May 2, 2026
ঢাকা: বর্ষা, পাবনার প্রত্যন্ত এক গ্রামের দরিদ্র কৃষক পরিবারের মেয়ে। বয়স মাত্র ৯ বছর। বছর দুয়েক আগে ক্যান্সার ধরা পড়ে তার। সেই থেকে টানা চিকিৎসা চলছে। ডাক্তারের ভাষ্য, বর্ষা সুস্থ হবে এমন নিশ্চয়তা তারা দিতে পারেন না। তবে সাধ্যমতো চিকিৎসা চালাচ্ছেন। প্রতিদিন বর্ষার পথ্য ৪টি করে ইনজেকশন। সঙ্গে নানা ওষুধ। যাতে ব্যথার কিছুটা উপশম হয়। বর্ষার মতোই আরও এক শিশু তানহা। পরিবারের কারও ব্লাড ক্যান্সার না থাকলেও গত দেড় বছর আগে তানহার ব্লাড ক্যান্সার ধরা পড়েছে। তার বয়স এখন মাত্র ৭ বছর। বর্ষা ও তানহার মতো ক্যান্সারে আক্রান্ত প্রায় অর্ধশত শিশু বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালের শিশু হেমাটোলজি অ্যান্ড অনকোলজি বিভাগে ভর্তি রয়েছে। যারা প্রতিনিয়ত মরণব্যাধি এ রোগ নিয়ে পড়ে আছে। বর্ষা বা তানহার মতো শিশুদের দেহে ক্যান্সারের মতো মরণ রোগের প্রবেশ কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। তথ্য মতে, দেশে প্রতি বছর প্রায় ১৩ হাজার শিশু ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছে। তবে প্রকৃত সংখ্যা অনেক বেশি। যার অধিকাংশই নথিভুক্ত হয় না। পেডিয়াট্রিক অনকোলজি ন্যাশনাল ডাটাবেইজ (পিওএনডি) সূত্রে জানা যায়, যুক্তরাষ্ট্র প্রতি বছর প্রায় সাড়ে ১২ হাজার আর সমগ্র দুনিয়ায় সংখ্যা ২ লাখের কাছাকাছি। ডাটাবেইজ অনুযায়ী, দেশে বছরে ১৩ হাজার শিশুর বিভিন্ন ধরনের ক্যান্সার ধরা পড়ে। তবে মৃত্যু হয় কত শিশুর স্পষ্ট কোনো হিসেব নেই। তবে তথ্য বলছে, বাংলাদেশে ক্যান্সারের তুলনায় অপুষ্টি আর অপুষ্টিসহ অন্য রোগে শিশু মৃত্যুর সংখ্যা অনেক বেশি।
যেভাবে শিশুদের মধ্যে ক্যান্সারের উপস্থিত বাড়ছে তা যথেষ্ট উদ্বেগজনক মনে করছেন শিশু ক্যান্সার বিশেষজ্ঞরা তারা বলছেন, দেশে যে হারে ক্যান্সার আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা বাড়ছে, তার মাত্র ১০ শতাংশেরও কম রোগী চিকিৎসার আওতায় আসছে। বাকি ৯০ শতাংশ ক্যান্সার আক্রান্ত শিশু যথাযথ চিকিৎসার আওতার বাইরে থেকে যাচ্ছে।
সূত্র অনুযায়ী গত ২ বছরে ২৬ হাজার ক্যান্সার আক্রান্ত শিশু রোগীর মধ্যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে মাত্র ১৩৩৫ জনকে চিকিৎসা দেয়া সম্ভব হয়েছে।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের পেডিয়াট্রিক হেমাটোলজি অ্যান্ড অনকোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান শিশু ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ প্রফেসর ডা. আফিকুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, গত ৪ বছর আগেও বাংলাদেশে ক্যান্সারে আক্রান্ত শিশুদের ৯০ শতাংশই মারা যেত। একই সময়ে উন্নত রাষ্ট্রে ক্যান্সারের আক্রান্ত ৯০ শতাংশ শিশুই চিকিৎসায় সুস্থ হয়েছেন। তিনি বলেন, ২০১২ সালের আগে দেশে কি সংখ্যক ক্যান্সার আক্রান্ত শিশু রয়েছে তার কোনো তথ্য ছিল না। ২০১২ সালে আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থার উদ্যোগে আমেরিকা ও কানাডা ইউনিভার্সিটি কলেজ হাসপাতালের সহায়তায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে আলাদাভাবে ক্যান্সার আক্রান্ত শিশুদের জন্য বিভাগ চালু হয়। সেই থেকে ওই দুই কলেজ হাসপাতাল থেকে শিশু ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ ডাক্তার ও নার্স নানা সময়ে বাংলাদেশে এসে সংশ্লিষ্ট ডাক্তার ও নার্সদের প্রশিক্ষণ দিয়ে আসছে।
