশন এর অধীনে পরিচালিত সাউথ পয়েন্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজের অনুকুলে রেলভুমি বরাদ্দ পাওয়ার জন্য রেলমন্ত্রী বরাবর আবেদন করেন ফাউণ্ডেশনের চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার এমএ রশিদ। আবেদন পত্রে জেলা-ঢাকা, মৌজা-শহর খিলগাঁও নং-২৮৭, থানা-মতিঝিল সিএস দাগ নং-১০৫৮, ১০৫৪, ১০৫৫, ১০৫১, ১০৫২ ও ১০৫০ এর ৩ দশমিক ৭৪ একর রেলভূমি প্রতিকি মূলে বা লাইসেন্স ফি ধার্য্য করে বরাদ্দ দেয়ার আবেদন করেন গত বছরের অক্টোবর মাসে। আবেদন জমার পরপরই কয়েক শত কোটি টাকা মূল্যের এই জমি কিভাবে স্কুল কর্তৃপক্ষকে বরাদ্দ দেয়া যায় শুরু হয় তোড়জোর। এতে মন্ত্রণালয়ের কিছু কর্মকর্তার অনৈতিক হস্তক্ষেপ করে বলেও অভিযোগ উঠেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রেলওয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং কোড ( রেলের ভূমি ব্যবস্থাপনার উদ্দেশ্য প্রণীত আইন) অনুযায়ী কোনো ব্যাক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে প্রতিকি মূল্যে রেলের কোনো ভূমি স্থায়ী বরাদ্দ দেয়া যায় না। রেল ভূমি ব্যবস্থাপনা আইনের ৮২৯ নং ধারায় বলা হয়েছে, যদি সরকার বা রাষ্ট্রের প্রয়োজনে কোনো অস্থায়ী স্থাপনা বা অবকাঠামো নির্মানের প্রয়োজনে ভূমির দরকার হয় সে ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানকে বর্তমান বাজার মূল্যে বরাদ্দ দিতে পারে।
তবে এক্ষত্রে রেল কর্তৃপক্ষকে বরাদ্দ দেয়ার আগে নিশ্চিত হতে হবে যে, রেল অবকাঠামো সম্প্রসারণ অথবা উন্নয়ন সংক্রান্ত কাজে এই ভূমি অবিষ্যতে প্রয়োজন হবে না। এই ধারায় আরো বলা আছে কোনো ব্যাক্তি, সংগঠন বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে ভূমি বরাদ্দ দিতে হলে টেন্ডার বা দরপত্রের মাধ্যমে সর্বোচ্চ দরদাতার কাছ থেকে রেল বিভাগের অনুকূলে সর্বোচ্চ সুবিধা নিশ্চিতের বিনিময়ে বরাদ্দ দিতে পারবে। একই আইনের ৮১৩ (এ) ধারায় বলা হয়েছে, রেল বিভাগ কর্তৃক বরাদ্দ করা কোনো ভূমিতে স্থায়ী স্থাপনা নির্মান করা যাবে না। একই ধারার অন্য আরেকটি ক্লজ-এ বলা হয়েছে, কোনো ব্যাক্তি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের অনুকুলে প্রতিকি মূল্যে (নাম মাত্র মূল্যে) রেল কর্তৃপক্ষ বা মন্ত্রণালয় কোনো অবস্থাতেই বরাদ্দ অনুমোদন করতে পারবে না।
জানা গেছে, সাউথ পয়েন্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজের আবেদন পত্রে যে ভূমি বরাদ্দ পাওয়ার আবেদন করা হয়েছে সেটা রেল পরিবহন ও স্থাপনা সম্প্রসারণ, উন্নয়নের প্রয়োজনে ভুমি মন্ত্রণালয়ের অধিভূক্ত জমি ঢাকা জেলা ডিসি’র মাধ্যমে অধিগ্রহন করেছে রেল বিভাগ। রেল কোড আইনে বলা আছে, যদি কোনো কারণে অধিগ্রহন করা ভূমি সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন না হয় তবে আইন মোতাবেক অধিগ্রহন করা জমি ভূমি মন্ত্রণালয়ের কাছে ঢাকা জেলা ডিসি’র মাধ্যমে ফেরত প্রদান করতে হবে। কোনো অবস্থাতেই এ জমি অন্য কোনো ব্যাক্তি,সংগঠন বা প্রতিষ্ঠানের নিকট হস্তান্তর করা যাবে না।
