April 23, 2026
স্টাফ রিপোর্টার: নয়া সরকার গঠনের পর এবার স্থানীয় সরকার নির্বাচনে নজর দিচ্ছে আওয়ামী লীগ। বছরের শুরু থেকেই একের পর এক নির্বাচন দিয়ে প্রধান বিরোধী পক্ষকে ব্যস্ত রাখতে চায় ক্ষমতাসীন দল। এ জন্য উপজেলা নির্বাচনের সব প্রস্তুতিও সম্পন্ন করেছে নির্বাচন কমিশন। এবার তিন ধাপে উপজেলা নির্বাচন করা হচ্ছে। এরপর মেয়াদোত্তীর্ণ পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন নির্বাচন করা হবে। ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহ থেকে নির্বাচন অনুষ্ঠান শুরু হবে। বিএনপির তৃণমূলের নেতারা যেন সরকারবিরোধী আন্দোলন থেকে সরে গিয়ে নির্বাচনমুখী হয় মূলত সে লক্ষ্যেই সরকার এ কৌশল নিয়েছে। গতকাল আওয়ামী লীগের একাধিক নীতিনির্ধারক জানিয়েছেন, জাতীয় নির্বাচনে অংশ না নেয়ায় বিরোধী পক্ষের তৃণমূলে অনেক নেতাকর্মী হতাশায় ভুগছেন। উপজেলা নির্বাচনে তারা অংশ নিতে চান। ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের মতে, নির্বাচনী আমেজ তৈরি হলে বিরোধী দল সরকারবিরোধী আন্দোলন করতে পারবে না। সূত্র জানিয়েছে, উপজেলা নির্বাচনের পর পরিস্থিতি বুঝে ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচন অনুষ্ঠান সরকারের শীর্ষ মহলের চিন্তা রয়েছে। এ ছাড়া যেসব পৌরসভার মেয়াদ শেষ হয়েছে ওই সব পৌরসভারও নির্বাচন আয়োজন করা হবে পর্যায়ক্রমে। এদিকে গতকাল আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকেও উপজেলা ও সিটি করপোরেশন নির্বাচনের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। দলীয় সূত্র জানিয়েছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দল সমর্থিত একক প্রার্থী দেয়ার বিষয়ে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এ জন্য নেতাদের আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব দেয়া হবে।
উপজেলা নির্বাচনের তফসিল আজ
তিন ধাপে উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের প্রথম দফার তফসিল ঘোষণা হচ্ছে আজ। এবারই প্রথমবারের মতো চতুর্থ উপজেলা নির্বাচন তিন ধাপে করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। গতকাল সন্ধ্যায় জরুরি বৈঠক করে ৪৮৭টি উপজেলা নির্বাচন তিন ধাপে করার সিদ্ধান্ত নেয় ইসি। প্রথম ধাপে ১৮ থেকে ২২শে ফেব্রুয়ারিতে মেয়াদোত্তীর্ণ ১১৩ উপজেলায় ভোটগ্রহণ করা হবে। এরপর দ্বিতীয় ধাপের নির্বাচন ১৮ থেকে ২৫শে মার্চ এবং তৃতীয় ধাপের নির্বাচন মে মাসের মাঝামাঝিতে সম্পন্ন করা হবে বলে জানিয়েছে ইসির সংশ্লিষ্ট সূত্র। এর আগে গতকাল বিকালে আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকে স্থানীয় সরকার, শিক্ষা ও প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে এ-সংক্রান্ত আলোচনা করে কমিশন। বৈঠক শেষে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ বলেছেন, সবগুলো উপজেলায় একসঙ্গে নির্বাচন করা সম্ভব নয়। এতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং সংশ্লিষ্টদের ওপর প্রচণ্ড চাপ পড়বে। কমিশন কয়েক দফায় এ নির্বাচন করবে। তিনি বলেন, ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে বেশ কিছু উপজেলার সময়সীমা শেষ হচ্ছে। সেগুলো আগেই করে ফেলা হবে। তবে এ বিষয়ে আজ কমিশন বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে বলেও জানান তিনি। