April 21, 2026
ঢাকা: লম্বায় প্রতিটি খাঁচা ৩২ ফুট, পাশে ছয় ফুট, উপরে-নিচে আট ফুট। পাশাপাশি চার ইঞ্চি পরপর ও উপরে-নিচে সাড়ে পাঁচ ইঞ্চি পরপর লোহার ‘সলিড স্কয়ার বার‘ দিয়ে বানানো হচ্ছে খাঁচাগুলো। দেখতে অনেকটা চিড়িয়াখানার বাঘের খাঁচার মতো। প্রায় ৮৭ লাখ টাকা ব্যয়ে এরকম ২১টি খাঁচা তৈরি করা হচ্ছে রাজধানীর বখশিবাজার আলীয়া মাদ্রাসা মাঠের মহানগর দায়রা জজ আদালতের অস্থায়ী এজলাসে। এগুলো ব্যবহৃত হবে আসামিদের কাঠগড়া হিসেবে। খাঁচার মতো এসব কাঠগড়ার ভেতরে রেখেই পিলখানা হত্যা মামলায় সাজাপ্রাপ্ত বিদ্রোহী বিডিআর সদস্যদের বিস্ফোরক আইনের মামলার বিচার করা হবে। এছাড়া নিরাপত্তার জন্য এ আদালতে থাকছে সিসি ক্যামেরা ও বিভিন্ন সংস্থার গোয়েন্দাদের তীক্ষ্ণ নজরদারি।

সংশ্লিষ্টরা জানান, সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ২০১০ সালের ২৮ নভেম্বর পিলখানা হত্যা মামলার বিচারে রাজধানীর বখশিবাজারে আলীয়া মাদ্রাসা মাঠে মহানগর দায়রা জজ আদালতের অস্থায়ী এজলাস ভবন নির্মাণ কাজ শুরু হয়। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতরের (এলজিইডি) অর্থায়নে মাত্র দেড়মাস সময় নিয়ে নাভানা কনস্ট্রাকশন ইন্ড্রাস্ট্রিয়াল শিট দিয়ে আধাপাকা এ ভবন নির্মাণ করে। এলজিইডির স্থপতি এ বি এম নজরুল ইসলাম এ ভবনের নকশা তৈরি করেন। আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আইন ও বিচার বিভাগ থেকে এই নবনির্মিত ভবনকে ফৌজদারি কার্যবিধি ১৮৯৮ এর সেকশন ৯ (২) ধারায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে অস্থায়ী আদালত ভবন নির্মাণ করা হয়। প্রায় তিন হাজার লোকের ধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন এ ভবনটি ২৭০ ফুট লম্বা ও ৫৩ ফুট প্রস্থের। ভবনের ভেতরে পশ্চিম প্রান্তে এজলাস, বিচারকের খাস কামরা ও তার কর্মকর্তা-কর্মচারী ও জুরিবোর্ডের জন্য দুটি, রাষ্টপক্ষের আইনজীবীদের জন্য একটি কক্ষ বানানো হয়। এজলাসের সামনেই পেশকার বসার জন্য স্থান রাখা হয়। এজলাস থেকে ৩০-৩৫ ফুট দূরে দু‘স্তরে লোহার গ্রিল লাগিয়ে পিলখানা হত্যা মামলার বিচার কার্যক্রম চালানো হয়। ওই কাঠগড়ায় আট শতাধিক আসামি একসঙ্গেই সারি সারি করে সাজানো টেবিলে বসতেন।
২০১১ সালের ৫ জানুয়ারি থেকে এই এজলাসে প্রায় সাড়ে আটশ‘ বিদ্রোহী বিডিআর সদস্যের বিচার কার্যক্রম শুরু হয়। গত বছরের ৫ নভেম্বর হত্যা মামলার রায় দেওয়া হয়। এ রায়ে ১৫২ জনকে মৃত্যুদণ্ড, ১৬১ জনকে যাবজ্জীবন, ২৬২ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়। একই ঘটনায় দায়ের হওয়া বিস্ফোরক মামলারও আসামি তারা। কিন্তু বিস্ফোরক আইনের মামলাটি অনিষ্পন্ন থেকে যায়। নিরাপত্তাজনিত কারণে বিগত এক বছরেও ওই মামলার বিচার প্রক্রিয়া চালানো সম্ভব