April 22, 2026

“জামদানি বাঁচানোর চেষ্টা করছে সরকার। এজন্য নানামুখী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। লক্ষ্য জামদানি ‘শিল্প’ কিংবা ‘শিল্পী’ অন্তত যে কোনো একটিকে যেন বাঁচিয়ে রাখা যায়।”
রাজধানীর শিল্পকলা একডেমির চিত্রশালা প্লাজায় আয়োজিত জামদানি সামগ্রীর এক প্রদর্শনীতে, আলোচনার মাঝে এমনভাবেই নিজেদের অবস্থানের কথা জানালেন ডা. হাফেজা আক্তার। তাঁর মতো আরও বেশ কয়েকজন প্রদর্শনিতে উপস্থিত ছিলেন যারা সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সংযুক্ত বাংলাদেশ ইউনেস্কোর কাউন্সিলের (বিএনসিইউ) বিভিন্ন পদে কর্মরত আছেন।
আলাপচারিতার এক পর্যায়ে তারাও জানালেন, গেলো কয়েক বছরে জামদানি শিল্পের পুরানো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে বিভিন্ন রকম কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে সরকার। যার অংশ হিসেবেই গত বছর ভারতের সঙ্গে এক রকম অলিখিত লড়াই শেষে, ইউনেস্কোর কাছ থেকে ‘জামদানি’র ‘জিওগ্রাফিকাল আইডেন্টিটি’র (জিআই) স্বীকৃতি পেয়েছে বাংলাদেশ।
ফলে ‘জামদানি’ এখন ইউনেস্কোর তালিকাভুক্ত ‘ইনট্যানজিবল হেরিটেইজ’।
চিত্রশালা প্লাজার তিনদিনের এই প্রদর্শনীর প্রধান লক্ষ্য অবশ্য আর দশটা প্রদর্শনী আয়োজনের চেয়ে কিছুটা ভিন্ন।
জামদানি শিল্পের সঙ্গে জড়িতরা এখানে সরাসরি অর্থনৈতিকভাবে লাভবান না হলেও, কাজ করা হচ্ছে এর ভবিষ্যত নিয়ে। আর সে কারণেই, বাংলাদেশ ইউনেস্কোর কাউন্সিল (বিএনসিইউ) ও কোরিয়ান ন্যাশনাল কমিশন ফর ইউনেস্কো (কেএনসিইউ)-এর যৌথ উদ্যোগের এই আয়োজনে জামদানি পণ্যের প্রদর্শনীর পাশাপাশি আয়োজন করা হয়েছে নানারকম মত বিনিময় সভা। যেখানে অংশ নিয়েছেন সংশ্লিষ্ঠ সরকারি কর্মকর্তা, ফ্যাশন হাউজ প্রতিনিধি, জামদানি শিল্পী, গবেষক, বিশেষজ্ঞসহ আরও নানান পেশার মানুষ।
মূলত ‘সেফগার্ডিং জামদানি – দ্যা ইনট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেইজ ফ্রম বাংলাদেশ অ্যান্ড প্রোমোটিং ক্রিয়েটিভ ইকোনমি’ শীর্ষক প্রকল্পের ‘এক্সিবিশন অ্যান্ড র্যাপ আপ সেমিনার অন দ্যা অকেশন অব আইকন প্রজেক্ট’ এর অংশ হিসেবে এই আয়োজন।
প্রদর্শনীতে অংশ নেওয়া ২০টি স্টল মূলত সরকারের বাছাই করা সেরা বিশ ‘টেইলার মাস্টার’ বা জামদানি শিল্পীর নিজস্ব দোকান, যেখানে মূলত শাড়িই বিক্রি করতে দেখা গেছে। প্রজেক্টের পক্ষ থেকে তাদেরকে বিনামূল্যে স্টল দেওয়ার মূল কারণ, জামদানি শিল্প সংশ্লিষ্ঠদের সাহায্য করা। এছাড়া দেশের তিন নামকরা ফ্যাশন হাউজ– আড়ং, অঞ্জনস ও কুমিদিনীর স্টল থাকলেও সেখানে বিক্রির জন্য কোনো পণ্য তোলা হয়নি বরং জামদানি থেকে তৈরি নানানরকম পণ্যসামগ্রী শুধু দেখাবার জন্য রাখা হয়েছে।
স্টলগুলো ঘুরে দেখা গেলো– কুশন কাভার, টেবিল রানার, বিছানার চাদর, পর্দা, ল্যাম্পশেইড, বটুয়া ব্যাগ, মানিব্যাগ, ট্যাপেস্ট্রি, অর্নামেন্ট বক্স, মোবাইল ব্যাগ, ওড়নার মতো জামদানি উপজাত হিসেবে অপ্রচলিত এইসব পণ্য রয়েছে সেখানে।
আড়ং’য়ের ভিজ্যুয়াল মার্চেন্ডাইজার অনুজা নিজাম বলেন, “মূলত বাজারে এইসব পণ্যের চাহিদা কেমন এবং সেগুলো ক্রেতারা কীভাবে গ্রহণ করবে সেটা বোঝার জন্যই পণ্যগুলো রাখা হয়েছে এখানে।”
তিনি আরও জানান, প্রদর্শনীর পর এগুলো তুলে দেওয়া হবে ইউনেস্কো কাউন্সিলকে।