প্রফেসর ডা. আফিকুল ইসলাম বলেন, শিশুদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রবণতা ব্লাড ক্যান্সারের, এর পরে রয়েছে ব্রেন টিউমার, বোন টিউমার ইত্যাদি। ২০১২ সাল থেকে বর্তমান পর্যন্ত ১৩৩৫ জন ক্যান্সার আক্রান্ত শিশুর রেজিস্ট্রেশন করা হয়েছে। যাদের অধিকাংশ এখনও এ বিভাগে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তিনি বলেন, চিকিৎসায় ৫৮ শতাংশ রোগী সুস্থ হলেও বাকি ৪২ শতাংশ রোগীকে সুস্থ করা সম্ভব হয়নি। যদিও আশার বিষয় শিশু ক্যান্সারের ৭৫ শতাংশ নিরাময় করা সম্ভব।
পেডিয়াট্রিক হেমাটোলজি অ্যান্ড অনকোলজি বিভাগের চিকিৎসক সূত্রে জানা যায়, বিভিন্ন সমীক্ষায় যেটা দেখা যাচ্ছে সেটা বেশ আশ্চর্যজনক। ক্যান্সার আক্রান্ত শিশুদের মাত্র ৫ শতাংশ বংশগত সূত্রে জিন মারফত ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়। বাকি প্রায় ৯৫ শতাংশ কিন্তু জন্ম পরবর্তীকালে পারিপার্শ্বিক কারণে ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছে। শিশুদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রবণতা ব্লাড ক্যান্সারের, যা শতকরা ৬০ শতাংশেরও উপরে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে চিকিৎসকরা (শিশু ক্যান্সার বিষয়ক বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ছাড়া) ক্যান্সার ধরতেই পারছেন না। এর কারণ শিশু ক্যান্সারের আলাদা লক্ষণ, কখনও বা জ্বর, কখনও দেহে বিশেষ চিহ্ন বা মাড়ি থেকে রক্ত পড়া ইত্যাদি আলাদা উপসর্গ থেকে ক্যান্সার দেখা দিচ্ছে।
বিশেষজ্ঞ ডাক্তারদের মতে, জিনগত ক্যান্সার ছাড়া নগরায়নের পরোক্ষ প্রভাবেই শিশুদের মধ্যে ক্যান্সারের ঘটনা বাড়ছে। ভাইরাস, দূষণ আর বিকিরণের মাত্রা বৃদ্ধি ক্যান্সারের মূল কারণ। শিশু ক্যান্সার বিশেষজ্ঞদের মতে, অধিক মাত্রায় শিল্পায়ন, উন্নয়ন শিশুদের শরীরে ক্যান্সার জন্ম দিচ্ছে। আমেরিকা আর কানাডায় শিশু মৃত্যুর প্রধান কারণ ক্যান্সার। ইউরোপে বছরে প্রায় ৭ শতাংশ শিশু ক্যান্সারে মারা যায়। এসব তথ্য থেকেও এটা পরিষ্কার যে, নগরায়ন আর শিশু ক্যান্সারের বৃদ্ধির মধ্যে সমানুপাতিক সম্পর্ক বিদ্যমান।
তথ্য মতে, ফরমালিনযুক্ত নানা খাবার, ফলমূল এবং পানি ও বাতাসবাহিত ভাইরাস তথা কম অনাক্রমণ্যতা জন্ম দেয় জিন পরিবর্তনের, যা ক্যান্সারের পথ প্রশস্ত করে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে পেডিয়াট্রিক হেমাটোলজি অ্যান্ড অনকোলজি বিভাগ সূত্রে জানা যায়, বছর তিনেক আগেও মাসে ১-২ জন শিশু ক্যান্সার পরীক্ষা করাতে আসতো। আর এখন প্রতিদিন অনেক শিশু আসে। তথ্য মতে, জিনগত ছাড়াও প্রতিদিন শিশুরা যে খাবার খাচ্ছে বা শ্বাস নিচ্ছে তার থেকেও শরীরে ক্যান্সারের অনুপ্রবেশ ঘটতে পারে।
শিশু বিশেষজ্ঞ ও জাতীয় অধ্যাপক ডা. এমআর খান বলেন, দেশের এক-তৃতীয়াংশ শিশুর ক্যান্সার সঠিক সময়ে নির্ণয় করতে পারলে নিরাময় সম্ভব। সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি এ ব্যাপারে প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়াকে এগিয়ে আসতে হবে।
মেয়েদের বিশেষ করে গর্ভাবস্থায় লাইফ স্টাইল ও খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করতে হবে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) তড়িৎ ও ইলেকট্রিক প্রকৌশল অনুষদের ডিন প্রফেসর ড. আমিনুল হক যুগান্তরকে জানান, টাওয়ারের বিকিরণে শুধু শিশুই নয়, সব বয়সী মানুষেরই ক্ষতি হয়। তার মতে, বাড়ির কাছাকাছি টাওয়ার থাকলে তার বিকিরণে মানুষের ওপর প্রভাব পড়তে পারে।
এ বিষয়ে তথ্য ও প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক যুগান্তরকে বলে, মোবাইল টাওয়ারের বিকিরণে জনস্বাস্থে প্রভাব পড়ছে এমন কোনো সঠিক তথ্য নেই। বিকিরণের ফলে স্বাস্থ্য ঝুঁকি হচ্ছে এমনটা হলে অবশ্যই তা যথাযথ পর্যায়ে ব্যবস্থা নেয়া হবে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গেও এ বিষয়ে কথা বলবেন জানিয়ে তিনি বলেন, প্রযুক্তির চেয়ে জনস্বাস্থ্য বেশি জরুরি।