হয়নি। ফলে আসামি, স্বজন ও তাদের আইনজীবীরা ক্ষুব্ধ। গোয়েন্দারাও নিরাপত্তাহীনতার আশঙ্কা প্রকাশ করে সরকারের শীর্ষ মহলকে অবহিত করেন। সরকারের একটি গোয়েন্দা সংস্থার দেওয়া ওই প্রতিবেদনের পরই আদালত এই এজলাসে সাজাপ্রাপ্ত বিদ্রোহী বিডিআর সদস্যদের বিচার কার্যক্রম চালানোর বিষয়ে শঙ্কাবোধ করেন। মহানগর দায়রা জজ আদালতের অস্থায়ী এজলাসে নাশকতার আশঙ্কা করে দেওয়া গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়, বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো বিচারাধীন মামলার আসামি বিডিআর সদস্যদের মাধ্যমে বিশৃঙ্খলা ও নাশকতা সৃষ্টি করে সরকারকে বিব্রতকর পরিস্থিতির মধ্যে ফেলে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের চেষ্টা করতে পারে। বিভিন্ন দেশি-বিদেশি এনজিও এবং মানবাধিকার সংস্থা উস্কানি দিয়ে যেকোনও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র বাস্তবায়ন করার পাঁয়তারা হতে পারে।
গোয়েন্দা প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, বিদ্রোহী বিডিআর সদস্যদের আদালতে আনা-নেওয়ার পথে প্রিজনর ভ্যানের ভেতর কিংবা বাহির থেকে যেকোনও আক্রমণ বা নাশকতার চেষ্টা হতে পারে। আদালত কক্ষে সংঘবদ্ধ হয়ে আসামিরা অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি করে বিচারকাজে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। খাদ্য, বাথরুম, আত্মীয়-স্বজন ও আইনজীবীদের সঙ্গে সাক্ষাতসহ বিভিন্ন দাবির অজুহাতে আসামিরা সংগঠিত হয়ে বিশৃঙ্খলার সুযোগ নিতে পারে। বাহির থেকে খাওয়া-দাওয়া গ্রহণের সুযোগ নিয়ে খাবারের সঙ্গে বিষ বা অন্যকোনও অস্ত্রশস্ত্র সংগ্রহ করে নাশকতা ঘটানোর চেষ্টা করতে পারে। বিদ্রোহী বিডিআর সদস্যরা আদালত কক্ষের গ্রিল ও দেয়াল ভাংচুর করে পালানোর চেষ্টা করে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে পারে। এছাড়া কর্তব্যরত পুলিশ ও আইনজীবীসহ অন্যান্য সংস্থার লোকজনের ওপর অতর্কিত হামলা করে তাদের জিম্মি করে বিশৃঙ্খল অব্স্থার সৃষ্টি করতে পারে। এরপর রাষ্ট্রপক্ষ কারাগারের ভেতরে কম্বল কারখানাকে সংস্কার করে এজলাস বসানোর প্রক্রিয়া শুরু করে। এ নিয়ে আসামি পক্ষের আইনজীবীদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। এ বিষয়ে বাংলা ট্রিবিউনে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে কারাগারের ভেতরে আদালত বসানোর সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেন রাষ্ট্রপক্ষ। এরপরই বখশিবাজার মাঠের এজলাসটিকেই সংস্কারের জরুরি সিদ্ধান্ত নেয় রাষ্ট্রপক্ষ। জরুরি ভিত্তিতে এলজিইডি ঠিকাদার নিয়োগ করে এই এজলাসের সংস্কার কাজ শুরু করে।