সূত্র জানায়, জোট সরকারের আমলে বিদ্যমান রেলের মূল আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে তৎকালিন যোগাযোগ মন্ত্রী, রেল ভূমি বরাদ্দ ও ব্যবস্থাপনার বিষয়ে একটি নীতিমালা গঠন করেন। যা রেল নীতিমালা ২০০৬ হিসেবে পরিচিত। অভিযোগ রয়েছে, সে সময় রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনে নয়। নিজ ও দলীয় স্বার্থে এই নীতিমালা তৈরী করা হয়। জোট সরকারের আমলে রাষ্ট্রীয় স্বার্থকে জলাঞ্জলি দিয়ে নীতিমালার আলোকে নাম মাত্র মূলে নিজ নিকটআÍীয়, দলীয় ব্যবসায়ী এবং কর্মীদের অনুকুলে রেল ভূমি বরাদ্দ করেছেন তৎকালীন মন্ত্রী।
এ সংক্রান্ত অবৈধ ভূমি বরাদ্দ বিষয়ে এখনো কয়েকটি মামলা আদালতে চলমান রয়েছে। বিগত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী নাজমুল হুদা তার স্ত্রীর মানবাধিকার প্রতিষ্ঠানকে পাঁচ কোটি টাকা মূল্যের জমি মাত্র পাঁচ হাজার এক টাকায় দীর্ঘমেয়াদী বরাদ্দ দিয়েছিলেন।
তখন এ নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়েছিল।
সূত্র জানায়, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর এখন পর্যন্ত রেলের কোনো জমি ব্যাক্তি, সংগঠন বা প্রতিষ্ঠানের নামে বরাদ্দ দেয়া হয়নি। তবে সরকারের শেষ সময়ে স্কুল ও কলেজের নামে অবৈধ প্রক্রিয়ায় আইনের তোয়াক্কা না করে ২০০৬ রেল নীতিমালার আশ্রয়ে ভূমি বরাদ্দের নামে বিপুল অংকের টাকা হাতিয়ে নেয়ার চেষ্টা করছে রেলওয়ে এবং মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা।
রেল সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, বর্তমান সরকারের শেষ সময়ে অবৈধ এসব কাজের মাধ্যমে সরকারকে বিতর্কিত করার অপচেষ্টা করছে প্রশাসনে ঘাপটি মেরে থাকা দুর্নীতিবাজ কিছু কর্মকর্তা। কর্মকর্তাদের অভিযোগ এই নীতিমালা অনুসরণে মন্ত্রীকে বোঝানোর চেষ্ট করছে যে, বিশেষ বিবেচনায় নাম মাত্র বা প্রতিকি মূল্যে মন্ত্রীকে রেল ভূমি বরাদ্দ দেওয়ার ক্ষমতা দেয়া হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে একটি মহলের প্ররোচনা ও একজন মন্ত্রীর ইচ্ছায় ইতিমধ্যে রেলওয়ের কেন্দ্রীয় ভূ-বরাদ্দ কমিটি এই জমি সাউথ পয়েন্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজকে বরাদ্দ দেওয়ার সুপারিশ করেছে। কমিটি সুপারিশের সঙ্গে কিছু শর্ত জুড়ে দেয়। যা মূলত তাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট। বরাদ্দের বিষয়টি এখন মন্ত্রীর অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।