বাংলাদেশের ইউনেস্কো চ্যাপ্টারে প্রোগ্রাম অফিসার হিসেবে কর্মরত ডা. হাফেজা আক্তার বলেন, “এই আয়োজনে সবার অংশগ্রহণ রয়েছে। যেমন – শিল্পীরা তাদের নিয়মিত পণ্য (জামদানি শাড়ি) বিক্রি করেছেন। আর ফ্যাশন হাউজগুলো তাদের ডিজাইন ও পরিকল্পনা মাথায় রেখে কাঁচামাল সরবরাহ করে, এই শিল্পীদের দিয়ে তাদের অপ্রচলিত পণ্যগুলো বানিয়ে নিয়েছে এবং তা প্রদর্শন করছে।”
এরকম উদ্যোগের কারণ সম্পর্কে ডা. হাফেজা জানান, মূলত সরকার যখন জামদানি শিল্পকে বাঁচাতে উদ্যোগী হয় তখন এই প্রস্তাব আসে। কেননা জামদানির দাম বেশি হওয়ায় অনেকেই তা সংগ্রহে রাখতে পারেন না। এজন্য কথা হচ্ছিল কীভাবে জামদানিকে ছড়িয়ে দেওয়া যায়। সে জায়গা থেকেই পরে দেখা গেল একটা ভালো জামদানি শাড়ির দাম ছয় থেকে ১০ হাজার টাকা হলেও, কোনোভাবেই একটি পর্দা সে দামের হবে না। তাই খরচ কমিয়েও আনা গেল, আবার জামদানিও সংগ্রহে রাখা গেলো, পাশপাশি লাভবান হল শিল্পীরা। এরকম একটা চিন্তারই প্রতিফলন এবারের প্রদর্শনী। এজন্য এমনকি আয়োজনের দাওয়াত পত্র থেকে শুরু করে অন্যান্য কাগজপত্রেও জামদানির নকশা ব্যবহার করা হয়েছে।
তবে যে যাই বলুক না কোনো, জামদানির সঙ্গে যাদের জীবন বাঁধা, তারাই বলতে পারবেন সবচেয়ে ভালো কী করা যায়? কারণ জামদানির নানান কথা তাদেরই হাতে মাথায় জড়িয়ে আছে।
যেমন ৭০ বছর বয়স্ক জামদানি শিল্পী আবুল কাশেম বললেন, “১০ বছর বয়স থেকে জামদানির কাজে করছি। এখনও কাজ করে যাচ্ছি।” তবে ভবিষ্যতে তার পরিবারের কেউ আর জামদানি পেশার সঙ্গে থাকবে কিনা সেটা নিশ্চিত করে বলতে পারলেন না। জানালেন, সুতার দাম বাড়ার যে কথা বলা হয়, সেটা পুরোপুরি সত্য নয়, বরং প্রতি শাড়িতে খরচ ১ হাজার টাকার মতো বাড়লেও, সেটা কেনার মতো ক্রেতাও আছে। তবে সীমিত সামর্থ্যের মানুষের জন্য জামদানি খরুচে ব্যাপার হওয়ায় এবারের আয়োজন ভিন্ন কোনো কিছু বের করে আনতেও পারে। আরেক শিল্পী এনামুল হক জানালেন আরেকটু ভিন্ন কথা। তার মতে, মানুষের সততার অভাবই জামদানির জনপ্রিয়তা কমিয়ে দিয়েছে। যারা জামদানির কাজে কমদামী সিনথেটিক সুতা ব্যবহার করে একই দামে শাড়ি বিক্রি করছেন, তাদের শাড়ি তাড়াতাড়ি নষ্ট হয়ে যাওয়ার পর, মানুষ এ বিষয়ে আস্থা হারিয়ে ফেলে। একজন মধ্যবিত্ত পরিবারের কেউ যখন টাকা জমিয়ে জামদানি সংগ্রহ করে, সেখানে বিশ্বাস হারালে সেটা ফিরিয়ে আনা কষ্টকর হয়ে যায়। তবে এটাও সত্যি আরও কমদামে জামদানী পণ্য বাজারে সরবরাহ করা গেলে, হয়তো জামদানি জনপ্রিয় হয়ে উঠতে পারে এমনটা বিশ্বাস করেন তিনিও। জামদানি শিল্পী আবুল কাশেম। জামদানি শিল্পী আবুল কাশেম। তবে শাড়িতে সেটা সম্ভব নয়, তাই নতুন যেসব পণ্য আনা হচ্ছে সেগুল হয়ত এক্ষেত্রে সহায়ক হবে এমন আশাবাদ এনামুলেরও রয়েছে। জামদানি শিল্প বাংলাদেশের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই শিল্পের যে ঐশ্বরিক বিকাশ একসময়ে হয়েছিল তা এখন ম্লান হলেও, জনপ্রিয়তা ফিরিয়ে আনা অসম্ভব কিছু নয়। তাই ১১ থেকে ১৩ নভেম্বর তিনদিনের এই প্রদর্শনী, আপাত দৃষ্টিতে আহামরী এমন কিছু না দিলেও, এর সম্ভাবনা বিশাল। যদি অপ্রচলিত পণ্যের মধ্য দিয়ে জামদানি টিকে থাকতে পারে হাজার বছর, তাহলেও অন্তত অহংকারটুকু বয়ে বেড়াতে পারবে বাঙালি। এবারের প্রচেষ্ঠা সফল হলে হয়তো ফ্যাশন হাউজগুলো কিছুদিনের মধ্যেই শাড়ি ছাড়াও অন্যান্য পণ্যগুলোকে বাজারে নিয়ে আসবে। এতে লাভ হয়ত শিল্পী খুব একটা হবে না, তবে বেঁচে থাকার প্রেরণা পাবে আরও একটি আদি শিল্প।