এলজিইডি‘র ঠিকাদার সাহিদুর রহমান বলেন, বিগত দুই সপ্তাহ দিন-রাত কাজ করাচ্ছেন তিনি। ২১টি কয়েদি খাঁচার মধ্যে ১৫টি তৈরি করা হয়েছে। প্রতিটি খাঁচায় ৪০ জন করে আসামি বসানো যাবে। ২১টি খাঁচায় সর্বমোট ৮৪০ জন আসামি বসানো যাবে। প্রতিটি খাঁচায় একটি করে বাথরুমও বানানো হচ্ছে। বিচার চলার সময় যাতে আসামিদের ওই খাঁচার ভিতর থেকে বের হতে না হয়। প্রতিটি খাঁচায় আসামিদের ঢুকিয়ে দরজায় তালা লাগিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থাও রাখা হচ্ছে। প্রয়োজনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা ওই দরজায় তালা লাগাতে পারেন। তিনি বলেন, এসব খাঁচায় বাঘ নয়, হাতি ঢুকিয়ে দিলেও সেটা ভেঙ্গে বের হওয়া সম্ভব হবে না। এ কাজে কয়েক টন লোহার লাগতে পারে। তার ব্যবসায়ীক জীবনে এতো কঠোর নিরাপত্তামূলক কাজ আর কখনও করেননি। এ মামলার বিচারক ও ঢাকা মহানগর দায়রা জজ জহুরুল হক আদালত সংস্কারের নির্মাণ কাজ ঘুরে দেখে সন্তোষ প্রকাশ করেন বলে জানান ঠিকাদার সাহিদুর। আসামিপক্ষের সিনিয়র আইনজীবী আমিনুল ইসলাম বলেন, নিয়মানুযায়ী আদালতের সামনে যখন আসামিদের বিচারের জন্য উপস্থিত করা হবে, তখন তাকে মুক্ত অবস্থায় রাখতে হবে। খাঁচা বানিয়ে সেটার ভেতর আসামিদের ঢুকিয়ে বিচার কার্যক্রম চালানো প্রচলিত বিচার ব্যবস্থার সম্পূর্ণ পরিপন্থি। পৃথিবীর অন্য কোথাও এমন ব্যবস্থা আছে বলে জানা নেই। নিরাপত্তার অজুহাতে এমন ব্যবস্থা নেওয়া আসামিদের ওপর মানসিক নির্যাতন করাই মূল উদ্দেশ্য বলে মনে করেন আমিনুল।
রাষ্ট্রপক্ষের সিনিয়র আইনজীবী বাহারুল ইসলাম বলেন, এই কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা রাষ্ট্র, আদালত এবং আসামিসহ সবার প্রয়োজনেই নেওয়া হচ্ছে। কারণ আসামিদের সবাই সামরিক প্রশিক্ষণে প্রশিক্ষিত। এসব আসামির বেশিরভাগই মৃত্যুদণ্ড ও যাবজ্জীবনসহ বিভিন্ন দণ্ডে দণ্ডিত। তবে হত্যা মামলার বিচার কার্যক্রম চলার সময় কেনও এমন কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি জানতে চাইলে তিনি বলেন, আগে তারা সাজাপ্রাপ্ত আসামি ছিলো না। এখন তারা কয়েদি। সার্বিক প্রেক্ষাপটে এ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি মনে করছেন আদালতসহ সংশ্লিষ্টরা। তিনি আরও জানান, এ মামলায় আসামির সংখ্যা ৮৩৪ জন হলেও বিচার শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত আটজন আসামি মারা গেছেন। পলাতক রয়েছেন আরও ২০ জন। হত্যা মামলার আসামি নন, কিন্তু বিস্ফোরক মামলার আসামি- এমন আছেন ছয়জন। এ মামলায় একজন বেসামরিক ব্যক্তিও আসামি রয়েছেন বলে জানান বাহারুল। ২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি বিজিবি’র সদর দফতর পিলখানায় সংঘটিত ইতিহাসের বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডে ৫৭ জন সেনাকর্মকর্তাসহ ৭৪ জন নিহত হয়েছিলেন।
সুত্র….. বাংলা ট্রিবিউন