পৃথিবীকে জেনে নিন আপনার ভাষায়….24 Hrs Online Newspaper

দেশে সুইস ব্যাংক ও মানি লন্ডারিং বিতর্ক

Posted on July 4, 2014 | in রাজনীতি | by

vaultসম্প্রতি বাংলাদেশে সুইস ব্যাংকে পাচারকৃত টাকা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গন বেশ সরব। এমনকি দেশের জাতীয় পত্রপত্রিকাসহ সকল গণমাধ্যম বেশ ফলাও করে প্রকাশ করছে সুইস ব্যাংকে অর্থ পাচার প্রসঙ্গ। গত ২৮ জুন জাতীয় সংসদে দেয়া বক্তৃতায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পাচার করা টাকা ফিরিয়ে আনা হবে বলে ঘোষণা দেওয়ার পর থেকেই প্রসঙ্গটি রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচিত বিষয়ে পরিণত হয়েছে। সম্প্রতি সুইজারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের নাগরিকদের সে দেশের ব্যাংকগুলোতে ২০১৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ৩৭ কোটি ২০ লাখ সুইস ফ্রাঁ আমানত হিসেবে জমা রাখা আছে, যা বাংলাদেশী মুদ্রায় ৩ হাজার ২৩৬ কোটি টাকা। এই প্রতিবেদন প্রকাশ এবং এরপরই প্রধানমন্ত্রীর এই ঘোষণা জাতয়ি অঙ্গনে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করে সুইস ব্যাংক ও মানি লণ্ডারিং প্রসঙ্গ।

২৯ জুন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনে প্রস্তাবিত ২০১৪-১৫ অর্থ বছরের বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে বলেন, সুইস ব্যাংকে কে কত টাকা পাচার করেছেন, তার তালিকা হচ্ছে। দেশের টাকা আমরা দেশে ফিরিয়ে আনবোই। তিনি বলেন, আমরা নিজেদের আখের গোছাতে ক্ষমতায় আসিনি। আমরা জনগণের সেবা ও কল্যাণের জন্য এসেছি। তাদের ভাগ্যের পরিবর্তন ও জীবনমানের উন্নয়ন করাই আমাদের একমাত্র লক্ষ্য। বাংলাদেশের মানুষ যাতে খেয়ে-পরে শান্তিতে বাস করতে পারে-সে লক্ষ্য নিয়েই আমরা কাজ করছি। বরং ক্ষমতায় যারা উড়ে এসে জুড়ে বসে তারাই কেবল নিজেদের আখের গোছাতে ব্যস্ত থাকে।

এদিকে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া সৃইস ব্যাংকের অর্থ পাচার সংক্রান্ত বিষয়টিকে সংবাদপত্রের কারো আইনের সাথে সংযুক্ত করে বলেছেন, সুইস ব্যাংকে কারা টাকা পাচার করছে এই তথ্য যাতে করে বের না হতে পারে সে জন্যই কালো আইন করছে সরকার। শুক্রবার দুপুরে জাতীয় প্রেসক্লাবের কনফারেন্স লাউঞ্জে সংবাদপত্রের কন্ঠরোধের নতুন অপচেষ্টার প্রতিবাদে বাংলাদেশ জাতীয় মানবাধিকার পরিষদ আয়োজিত সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ মন্তব্য করেন।

অপরদিকে ৩ জুলাই দুপুরে জাতীয় সংসদে পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য কাজী ফিরোজ রশিদ জানান, টাকা পাচারকারীদের নামের তালিকা পাঠাতে বাধ্য নয় সুইস ব্যাংক। নিজেদের গোপনীয়তার স্বার্থে তারা এটা কখনই করবে না।

তিনি বলেন, যখন বাংলাদেশ থেকে টাকা পাচার হয়, তখন কেন্দ্রীয় ব্যাংক কোনো কথা বলে না। টাকা চলে যাওয়ার পরে নামের তালিকা চায়! বাংলাদেশ ব্যাংকের এই দ্বিমুখী কাজ ব্যাংকিং খাতের ওপর মানুষের আস্থা হারিয়ে যাচ্ছে। মানুষ আস্থা হারালে ব্যাংকে আর টাকা রাখবে না। টাকা চলে যাবে অন্যখানে।

এদিকে অর্থপাচার রোধে সরকারের প্রতি মানি লন্ডারিং আইন সংশোধন করার আহ্বান জানিয়েছেন আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। তিনি বলেন, যে যেভাবে অর্থ পেয়েছেন দেশে বিনিয়োগ করেন। শুক্রবার দুপুরে রাজধানীর ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশ মিলনায়তনে বঙ্গবন্ধু একাডেমির আলোচনা সভায় তিনি এ আহ্বান জানান।

অপরদিকে গত ২৯ জুন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর আন্তর্জাতিকভাবে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়ে বলেন, সুইস ব্যাংকে রাখা টাকা আওয়ামী লীগ নেতাদের। আওয়ামী লীগই এর তদন্ত করলে প্রকৃত সত্য বের হবে না।