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার যাবতীয় প্রস্তুতি শেষ করেছে কমিশন। আজ সকাল ১১টায় বৈঠক শেষেই প্রথম ধাপের তফসিল ঘোষণা করা হবে। এদিকে আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারও নির্বাচন করা নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে কোন বাধা নেই বলে কমিশনকে জানিয়েছেন। গতকাল এ বৈঠকে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সভাপতিত্বে ৪ নির্বাচন কমিশনার, ইসি সচিব, শিক্ষা সচিব, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বিভাগের মহাপরিচালক, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব ও মহাপরিচালকসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে উপস্থিত কর্মকর্তারা জানান, আগামী ফেব্রুয়ারির মধ্যে মেয়াদোত্তীর্ণ ১১৩টি উপজেলায় নির্বাচন করার বিষয়ে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছে ইসি। এ ব্যাপারে কমিশনের প্রস্তুতি সম্পর্কে মন্ত্রণালয়কে ধারণা দেয়া হয়। পরে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব কামাল আবদুল নাসের চৌধুরী ১৮ই ফেব্রুয়ারি থেকে ২২শে ফেব্রুয়ারির মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা জানান। এ সময় মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বিভাগের মহাপরিচালক ফাহিমা খাতুন জানান, ৯ই ফেব্রুয়ারি থেকে ২২শে মার্চ পর্যন্ত পরীক্ষা রয়েছে। এ ছাড়া এইচএসসি পরীক্ষাও রয়েছে। তফসিল ঘোষণার সময় এসব বিষয় বিবেচনায় রাখতে অনুরোধ জানান তিনি। এ ছাড়া যে সময়ই তফসিল ঘোষণা করা হোক না কেন কমিশনকে পর্যাপ্ত সহায়তা করা হবে বলেও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলো থেকে জানানো হয়। প্রথম ধাপের ১১৩ উপজেলা হলো- পঞ্চগড়ের সদর, বোদা, আটোয়ারী, দেবীগঞ্জ উপজেলা, দিনাজপুরের কাহারোল, খানসামা উপজেলা, নীলফামারীর ডিমলা, সৈয়দপুর ও জলঢাকা উপজেলা, রংপুরের সদর, গংগাচড়া, তারাগঞ্জ, মিঠাপুকুর, পীরগাছা, পীরগঞ্জ ও কাউনিয়া উপজেলা, কুড়িগ্রামের ভুরুঙ্গামারী, ফুলবাড়ী ও উলিপুর উপজেলা, গাইবান্ধার সাঘাটা ও গোবিন্দগঞ্জ উপজেলা, জয়পুরহাটের পাঁচবিবি, বগুড়ার দুপচাঁচিয়া, সারিয়াকান্দি, ধুনট, নন্দীগ্রাম, শেরপুর ও সোনাতলা উপজেলা, চাঁপাই নবাবগঞ্জের নাচোল, নওগাঁর রানীনগর, মান্দা ও মহাদেবপুর উপজেলা, রাজশাহীর মোহনপুর উপজেলা, নাটোরের সিংড়া, সিরাজগঞ্জের সদর, কাজীপুর, রায়গঞ্জ, উল্লাপাড়া উপজেলা, পাবনার সাঁথিয়া, সুজানগর ও আটঘড়িয়া উপজেলা, মেহেরপুরের সদর উপজেলা, কুষ্টিয়া সদর, ভেড়ামারা উপজেলা, ঝিনাইদহ সদর, কালীগঞ্জ, কোটচাঁদপুর ও শৈলকুপা উপজেলা, যশোরের অভয়নগর উপজেলা, মাগুরার শ্রীপুর ও সদর উপজেলা, নড়াইলের কালিয়া, খুলনার দিঘলিয়া ও কয়রা