February 17, 2026
ঢাকা: নির্বাচনবিরোধী আন্দোলনে পর এবার সরকারবিরোধী আন্দোলনের নানা পরিকল্পনা করছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৯ দলীয় জোট। আর এ আন্দোলন চাঙ্গা করতে ফের হেফাজতে ইসলামকে কাজে লাগাতে তৎপর হয়ে উঠেছে ১৯ দলীয় জোট। তৎপরতার অংশ হিসেবে হেফাজতের নেতাকর্মীদের উসকানি, শীর্ষ নেতাদের অর্থের প্রলোভন ও প্রভাবিত কয়েকটি গণমাধ্যমকেও ব্যবহার করছে। এমনকি উপজেলা নির্বাচনেও হেফাজতের প্রার্থীদের নীরব সমর্থন দিয়েছে ১৯ দলীয় জোট। উদ্দেশ্য আন্দোলনে রাজপথে নামানো। উপজেলা নির্বাচনের প্রথম দফায় অনুষ্ঠিত গত ১৯ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে হাটহাজারী উপজেলা পরিষদে ভাইস চেয়ারম্যান পদে জয়ী হয়েছেন হেফাজত সমর্থিত প্রার্থী নাসির উদ্দিন মুনীর। ভাইস চেয়ারম্যান পদে মুনীরকে জিতিয়ে আনতে তারা প্রথমে চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী দিলেও ১৯ দলীয় জোটের সাথে ঐক্য করে ভাইস চেয়ারম্যান পদে একক প্রার্থী নির্ধারণ করে হেফাজত।
বিএনপির বিজয়ী চেয়ারম্যান প্রার্থী মাহবুবুল আলম চৌধুরীর পক্ষে কাজ করেছেন হেফাজত নেতাকর্মীরা আর বিএনপির কোনো প্রার্থী দেয়া হয়নি ভাইস চেয়ারম্যান পদেও। ফলে দু’টিতেই জয়ী হয়েছেন তারা। এছাড়া সমঝোতার কারণে জয়ী হয়েছেন মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে জামায়াতের প্রার্থীও। বরাবর অরাজনৈতিক সংগঠন দাবি করলেও সংগঠনটির নেতাকর্মীরা প্রচার প্রচারণায় অংশগ্রহণ করেন উপজেলা নির্বাচনে। অংশগ্রহণকারীরা হেফাজতের কেউ নয় দাবি করলেও রাতের আঁধারে নিজেদের প্রার্থীর পক্ষে জনসংযোগ করেছেন সংগঠনটির মহাসচিব মাওলানা জুনায়েদ বাবুনগরী। গত ৫ জানুয়ারি আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে নতুন সরকার গঠন হওয়ার পর সুবিধা করতে পারছে না বিএনপি-জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১৯ দলীয় জোট। আন্দোলনে জামায়াতের নির্লিপ্ততা, বিএনপির সিদ্ধান্তহীনতাসহ সর্বোপরি নিষ্ক্রিয় জোট। এই মুহূর্তে সক্রিয় আন্দোলনে জন্য হেফাজতকে ব্যবহারে পরিকল্পনা নিয়েছে ১৯ দলীয় জোট। বিএনপি ও হেফাজত সূত্রে জানা এমন তথ্য।
মূলত দলীয় কলহ, অবিশ্বাস-দ্বন্দ্বের কারণে বিএনপি এবং সংগঠন গোছাতে ব্যস্ত জামায়াত। জোটের বাকি দলগুলো নেতা আর নাম সর্বস্ব। ফলে বেশি জনবলের সক্রিয় আন্দোলনে হেফাজতকে ফের মাঠে নামিয়ে সরকারবিরোধী আন্দোলনের শুরু করতে দেখতে চায় ১৯ দলীয় জোট। এদিকে নানা কারণেই হেফাজতের ঢাকার নেতৃত্বে চলছে টানপোড়ান। লালবাগে ইসলামী ঐক্যজোট অংশটির চেয়ে এখন হেফাজতের রাজধানীর বারিধারা অংশটির বেশ সক্রিয়। তাই তাদের দিকেই নজর দিয়েছে ১৯ দলীয় জোট। এ কারণে হেফাজতের ঢাকার আহ্বায়ক মাওলানা নূর হোসাইন কাশেমিকে অংশটিকে কাছে টানার চেষ্টা করছে জোট। নানাভাবে দেওয়া হচ্ছে অর্থের প্রলোভনও।
হেফাজতের আপাতত রাজপথে নেমে কর্মসূচি দেওয়ার পরিকল্পনা নেই। সংগঠনটির নেতারা সারাদেশে ওয়াজ মাহফিলের মাধ্যমে ১৩ দফা দাবি নিয়ে আলোচনা করছেন। আগামী এপ্রিলের আগে কর্মসূচি নেই তাদের। হেফাজত ও জমিয়তের মহাসচিব মাওলানা মুহাম্মদ ওয়াক্কাছ দীর্ঘদিন জেলে আছেন। ফলে বিএনপির এ চাহিদা সহজেই পূরণ হচ্ছে না। জানা গেছে, মুফতি ওয়াক্কাছ মাসের পর মাস জেলে থাকলেও কোনও ধরনের আইনি এবং অর্থ সহায়তা দেয়নি ১৯ দলীয় জোট।