ফখরুল বলেন, আমরা ইতিমধ্যে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে দেখেছি, আওয়ামী লীগ নেতারা কানাডা, নিউ ইয়র্ক, মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন স্থানে বাড়ি করেছেন। দেশের টাকা লুটে তারাই সুইস ব্যাংকে জমা রেখেছেন।

স্বভাবতই সুইস ব্যাংক প্রসঙ্গে মনে প্রশ্ন জাগে। প্রশ্ন জাগে বাংলাদেশিদের কত টাকা জমা আছে সুইস ব্যাংকে? এবিষয়ে উল্লেখ করা যেতে পারে ৩ জুলাই দৈনিক জনকণ্ঠে এম শাহজাহানের প্রতিবেদন। প্রতিবেদনটিতে জানানো হয়, ২০০২ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত এক দশকে বাংলাদেশ থেকে অন্তত ১ হাজার ৬০৭ কোটি ৭০ লাখ ডলার বা ১ লাখ ২৮ হাজার ৬১৬ কোটি টাকা অবৈধভাবে বাইরে চলে গেছে। এর ফলে বিশ্বের যে ১৫০টি উন্নয়নশীল দেশ থেকে অবৈধভাবে অর্থ স্থানান্তর হয়েছে, সে দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান দাঁড়িয়েছে ৪৭তম। আর দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়। ২০০২-১১ সময়কালে সবচেয়ে বেশি অর্থ পাচার হয়েছে চীন থেকে, যার পরিমাণ ১ লাখ ৮ হাজার কোটি ডলার। দ্বিতীয় স্থানে আছে রাশিয়া ১ লাখ ৮৮ হাজার কোটি ডলার। তৃতীয় ও চতুর্থ স্থানে রয়েছে যথাক্রমে মেক্সিকো ৪৬ হাজার কোটি ডলার ও মালয়েশিয়া ৩৭ হাজার কোটি ডলার। পাচার হওয়া শীর্ষ ১০ দেশের তালিকায় ভারতের অবস্থান পঞ্চম। ১০ বছরে ভারত থেকে ৩৪ হাজার ৩৯৩ কোটি ডলারের সমপরিমাণ অর্থ কর ফাঁকি দিয়ে বিদেশে পাচার করা হয়েছে।

অপরদিকে ২ জুলাই দেনিক যুগান্তরে প্রকাশিত দেলোয়ার হোসেনের প্রতিবেদনে জানানো হয়, গত ২৬ জুন বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে সুইজারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুইস ন্যাশনাল ব্যাংকের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে টাকা পাচারকারীদের তালিকা চাওয়া হয়েছে। ওই চিঠিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশসহ প্রায় সব দেশেই এখন মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে অর্থায়ন প্রতিরোধ আইন কার্যকর রয়েছে। প্রচলিত নিয়মে বাংলাদেশ থেকে বিদেশে টাকা নিতে হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আগাম অনুমোদন নিতে হয়। অনুমোদন ছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে বিদেশে কোনো ব্যক্তির পক্ষে টাকা নেয়া সম্ভব নয়। বিদেশের কোনো ব্যাংকে টাকা জমা রাখার ব্যাপারে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে এখন পর্যন্ত কোনো ব্যক্তিকে অনুমোদনও দেয়া হয়নি। এ কারণে বাংলাদেশ থেকে কোনো ব্যক্তি সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলোতে কোনো টাকা জমা রেখে থাকলে তা বেআইনিভাবে রেখেছে। যা মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে অর্থায়ন প্রতিরোধ আইনের পরিপন্থী।

চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, যেহেতু সুইজারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের নাগরিকদের সে দেশের ব্যাংকগুলোতে ২০১৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ৩৭ কোটি ২০ লাখ সুইস ফ্রাঁ আমানত হিসেবে জমা রাখা আছে, যা বাংলাদেশী মুদ্রায় ৩ হাজার ২৩৬ কোটি টাকা (প্রতি সুইস ফ্যাংক ৯০ টাকা হিসাবে)। ২০১২ সালের ডিসেম্বরে এর পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৯৫০ কোটি টাকা। এক বছরের ব্যবধানে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশের নাগরিকদের আমানতের পরিমাণ বেড়েছে ১ হাজার ২৮৬ কোটি টাকা।

এদিকে ৩ জুলাই দৈনিক প্রথম আলোর এক প্রতিবেদনে জানানো, বাংলাদেশ ব্যাংকের ফাইনান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) থেকে সুইজারল্যান্ডের এফআইইউর কাছে সুইস ব্যাংকগুলোতে গচ্ছিত বাংলাদেশিদের অর্থের বিস্তারিত তথ্য চেয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের বিএফআইইউর সূত্রগুলো বলছে, সুইস ব্যাংকগুলোতে থাকা বাংলাদেশিদের গচ্ছিত অর্থ সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য পেতে এখন পর্যন্ত যেসব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তাতে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য পাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। এভাবে ঢালাও তথ্য চেয়ে তা পাওয়ার সম্ভাবনা একেবারেই ক্ষীণ।

সর্বশেষ খবর

আজকের ছবি

www.facebook.com

Tag Cloud