পৃথিবীকে জেনে নিন আপনার ভাষায়….24 Hrs Online Newspaper

দেশে বর্তমানে মাদকাসক্তি পরিস্থিতি ভয়াবহ

Posted on August 30, 2015 | in জাতীয় | by

বাংলাদেশে বর্তমানে মাদকাসক্তি পরিস্থিতি ভয়াবহ। মাদকের নেশায় জড়িয়ে পড়ছে তরুণ যুবসমাজের সঙ্গে শিশু-কিশোররাও। রাজধানীর নামি-দামি স্কুল কলেজের শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে রাস্তায় বেড়ে ওঠা শিশুরাও ঝুঁকছে মাদকে।
মাদক ব্যবসা এখন সারাদেশেই ছড়িয়ে পড়ছে। শুধু কেরানীগঞ্জেই মাদক ব্যবসার জেরে এক বছরে খুন হয়েছে ৪০ জন। তাছাড়া সর্বনাশা মাদক ইয়াবায় ছেয়ে গেছে সারাদেশ। প্রতি বছর ইয়াবাসহ বিভিন্ন ধরনের মাদক বিক্রি হচ্ছে হাজার কোটি টাকারও বেশি। মিয়ানমারের সীমান্ত দিয়ে চোরাইপথে অবাধে প্রবেশ করছে ইয়াবা। ইয়াবা ছাড়াও মাদকের বাজারের প্রধান নেশার উপকরণ হচ্ছে ফেনসিডিল, হেরোইন, মদ, গাঁজাসহ বিভিন্ন নেশা জাতীয় ট্যাবলেট এবং চেতনানাশক ইনজেকশন। আর এগুলো এতটাই সহজলভ্য ঢাকা শহরের অলিগলি শুরু করে গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত তা ছড়িয়ে পড়েছে। হাত বাড়ালেই হাতের কাছে পাওয়া যায় মাদক।MKL-15
‘দেশে প্রায় ৫০ লাখ ছেলেমেয়ে মাদকাসক্ত’পুলিশের রাজশাহী রেঞ্জের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) ইকবাল বাহার জানিয়েছেন, দেশের ১৩ থেকে ৩২ বছর বয়সী প্রায় ৫০ লাখ ছেলেমেয়ে মাদকাসক্ত। আধুনিক বাংলাদেশের ভবিষ্যতের জন্য এটা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক বলে মনে করছেন তিনি। শনিবার সকালে সিরাজগঞ্জ কোর্ট চত্বরে মাদক ধ্বংসকরণ অনুষ্ঠানে এই তথ্য জানান ডিআইজি।
শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একার পক্ষে এই মাদক নির্মূল সম্ভব নয় উল্লেখ করে ডিআইজি বলেন, এটা থেকে পরিত্রাণ পেতে হলে শুধু সীমান্ত এলাকার মাদকপাচার বন্ধ হলে চলবে না। এ ক্ষেত্রে প্রশাসন, পুলিশের পাশাপাশি সুধীমহল ও অভিভাবকদের সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। সচেতন হতে হবে সবাইকে।
মাদক প্রতিরোধে সমাজ ও পরিবারকে সচেতন হতে হবে বলে উল্লেখ করেছেন বিশিষ্ট চিকিৎসক ডা. মোহিত কামাল। তিনি বলেছেন, পরিবারের খোঁজখবর না নেওয়ার কারণে অনেক শিক্ষিত ছেলেমেয়ে মাদকাসক্ত হয়ে পড়ছে। এটা অনেক সময় পরিবারের সদস্যরা জানেও না। ছেলেমেয়েরা এমনভাবে আসক্ত হয়ে পড়ছে যে মাদকের জন্য পরিবারের লোকজনকে হত্যা করতেও দ্বিধা করে না। তাই মাদকের ভয়াবহ ছোবল থেকে পরিবার ও দেশকে রক্ষা করতে হলে আগে দরকার পরিবারের সচেতনতা।
