May 7, 2026
নিউজ ডেস্ক: নিলাদ্রী চট্টোপাধ্যায় ওরফে ব্লগার নিলয় নীল হত্যার ঘটনায় শ্রম প্রতিমন্ত্রী মুজিবুল হক চুন্নুর ছোট ভাই নজরুল হক নান্নুর ছেলে সাদ আল নাহিনকে আটক করেছে পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি)।
নাহিনকে আটকের কথা ডিবির পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার হয়নি। তবে নাহিনের বাবা দাবি করেছেন তার ছেলে আটক হয়েছে। নজরুল হক নান্নু বলেন, ‘জিজ্ঞাবাদের জন্য ডিবি পুলিশ আমার ছেলে নাহিনকে আটক করেছে। আমি কিশোরগঞ্জ থেকে ঢাকায় এসেছি। দেখি কী হয়।’
সাদ আল নাহিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সান্ধ্যকালীন এমবিএ-এর ছাত্র ছিল। ২০১৩ সালের ১৪ জানুয়ারি ব্লগার আসিফ মহিউদ্দিনকে কুপিয়ে হত্যা চেষ্টার ঘটনায় জড়িত অভিযোগে তাকে আরো তিন সহযোগীসহ ওই বছরের ৩১ মার্চ গ্রেপ্তার করেছিল ডিবি পুলিশ।
এরপর গত দুবছর ধরে নাহিন জেলে ছিল। গত ৪ মার্চ ব্লগার আসিফ হত্যাচেষ্টার মামলায় সাদ-আল-নাহিনসহ ১০ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দিয়েছে ডিবি পুলিশ। কিন্তু এর মধ্যেই জামিনে বেরিয়ে যায় নাহিন।
নাহিন জেল থেকে বেরোনোর পরই একে একে ব্লগাররা নিহত হতে থাকে। এর মধ্যে গত ২৬ ফেব্রুয়ারি ব্লগার অভিজিৎ রায়, ৩১ মার্চ ওয়াশিকুর রহমান বাবু, ১২ মে অনন্ত বিজয় দাস ও সর্বশেষ গত ৭ আগস্ট নিলয় নীলকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। প্রত্যেকটি হত্যাকাণ্ডের ধরণ একই রকম।
ব্লগার নিলয় হত্যার তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানয়, তাকে হত্যার ঘটনায় আইনশৃংখলা বাহিনী আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের (এবিটি) সন্দেহভাজন কয়েকজন সদস্যকে নজরদারির আওতায় আনতে সক্ষম হয়েছে। আর এ হত্যাকাণ্ড এবিটি সংশ্লিষ্টরাই করেছে বলে অনেকটাই নিশ্চিত হয়েছে তদন্ত সংস্থাগুলো।
নিলয় হত্যাকাণ্ডের পর সন্দেহভাজন হিসেবে আইনশৃংখলা বাহিনীর সদস্যরা প্রতিমন্ত্রীর ভাতিজা নাহিনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করছে।
পাশাপাশি তার দেয়া তথ্যের সূত্র ধরে অভিযানও চলছে বলে জানা গেছে। তবে প্রতিমন্ত্রীর ভাতিজা নিলয় হত্যায় জড়িত কিনা তা এখনও নিশ্চিত হতে পারেনি সংশ্লিষ্টরা।
আইনশৃংখলা বাহিনীর একটি সূত্র জানায়, এবিটির খুনিদের একজন হলো সাদ আল নাহিন। সে এর আগেও ব্লগার আসিফ মহিউদ্দিনকে হত্যার জন্য তার গলায় চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে ছিল বলে আদালতে দেয়া জবানবন্দিতে স্বীকার করেছিল।
যদিও নাহিনের দাবি, তাকে ভয় দেখিয়ে এই জবানবন্দি আদায় করা হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, নাহিনকে আসিফ হত্যা চেষ্টা মামলা থেকে বাঁচাতে তদবির ও পুলিশের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয়েছিল। চাপের কারণে আসিফ মহিউদ্দনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে থেকে চিকিৎসা সনদ পেতেও বেগ পেতে হয়েছিল।
এই অভিযোগের বিষয়ে গত ১ মার্চ সংবাদ মাধ্যমকে শ্রম প্রতিমন্ত্রী মুজিবুল হক বলেছিলেন, ‘এটা আমি জানি না।’
ভাতিজা নাহিন কীভাবে আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের সঙ্গে জড়ালেন, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ও তো বাচ্চা ছেলে, পড়ালেখা করে। হয়তো পোলাপানের সঙ্গে মিশে এই রকম হলো কি না।’