হেফাজতের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নেতা বলেন, ‘মুফতি ফয়জুল্লাহকে যতটা সহজে কেনা গেছে কাশেমি ও ওয়াক্কাস সাহেবের ক্ষেত্রে সেটা সহজ হবে না। এই দুজন আলেম দেওবন্দের অনুসারী। দেওবন্দি আলেমরা ১৯৭১ সালেও মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে ছিলেন। বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, হেফাজতের সঙ্গে বিএনপি-জামায়াত যোগাযোগের কাজটি করে আসছিলেন বিএনপির রাজনৈতিক সহযোগি ইসলামী ঐক্যজোটের মহাসচিব মুফতি ফয়জুল্লাহ ও যুগ্ম-মহাসচিব মাঈনুদ্দীন রুহি। কিন্তু গত ৫ মে শাপলা চত্বরে শিক্ষার্থীদের মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়ে তারা দুজনেই পালিয়ে গেলে সমালোচনার মুখে পড়েন। তাদের দুজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে উৎকোঁচ গ্রহণের। ফলে তাদের দুজনকেই হেফাজতের নীতিনির্ধারণী কমিটি রাখা হয়নি। এরপর এ অভিযোগ ওঠে হেফাজতের ঢাকার সদস্য সচিব মাওলানা জুনায়েদ আল হাবিবের বিরুদ্ধেও। তিনি ৫মে পরই লন্ডন চলে যান। সেখানে হেফাজতের শহীদ নেতাকর্মীদের ১ হাজার পাউণ্ড ও আহতদের জন্য ৫শ পাউণ্ড অনুদান সংগ্রহ করেন। কিন্তু আহত নেতাকর্মীদের তেমন কোনও সহায়তা দেয়নি হেফাজত। তবে এ বিষয়ে কোনো কথা বলেননি জুনায়েদ আল হাবিব।
অন্যদিকে বেশ কয়েকটি মামলা থাকায় বর্তমানে আত্মগোপনে আছেন ফয়জুল্লাহ। তবে মাঝে মধ্যে তিনি লালবাগে ছাত্র খেলাফত, খেলাফতে ইসলামী ও ইসলামী ঐক্যজোটের কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করেন। হেফাজতের শীর্ষসূত্রে জানা গেছে, মূলত ১৯ দলীয় জোট ইসলাম রক্ষার দোহাই দিয়ে যে কোনো উপায়ে রাজপথে নামাতে চায়। যদিও হেফাজতের নেতারা বলছেন, হেফাজত আগের মতো এখন আর বিএনপি-জামায়াতের দাবার ঘুঁটি হবে না। আগামী এপ্রিলের আগে কোনও রাজপথকেন্দ্রীক কর্মসূচি দেবে না সংগঠনটি। অতীতের কর্মকাণ্ড থেকে শিক্ষা নিয়ে আগামী দিনগুলোয় কর্মসূচি নির্ধারণ করবে সংগঠনটি। এ বিষয়ে হেফাজতের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আল্লামা আজিজুল হক ইসলাবাদী বলেন, ‘হেফাজত নিজ গতিতেই চলবে। সরকার হেফাজতের গতি বন্ধ করতে চায় বলে নিজেদের নিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যম ব্যবহার করে আল্লামা শফীকে বিতর্কিত করার চেষ্টা করছে। হেফাজতের আন্দোলন রাজনৈতিক নয়, কোনও দলের প্রভাবেও আন্দোলন করে না। আল্লামা শফী যেভাবে নির্দেশনা দেবেন, সেভাবে কাজ করবে সংগঠন।’
তবে হেফাজতের নতুন কর্মসূচির প্রশ্নে আশাবাদী নন নীতিনির্ধারক আল্লামা জাফরুল্লাহ খান। তিনি বলেন, ‘হেফাজত এখন আগের মতো অগোছালো নয়। এখন সময় এসেছে আমাদের দাবি বাস্তবায়নের জন্য রাজপথে নামার।’ ইসলামী ঐক্যজোটের আমির মাওলানা আবদুল লতিফ নেজামী বলেন, ‘উপজেলা নির্বাচন থাকায় এখন কোনও মাঠের কর্মসূচি নয়। এছাড়া হেফাজতের ওয়াজ মাহফিল কর্মসূচি সারাদেশে চলছে। ওয়াজ মাহফিল দিয়েই মানুষকে সজাগ করা সম্ভব। এজন্য রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড দরকার হয় না।’