ডা. অরূপ রতন চৌধুরী আরো বলেন, সিগারেট দিয়ে নেশা শুরু হলেও মাদকের প্রতি আসক্তি ধীরে ধীরে শুরু হয়। বেশির ভাগই শুরু হয় বন্ধুবান্ধবের সাহচর্যে। মূলত মাদক কেনার অর্থ জোগাড় করতে গিয়েই কিশোর-তরুণরা ব্যাপকভাবে নানা অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। এ সুযোগে মাদক ব্যবসায়ী, সংঘবদ্ধ অপরাধীচক্র খুন, অপহরণ, চাঁদাবাজিসহ নানা কাজে তাদের ব্যবহার করতে থাকে। মাদকের এই নেশার জালে একবার জড়িয়ে পড়লে কেউ আর সহজে বেরিয়ে আসতে পারে না। ফলে মাদকসেবিরা দিন দিন আরো বেপরোয়া হয়ে ওঠে। আমাদের দেশে কিশোর সন্ত্রাসীর ক্রমবর্ধমান দাপটের যে তথ্য সম্প্রতি বিভিন্ন সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছে এর মূল কারণ সম্ভবত নিহিত রয়েছে এখানেই। দেশের সর্বত্র সন্ত্রাসী কার্যক্রম স্কুল-কলেজগামী মেয়েদের নানাভাবে উত্ত্যক্ত করা, গুলি বা ছুরিকাঘাতে হত্যা করা কিংবা সড়ক দুর্ঘটনার আধিক্যের পেছনেও মাদকাসক্তির ভূমিকা অন্যতম।
পুলিশ আন্তরিক হলে সমাজ থেকে মাদক নির্মূল সম্ভব বলে অভিমত ব্যক্ত করেছেন ওপেন হাউজ’ডে আলোচনায় অংশগ্রহণকারী বক্তারা। জয়দেবপুর থানায় ওপেন হাউজ’ডে অনুষ্ঠানে বক্তারা এমন মন্তব্য করেন।
৪ এপ্রিল আপত্তিকর অবস্থায় মাদক সেবনকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষকের ছেলে এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষকের মেয়েসহ পাঁচজনকে আটক করেছে প্রক্টরিয়াল টিম।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর এম আমজাদ আলী বলেন, আটক ব্যক্তিদের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশ্ব ধর্মতত্ত্ব ও সংস্কৃতি বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক ড. কাজী নুরুল ইসলামের ছেলে ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষকের মেয়ে আছে। তবে আটক কারোরই নাম-পরিচয় জানাননি তিনি।
৩ এপ্রিল মাদক সেবন প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, মহান মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র বেশি বেশি নির্মাণ করা হবে সেই সঙ্গে মাদকাসক্তি, জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে চলচ্চিত্রকে একটি শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করতে হবে। জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠানে এ কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী যেভাবে সন্ত্রাস ও মাদকাসক্তির বিরুদ্ধে আমাদের সোচ্চার ও তৎপর হতে আহ্বান জানাচ্ছেন তেমনিভাবে মন্ত্রণালয়গুলোও যেন তৎপর নয়।
আমাদের সমাজে কিন্তু মাদকাসক্ত ছেলেমেয়েদের নিয়ে অনেক ঘটনাই ঘটেছে যেমন ২০১৩ সালের ১৪ আগস্ট মসাদকাসক্ত ঐশীর খুন করেছিল বাবা-মাকে। এই খুন নিয়ে সারাদেশে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল, আবার কিছুদিন না যেতেই গত ২২ মার্চ পঞ্চগড়ে মা-বাবাকে হত্যা করল মঞ্জুরুল হাসান নামে এক মাদকাসক্ত ছেলে। নেশার টাকা না পেয়ে পঞ্চগড় জেলা সদরে বাবা-মাকে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে হত্যা করেছে মাদকাসক্ত ছেলে। হয়ত আরো অনেক পরিবারে এমন ঘটনা ঘটেই যাচ্ছে, হয়তবা আমরা তা সংবাদপত্রে দেখি না সুতরাং মাদকাসক্তির কারণে এভাবে লোমহর্ষক ঘটনা একটির পর একটি ঘটতেই থাকবে যদি না আমরা এর বিরুদ্ধে কার্যকর ভূমিকা নিতে না পারি।