উপজেলা, সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলা, পটুয়াখালী সদর, ভোলার বোরহানউদ্দিন ও লালমোহন উপজেলা, বরিশালের গৌরনদী ও বাকেরগঞ্জ উপজেলা, টাঙ্গাইল সদর উপজেলা, জামালপুরের সদর ও সরিষাবাড়ী উপজেলা, শেরপুরের নকলা উপজেলা, নেত্রকোনার দুর্গাপুর ও কেন্দুয়া উপজেলা, কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ, বাজিতপুর ও নিকলী উপজেলা, মানিকগঞ্জের দৌলতপুর, সিংগাইর, সাটুরিয়া ও শিবালয় উপজেলা, ঢাকার ধামরাই, দোহার ও নবাবগঞ্জ উপজেলা, গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলা, নরসিংদীর পলাশ ও বেলাব উপজেলা, রাজবাড়ীর সদর, বালিয়কান্দি ও পাংশা উপজেলা, গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী ও মকসুদপুর উপজেলা, মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলা, শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জ, জাজিরা, ডামুড্যা, গোসাইরহাট উপজেলা, সুনামগঞ্জের দক্ষিণ সুনামগঞ্জ, দোয়রাবাজার ও ছাতক উপজেলা, সিলেটের বিশ্বনাথ, জকিগঞ্জ, কোম্পানীগঞ্জ, গোপালগঞ্জ, গোয়াইনহাট, জৈন্তাপুর ও বিয়ানীবাজার উপজেলা, মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলা, হবিগঞ্জের বাহুবল ও মাধবপুর উপজেলা, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া উপজেলা, কুমিল্লার মেঘনা উপজেলা, চাঁদপুরের শাহরাস্তি উপজেলা, ফেনীর সোনাগাজী উপজেলা, চট্টগ্রামের হাটহাজারী ও মিরসরাই উপজেলা, খাগড়াছড়ি সদর, মাটিরাঙ্গা, মহালছড়ি, পানছড়ি ও মানিকছড়ি উপজেলা। ইসির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, আইন অনুযায়ী উপজেলা পরিষদের মেয়াদ পাঁচ বছর পূর্ণ হওয়ার আগের ১৮০ দিনের মধ্যে এ নির্বাচন করার বিধান রয়েছে। এ জন্য কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী নির্বাচনের সার্বিক প্রস্তুতি সম্পন্ন করে রাখা হচ্ছে। শপথ গ্রহণের পর প্রথম বৈঠকের দিন থেকে ৫ বছরের মেয়াদ গণনা শুরু হয়। এ কারণে ভিন্ন ভিন্ন সময়ে এসব উপজেলা নির্বাচনের সময়সীমা শেষ হচ্ছে। কমিশনের হিসাব অনুযায়ী ফেব্রুয়ারিতে ৪৮ জেলার ১১৩টি, মার্চে ৫৯ জেলার ২২১টি, এপ্রিলে ২৬ জেলার ৩৬টি, মে মাসে ৩৫টি জেলার ৮৬টি উপজেলাসহ জুন-জুলাই মাসেও বেশ কিছু উপজেলার মেয়াদ শেষ হচ্ছে। এদিকে চতুর্থ উপজেলা নির্বাচনের ভোটকেন্দ্রের তালিকা চেয়ে আঞ্চলিক ও জেলা নির্বাচন কর্মকর্তাদের চিঠি দিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। আগামী ২৬শে জানুয়ারির মধ্যে এসব ভোটকেন্দ্র চূড়ান্ত করে ইসিতে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছে কমিশন। বৃহস্পতিবার স্থানীয় সরকার সংশ্লিষ্ট নির্বাচন শাখা থেকে সহকারী সচিব মোহাম্মদ আশফাকুর রহমান স্বাক্ষরিত জরুরি এক চিঠিতে এ নির্দেশনা দেয়া হয়। চিঠিতে বলা হয়, দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ব্যবহৃত ভোটকেন্দ্রগুলো চতুর্থ উপজেলা নির্বাচনেও বহাল রাখার নির্দেশ দেয়া হয়। পাশাপাশি ভোটার সংখ্যা অনুসারে প্রতি ৩০০ জন ভোটারের জন্য একটি করে ভোটকক্ষ রাখার কথাও বলা হয়েছে।