May 7, 2026
নিউজ ডেস্ক: সাংবাদিক প্রবীর সিকদার গ্রেপ্তার হওয়ার প্রেক্ষাপটে আলোচনায় উঠে এসেছে তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারা। বিশ্লেষকরা বলছেন ‘আইনে থাকা এই ধারার দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে যে কারো উপরে দমন পীড়ন চালানো সম্ভব’। এই আইনি দুর্বলতার সুযোগ নিয়েই সাংবাদিক প্রবীর সিকদারকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে দাবি করে এরই মধ্যে আন্দোলনে নেমেছে গণজাগরণ মঞ্চ।

২০০৬ সালে প্রণীত তথ্যপ্রযুক্তি আইনে সংশোধন আনা হয় ২০১৩ সালে। সে বছরের ৮ই অক্টোবর সংসদে সংশোধীত আকারে পাশ হওয়ার পরও অব্যাহত ছিলো এর সমালোচনা। আইসিটি আইনের কিছু ধারা মত প্রকাশ অধিকারের হুমকিস্বরূপ বলে মন্তব্য করে হিউম্যান রাইটস এক বিবৃতি দিয়ে তখন দাবি করেছিলো, ‘মানবাধিকারকর্মীদের উদ্বেগকে আমলে না নিয়ে শাস্তির পরিমাণ আরও কঠিনতর করা হয়েছে। সংশোধিত এ আইনে পুলিশকে সরাসরি মামলা করার ও পরোয়ানা ছাড়া গ্রেপ্তার করার ক্ষমতা দেওয়া হয়।’
আর এর শিকার হয়েছেন শহীদ পরিবারের সন্তান প্রবীর সিকদার- এমন দাবি করছেন তার মুক্তির দাবিতে আন্দোলনে নামা সমর্থকেরা।
কী আছে আইসিটি আইনের ৫৭ ধারায়
আইসিটি আইনের ৫৭(১) এর যে ধারায় এই সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে, তাতে বলা আছে, ‘কোনো ব্যক্তি যদি ইচ্ছাকৃতভাবে ওয়েব সাইটে বা অন্য কোন ইলেক্ট্রনিক বিন্যাসে এমন কিছু প্রকাশ বা সম্প্রচার করেন, যাহা মিথ্যা ও অশ্লীল বা সংশ্লিষ্ট অবস্থা বিবেচনায় কেহ পড়িলে, দেখিলে বা শুনিলে নীতিভ্রষ্ট বা অসৎ হইতে উদ্বুদ্ধ হইতে পারেন অথবা যাহার দ্বারা মানহানি ঘটে, আইন শৃঙ্খলার অবনতি ঘটে বা ঘটার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়, রাষ্ট্র ও ব্যক্তির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয় বা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করে বা করিতে পারে বা এ ধরনের তথ্যাদির মাধ্যমে কোন ব্যক্তি বা সংগঠনের বিরুদ্ধে উস্কানী প্রদান করা হয়, তাহা ইহলে তাহার এই কার্য হইবে একটি অপরাধ৷’
আর ৫৭ (২) ধারা মোতাবেক, ‘কোন ব্যক্তি উপ ধারা(১) এর অধীন অপরাধ করিলে তিনি অনধিক দশ বৎসর কারাদণ্ড এবং অনধিক এক কোটি টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হইবেন’।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই আইনটি অস্পষ্টতার দোষে দুষ্ট। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবি ব্যরিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বলেন, ‘আইসিটি আইন এর মধ্যে মূলত ধারাটিতে ৭টি বড় ধরনের অস্পষ্টতা লক্ষ্য করা যায়। এগুলো হল, মিথ্যা ও অশ্লীল, নীতিভ্রষ্টতা, মানহানি, আইনশৃংখলার অবনতি, রাষ্ট্র ও ব্যক্তির ভাবমূর্তি, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত ও সংগঠনের বিরুদ্ধে উসকানি’।
ব্যারিস্টার জ্যোর্তিময় মনে করেন, ‘ওয়েবসাইটে বা অন্য কোনো ইলেকট্রনিক বিন্যাসে এমন কিছু প্রকাশ বা সম্প্রচারের কথা বলা হচ্ছে যা হবে মিথ্যা বা অশ্লীল। কিন্তু সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, নীতি বা নৈতিকতার কথা বলা থাকলেও কোন কোন বিষয়বস্তুকে অশ্লীল বা মিথ্যা হিসেবে আখ্যায়িত করা হবে তা এই ধারায় সুস্পষ্ট করা হয়নি। এক্ষেত্রে এ আইনটি সুনির্দিষ্টতার অভাবের কারণে দুষ্ট’।
