March 14, 2026
মধ্যরাতে রাজধানীর গ্রিন রোডে কেউ নেই। সহকর্মীর অসুস্থতার খবরে এই রাতে পায়ে হেঁটে হাসপাতালে যাচ্ছেন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা সোহরাব হোসেন। নির্জন রাস্তায় একা চলতে কিছুটা ভয় পাচ্ছিলেন তিনি। এক পর্যায়ে ভয় আরও বেড়ে যায় তার। দেখছিলেন অদূরে রাস্তায় দাঁড়িয়ে কম বয়সের কয়েকজন যুবক কিছু একটা করছে।
তাদের দেখে রাস্তায় বিভিন্ন সময় ঘটে যাওয়া ছিনতাইকারী বা সন্ত্রাসীদের কথা মনে পড়ে তার। কিন্তু এই পুরো রাস্তায় কারও চলাচল না থাকলেও সোহরাব মনে সাহস পেলেন আশপাশের প্রতিটি বাড়িতে থাকা নিরাপত্তারক্ষীদের দেখে। কাছাকাছি আসার পর যুবকদের দু’একজনকে সামনে এগুতে দেখে সাহস নিয়ে তিনি তাদের উদ্দেশ্য প্রশ্ন করেন, ‘এই তোমরা কি কিছু বলবা?’ তার এই সাহসী প্রশ্নে কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে পাশ কেটে চলে যায় যুবকের দল। সোহরাবও কোনও ঝামেলা না বাড়িয়ে পৌঁছে যান হাসপাতালে।
রাতের নির্জন নগরীতে এমন অসংখ্য সোহরাবের মনে সাহস যোগাচ্ছেন বাড়িতে বাড়িতে থাকা নিরাপত্তারক্ষীরা। মধ্যরাতে একা একা চলাচল করতে হলেও তেমন নিরাপত্তাহীন মনে করছেন না অনেকে। বাসা-বাড়িতে থাকা নিরাপত্তারক্ষী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর টহল সাহস যোগাচ্ছে তাদের।
পুরান ঢাকায় ব্যবসায়ী ফখরুল ইসলাম মোহাম্মদপুরের সলিমুল্লাহ সড়কে থাকেন। তিনি জানান, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গুছিয়ে বাসায় ফিরতে প্রায় দিনই রাত দেড়টা থেকে দুইটা বাজে। আসাদগেট পর্যন্ত বাসে আসলেও বাকি রাস্তাটা যান পায়ে হেঁটে।
ফখরুল ইসলাম বলেন, ‘আসাদগেট থেকে যাওয়ার সময় একবারের জন্যও ভয় কাজ করে না। কারণ আসাদগেট পার হয়ে একটু সামনে এগুলেই পুলিশের চেকপোস্ট। এরপর প্রতিটি বাড়িতে রয়েছে সিকিউরিটি গার্ড। চলার পথে কখনও নিজেকে ‘ইনসিকিউর’ মনে হচ্ছে না। কারণ কিছু হলে অন্তত পাশের বাড়ির গার্ডরা ছুটে আসবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, আট-দশ বছর আগেও বাড়িতে বাড়িতে এ ধরনের নিরাপত্তারক্ষী রাখার প্রবণতা ছিল নাল। হাতেগোনা কিছু বাড়ি ও বড় বড় প্রতিষ্ঠানে নিরাপত্তারক্ষী রাখা হতো। এছাড়া অধিকাংশ বাড়িই থাকতো অরক্ষিত। নিজেরাই গেইট খুলে বাড়িতে ঢুকতেন বা বেরুতেন। দিন দিন জনগণের সচেতনা বেড়ে যাওয়ায় ও নিজেদের নিরাপত্তার স্বার্থে বাড়িতে বাড়িতে নিরাপত্তারক্ষী রাখার শুরু করেন নগরের সচেতন লোকজন।
এছাড়া পুলিশও নাগরিকদের সচেতনতা বাড়াতেও কাজ করে যাচ্ছে। কমিউনিটি পুলিশিং ও বিট পুলিশিংয়ের মাধ্যমে জনগণকে সচেতন করা হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতির জন্য বাড়িতে নিরাপত্তারক্ষী রাখা, সিসি ক্যামেরা স্থাপন, ভাড়াটিয়া ফরম পূরণসহ বিভিন্ন বিষয়ে সচেতনতা তৈরি করছে পলিশ বিভাগ।
এ ব্যাপারে যাত্রাবাড়ি থানার এসআই বিল্লাল আল আজাদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘কমিউনিটি পুলিশিং হলো থানাধীন এলাকায় সব শ্রেণির মানুষের মধ্যে কিছু মানুষকে সিলেক্ট করা। এলাকায় কোনও ধরনের অপরাধ সংঘটিত হলে তারা সবার আগে পুলিশকে জানিয়ে সহায়তা দেয়। আর এলাকা সন্ত্রাস ও অপরাধমুক্ত রাখতে ভূমিকা রাখবে এরা। এই কার্যক্রমের মাধ্যমে পুলিশ ও জনগণের মধ্যে একটা সেতুবন্ধন তৈরি হয়।’
আর বিট পুলিশিং সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘প্রতিটি থানা এলাকা বেশ কয়েকটি ইউনিটে ভাগ করা হয়। এর প্রতিটি ইউনিটকে বলা হয় বিট। আবার প্রতিটি বিটে পুলিশের একজনকে ইনচার্জ করা হয়। তারা জনগণের সঙ্গে নিয়মিত আলোচনা করেন। জনগণের মধ্যে সচেতনতা তৈরিতে কাজ করেন। এলাকার সমস্যা নিয়েও আলোচনা করা হয়।’
এসআই বিল্লাল আল আজাদ জানান, এই বিট পুলিশিংয়ে প্রতিনিয়ত বাড়িগুলোতে নিরাপত্তা বাড়ানোর কথা বলা হয়। অনুরোধ করা হয় বাড়িতে যেন সিকিউরিটি গার্ড রাখা হয় ও সিসি ক্যামেরা লাগানো হয়। সময়মতো ভাড়াটিয়া ফরম পূরণ করে জমা দিতেও তাড়া দেওয়া হয়। দীর্ঘদিন কাজ করার পর এই অবস্থার অনেক উন্নতি হয়েছে।
বাড়িতে নিরাপত্তারক্ষী থাকলে অপরাধ কমপক্ষে ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ কমে যায় বলে জানান তিনি।
বাড়িগুলোতে নিরাপত্তারক্ষী থাকায় অপরাধ অনেকটা কমে আসে বলে মনে করেন শাহবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা(ওসি) আবুল হাসান। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘জনগণের নিরাপত্তা দিতে বাংলাদেশ পুলিশ নিরলস কাজ করে যাচ্ছে। বাড়িতে নিরাপত্তারক্ষী রাখার ব্যাপারে আমরা সবসময় বাড়ির মালিকদের পরামর্শ দিয়ে আসছি। তাদের নিজেদের স্বার্থেই এটা দরকার। এছাড়া পাড়া-মহল্লাগুলোতে নিয়মিত টহল রয়েছে পুলিশ-র্যাবের। তাদের পাশাপাশি বাড়িগুলোতে নিরাপত্তারক্ষী থাকলে বাড়ির সঙ্গে মহল্লাও নিরাপদ থাকে।