এদিকে নিলয় হত্যা মামলার তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, সাদ আল নাহিন এবিটিতে যোগদানের পর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে থাকে। ব্লগার আসিফ হত্যা চেষ্টায় জড়িত থাকার ব্যাপারে স্বীকারোক্তি দিলেও এ মামলায় সে জামিনে মুক্তি পেয়ে যায়। এর পর আবার পুরনো বৃত্তে জড়িয়ে ‘তথাকথিত জিহাদি চেতনায়’ উদ্বুদ্ধ হয়।
গোয়েন্দা সূত্র জানায়, নিলয় হত্যার পর পরই তারা সাদ আল নাহিনের বিষয়ে খোঁজখবর নেয়া শুরু করে। এক পর্যায়ে তার সন্ধ্যান পাওয়া যায়। পরে তাকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে গোয়েন্দারা। নিলয় হত্যার বিষয়ে তার কাছে নানা তথ্য জানার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।
সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা সূত্র জানায়, ৭ আগস্ট রাজধানীর পূর্ব গোড়ানের ৮ নম্বর রোডের ১৬৭ নম্বর বাসায় ব্লগার নিলয় খুনে যে চারজন খুনিরা বর্ণনা তারা পেয়েছেন, তাদের মধ্যে সন্দেহভাজন বাঁ-হাতি আবদুল করিম ওরফে জাবেরের বিষয়ে কিছু তথ্য পাওয়া যায়। এই জাবেরই নাহিনকে আসিফ হত্যা চেষ্টায়য় জড়িয়ে ছিল।
গোয়েন্দাদের একটি সূত্র জানায়, ‘বাঁ-হাতি আবদুল করিম ওরফে জাবের এবং তার সহযোগী হাসিব ও ফাহিমকে গ্রেপ্তারে চলছে অভিযান। পাশাপাশি অন্যান্য সন্দেহভাজনদের কয়েকজনকে নজরদারিতে আনা হয়েছে।
আইনশৃংখলা বাহিনীর একজন কর্মকর্তা বলেন, গুরুত্বপূর্ণ কোনো পরিবারের অভিযুক্ত বা সন্দেহভাজন সদস্যকে গ্রেপ্তার করলে কেউ কেউ প্রভাব বিস্তার করার চেষ্টা করে। কিন্তু কেউ অভিযুক্ত হলে আইনশৃংখলা বাহিনীর হাতে রেহাই নেই।
নাহিদ যেভাবে জঙ্গী
ডিবি সূত্র জানায়, নজরুল হক নান্নু কিশোরগঞ্জের তাড়াইলের দাহিয়া ইউনিয়ের সাবেক চেয়ারম্যান। তিনি দুবার এ ইউনিয়ন থেকে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন। পাশাপাশি তিনি শিক্ষকতাও করেন।
নান্নুর ছেলে সাদ আল নাহিনের জম্ম ১৯৯১ সালের ১৩ ডিসেম্বর। প্রথমে সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাণিজ্য অনুষদের বিবিএ (একাউন্টিং) বিভাগে ভর্তি হয়েছিল।
বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর এমএলএম ব্যবসায় জড়িত হয়ে বেশী সময় দেয়ার কারণে এক সময় তার ছাত্রত্ব বাতিল হয়ে যায়।
পরে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় হতে ৫০ হাজার টাকার বিনিময়ে বিবিএ-এর সার্টিফিকেট কিনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সান্ধ্যকালীন এমবিএতে ভর্তি হয়।
এ সময় নাহিন ঢাকার মিরপুর-১০ নম্বর এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকত। এখানে থাকা অবস্থায় ২০১২ সালের মে মাসে এবিটির সাথে জড়িয়ে যায় সে।
২০১৩ সালের জানুয়ারি মাসে ব্লগার আসিফ মহিউদ্দিনকে কুপিয়ে হত্যা চেষ্টার রহস্য উদ্ঘাটন চেষ্টার এক পর্যায়ে ডিবি পুলিশের হাতে আটক হয় নাহিন। তখন জিজ্ঞাসাবাদে সে নিজের জঙ্গী সংশ্লিষ্টতার তথ্য দেয়।
নাহিন জানায়, ২০১২ সালের মে মাসে মিরপুর-১০ নম্বর এলাকার দোকানদার নবীন (২৪), মানিক (২৫), ফাহিম (২২), কামাল (২৩), কাওছার (২৬) ও কামালদের (২৮) সাথে মিরপুর -১০ নম্বর গোলচত্বর মসজিদে নামাজ পড়ার সময় তার পরিচয় হয়।
তারা প্রায়ই একই সাথে নামাজ আদায় করত। মাঝে মধ্যেই ওই মসজিদে নামাজ শেষে ইসলামী বিষয়ে তারা আলাপ আলোচনা করত।
ওই সময় নবীনের মাধ্যমে আবদুল করিমের (২৫) এর সাথে তাদের পরিচয় হয়। তারা জানতে পারে আবদুল করিম ওরফে জাবের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবী বিষয়ে পড়াশোনা করে। সে ইসলামিক ধর্মীয় বিষয়ে বক্তব্য প্রদানের মাধ্যমে তাদেরকে উদ্বুদ্ধ করত।