একারণেই এই আইনের অপপ্রয়োগের সুযোগ আছে মনে করেন তিনি। প্রবীরের আটক/গ্রেপ্তারকে প্রশ্নবিদ্ধ মনে করেন ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময়। তিনি বলেন, ‘নিরাপত্তাহীন হযে যিনি ফেসবুকে অসহায়ত্ব প্রকাশ করলেন, তাকে নিরাপত্তা না দিয়ে বরং অভিযুক্ত ব্যক্তিদের দেয়া মামলায় প্রবীর সিকদারকে আটক করা অস্বাভাবিক।’ মামলার প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। প্রিয়.কম এর কাছে তার মন্তব্য, ‘অভিযোগে বর্ণিত ফেসবুক স্টাটাসে মামলার বাদি কিভাবে সংক্ষুদ্ধ হয়েছেন তা স্পষ্ট নয়। মানহানি ঘটলে মন্ত্রীর ঘটেছে।
মামলা করলে তিনি বা তার আইনগত প্রতিনিধিত্বকারি মামলা করতে পারেন। এমনকি তার আইনজীবিও মামলা করতে পারেনা। সেখানে এপিপি অ্যাডভোকেট স্বপন কুমার পাল কীভাবে সংক্ষুদ্ধ হলেন তা স্পষ্ট নয়।’ এদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক এবং বিশিষ্ট ব্লগার ফাহমিদুল হক বলেন, ‘সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো সারা পৃথিবীতেই শাসকদের ভীত করে তুলেছে। মানুষ যুথবদ্ধভাবে কথা বলা শুরু করলেই অপশাসনের বিরুদ্ধে কন্ঠস্বর জোরালো হয়ে ওঠে। তাতেই ভীত হয় শাসক’।
তথ্য প্রযুক্তি আ্ইনের ৫৭(১) ধারাকে কালো আইন বলে মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘নিরাপত্তা না দিয়ে এই আইনে সাংবাদিক প্রবীর সিকদারকে আটকের ঘটনা উদ্বেগজনক।’
সাংবাদিক প্রবীরের বিরুদ্ধে যে মামলা হয়েছে তাতে বলা হয়েছে, ‘জীবনহানির আশঙ্কা প্রকাশ করে তার জন্য মন্ত্রীকে দায়ী করে ফেইসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছিলেন প্রবীর সিকদার। এভাবে তথ্য প্রযুক্তির অপব্যবহারের মাধ্যমে মন্ত্রীর সুনাম ক্ষুণ্ন হয়েছে।’
স্ট্যাটাসে প্রবীর লিখেছিলেন, ‘আমি খুব স্পষ্ট করেই বলছি, নিচের ব্যক্তিবর্গ আমার জীবন শংকা তথা মৃত্যুর জন্য দায়ী থাকবেন : ১. এলজিআরডি মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেন এমপি, ২. রাজাকার নুলা মুসা ওরফে ড. মুসা বিন শমসের, ৩. ফাঁসির দণ্ডাদেশ প্রাপ্ত যুদ্ধাপরাধী বাচ্চু রাজাকার ওরফে মাওলানা আবুল কালাম আজাদ এবং এই তিন জনের অনুসারী-সহযোগীরা।’
সংবিধানের মূল চেতনার সঙ্গে ৫৭ ধারা সাংঘর্ষিক বলে মনে করেন ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া। তিনি বলেন, ‘৫৭ ধারাটি আইনটিতে এক প্রকার গোঁজামিলের ধারা। মূলত এ ধারাটি সংবাদপত্র ও নাগরিকের স্বাধীনতাকে খর্ব করছে, যা সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদের পরিপন্থী, যে অনুচ্ছেদে, দেশের সব নাগরিকের চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি কতিপয় শর্ত সাপেক্ষে নাগরিকের বাকস্বাধীনতা ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘৫৭ ধারা যদি প্রচলিত থাকে তাহলে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা অপব্যবহার করে অপছন্দের যে কাউকে দমন-পীড়ন চালানো যাবে। এমনিতেই মানুষ আতংকে রয়েছে। আর এই আতংকে থাকলে আর যাই হোক চিন্তার স্বাধীনতা থাকে না।’ সুত্র…প্রিয় ডট কম