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী ২০১৩, বাংলাদেশে গত ছয় বছরে মাদক হিসেবে ইয়াবার ব্যবহার বেড়েছে ৭৭ গুণ (সাত হাজার ৬২১ শতাংশ)। তবে অন্যান্য মাদক যেমন ফেনসিডিল ও হেরোইনের ব্যবহার কিছুটা কমেছে। গাঁজার ব্যবহার সামান্য বেড়েছে। ২০০৮ সালের তুলনায় ২০১৩ সালে ইয়াবা উদ্ধারের পরিমাণ বেড়েছে ৭৭ গুণ। অধিদপ্তরের হিসাবে, বাংলাদেশে মাদক সেবনে বছরে ব্যয় হয় প্রায় ৪ হাজার মিলিয়ন মার্কিন ডলার বা প্রায় ৩১ হাজার কোটি টাকা। দেশে প্রায় ৫০ লাখ মানুষ মাদক সেবন করছে। কোনো কোনো বেসরকারি সংস্থার মতে তা ৮০ লাখেরও বেশি। মোট মাদকসেবির ৫০ ভাগেরও বেশি ইয়াবা ব্যবহার করছে।
অপরাজয়ী বাংলাদেশ নির্বাহী পরিচালক ওয়াহিদ বানু জানান, দেশে বর্তমানে প্রায় ১৪ লাখ পথশিশু রয়েছে, যারা কোনো না কোনোভাবে মাদক সেবনের সঙ্গে সম্পৃক্ত। মাদকদ্রব্য অধিদফতর সূত্রে জানা যায়, দেশের বিভিন্ন মাদক নিরাময় কেন্দ্রে প্রায় ১৩ হাজার মাদকাসক্ত চিকিৎসাধীন রয়েছে। যাদের মধ্যে বেশির ভাগই মধ্য ও উচ্চবিত্ত পরিবারের উঠতি বয়সী ছেলেমেয়ে।
বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের তথ্যমতে, পথশিশুদের ৮৫ শতাংশই কোন না কোনভাবে মাদক সেবন করে। এর মধ্যে ১৯ শতাংশ হেরোইন, ৪৪ শতাংশ ধূমপান, ২৮ শতাংশ বিভিন্ন ট্যাবলেট এবং ৮ শতাংশ ইনজেকশনের মাধ্যমে নেশা করে থাকে। ঢাকা শহরে কমপক্ষে ২২৯টি স্পট রয়েছে, যেখানে ৯ থেকে ১৮ বছর বয়সী শিশুরা মাদক সেবন করে। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের তথ্যমতে, ঢাকা বিভাগে মাদকাসক্ত শিশুর প্রায় ৩০ শতাংশ ছেলে এবং ১৭ শতাংশ মেয়ে। ১০ থেকে ১৭ বছর বয়সী ছেলে ও মেয়েশিশুরা শারীরিক ও মানসিকভাবে ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। পথশিশুদের নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংগঠন জানায়, মাদকাসক্ত ৮০ শতাংশ পথশিশু মাত্র সাত বছরের মধ্যে অপরাধমূলক কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে পড়ে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক গবেষণা জরিপের মাধ্যমে জানা গেছে, মাদকাসক্ত শিশুদের ড্রাগ গ্রহণ ও বিক্রয়ের সঙ্গে জড়িত ৪৪ শতাংশ পথশিশু, পিকেটিংয়ে জড়িত ৩৫ শতাংশ, ছিনতাইয়ে ১২ শতাংশ, মানবপাচার সহায়তা কাজে ১১ শতাংশ, দুর্র্ধর্ষ সন্ত্রাসীদের সহায়তাকারী হিসেবে ৫ শতাংশ ও অন্যান্য ভ্রাম্যমাণ অপরাধে জড়িত ২১ শতাংশ। এ ছাড়া বোমাবাজিসহ অন্যান্য সহিংস কর্মকা-ে জড়িত ১৬ শতাংশ পথশিশু।

Comments are closed.

সর্বশেষ খবর

আজকের ছবি

www.facebook.com

Tag Cloud