ওই বছরের জুলাই মাসের প্রথম শুক্রবারে জাবেরের সাথে তারা সবাই মোহাম্মদপুরের বছিলা রোডের একটি মসজিদের খতিব জসিম উদ্দিন রাহমানীর সঙ্গে দেখা করে। সেখানে তারা তার ফতোয়া শুনে। তারপর হতে তার নিকট হতে বিভিন্ন ধর্মীয় ও জিহাদী বই এনে ফাহিম, নবীন, মানিক, কাওছার মিলে মিরপুর -১০ নম্বর মসজিদ এলাকায় বইগুলি বিক্রি করে ‘প্রকৃত’ ইসলাম প্রচারে উদ্বুদ্ধ হয়।
এরপর ওই বছরের নভেম্বর মাসে জাবেরের মাধ্যমে বসুন্ধারায় রানার সাথে তাদের পরিচয় ঘটে। ধর্মীয় আলাপ আলোচনার মাধ্যমে জানতে পারে, জাবে রানার লোক এবং রানা শীর্ষস্থানীয় নেতা।
নাহিন আরো জানায়, ২০১৩ সালের জানুয়ারি মাসের ২/৩ তারিখে জাবের তাদের এই দলটিকে জানায় যে, আসিফ মহিউদ্দীন নামে একজন ব্লগার ব্লগে ধর্ম সম্পর্কে অবমাননাকর বক্তব্য দেয়। তাই তাকে উচিৎ শিক্ষা দেওয়া দরকার। তখন তারা আলোচনা করে পরিকল্পনা তৈরী করে।
জাবের ৩ জানুয়ারি উত্তরা ১১ নম্বর সেক্টরে আমাকে ও নবীনকে আসিফ মহিউদ্দীনের চেহারা, তার অফিস ও বাসা চিনিয়ে দেয়।
জাবের তাদের ছুরি ও সাইকেল কেনার জন্য তাদেরকে টাকা দেয়। পরে তারা বায়তুল মোকাররম মসজিদের সামনের ফুটপাত থেকে তিনটি ছুরি কেনে এবং বংশাল হতে দুটি রেসিং সাইকেল কেনে।
পরে ৪ ও ১১ জানুয়ারি দু দফায় উত্তরা ১১ নম্বর সেক্টরে আসিফ মহিউদ্দীনের অফিসের সামনে অবস্থান করলেও তার উপর আক্রমণ করতে ব্যর্থ হয় তারা। এ কারণে রানা ক্ষুদ্ধ হয়ে জাবেরকে গালাগালি করে।
এরপর ১৪ জানুয়ারি রাতে তার উপর আক্রমণের সিদ্ধান্ত নেয় নাহিন ও নবীন। রাত সাড়ে ৯টার দিকে রিকশা যোগে আসিফ তার অফিসের সামনে এসে পৌঁছায়। মানিব্যাগ থেকে টাকা বের করে ভাড়া দেওয়ার সময় তাকে নাহিন ও নবীন হামলা করে।
নাহিন প্রথমে ঘাড়ে একটি আঘাত করে। তখন আসিফ মহিউদ্দীন তার কোমড় জাপটে ধরে। তখন নাহিন তার মাথা ঘুরিয়ে দিয়ে তার পিঠে ছুরি দ্বারা আঘাত করে। আসিফের গায়ে শীতের মোটা কাপড় চোপড় থাকায় তার ছুরিটি বেকে যায়। এর ফাঁকে নবীনও ৩/৪ টি ছুরিকাঘাত করে।
আসিফ মহিউদ্দীন মাটিতে পড়ে গিয়ে চিৎকার করতে থাকে। তারা ভয় পেয়ে নাহিনের হাতের ছুরিটি সেখানে ফেলে দৌড়ে পালাতে থাকে। কিছুদূর গিয়ে রিক্সা নিয়ে আমরা উত্তরা আব্দুল্লাহ্পুর বাসস্ট্যান্ডে যায়। সেখান থেকে কনক বাসে উঠে মিরপুরে পৌছে তারা যে যার বাসায় চলে যায়।
নাহিন জানায়, পরদিন সকালে ফোন করে ঘটনাটি কৌশলে রানাকে ও জাবেরকে জানায়।
এক সপ্তাহ পরে তারা মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বর মসজিদে দেখা করে। এ সময় তারা সিদ্ধান্ত নেয় গুরুতর আহতহ আসিফকে ডাক্তার সেজে ঢুকে হার্টবিড অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি করার ইনজেকশন দিয়ে মেরে ফেলবে। কিন্তু পরবর্তীতে তারা এ সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে।
নাহিন ডিবিকে জানিয়েছিল, ২০১৩ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি মিরপুরের কালশিতে ব্লগার আহমেদ রাজীব হায়দারকে এবিটি সদস্যরা কুপিয়ে হত্যা করে। ওই বছরের ১ মার্চ এ ঘটনায় জড়িত দ্বীপসহ এবিটি সদস্যরা গ্রেপ্তার হয়ে যায়। তখন ভয় পেয়ে তারা ঢাকা ছেড়ে আত্মগোপনে চলে যায়।
কিছু দিন পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়েছে মনে করে তারা ঢাকায় ফিরে আসে। নাহিনও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস-পরীক্ষায় অংশ নিতে থাকে। কিন্তু ৩১ মার্চ তারা ডিবির হাতে একে একে ধরা পড়ে। উৎসঃ অনলাইন বাংলা