April 20, 2026
ঘটনাটি ঘটেছে গত পরশু রবিবার (১৫ সেপ্টেম্বর) সিলেটে বিকেলের দিকে। সে রাতেই খবরটি লন্ডনে পৌঁছে যায় এবং বাংলাদেশি কমিউনিটির অধিকাংশই জেনে যায় যে সিলেটে কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) ও বাসদ যখন যুক্তভাবে জনসভা করছিল, তখন ছাত্রলীগ ওই জনসভার ওপর হামলা চালায়। এ হামলায় কমিউনিস্ট পার্টির নেতা কমরেড মুজাহিদুল ইসলাম সেলিমসহ অন্যূন ২৫ জন আহত হয়েছেন বলে প্রাথমিক খবরে জানা গেছে।
খবরটি জানার পর এ আকস্মিক হামলার কারণ কী, এটি কি পরিকল্পিত, না অপরিকল্পিত হামলা, তা জানার জন্য পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত খবর ঘেঁটেছি, সিলেট ও ঢাকার বন্ধু-বান্ধবের কাছেও জানতে চেয়েছি। তাঁরা কেউ কারণটি আমাকে জানাতে পারেননি। কিন্তু দলমত-নির্বিশেষে দেশের সব মহল এই গুণ্ডামি ও হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। এই নিন্দায় আমিও নিজের কণ্ঠ মেলাতে চাই।
এটি যে ছাত্রলীগ নামধারীদের হামলা নয়; বরং সিলেটের ছাত্রলীগেরই হামলা- এটা এখন বিতর্কিত ব্যাপার নয়। কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ এই দুষ্কর্মের জন্য সিলেটের ছাত্রলীগের কমিটি বাতিল করেছে এবং সিলেট জেলা ও সিটি আওয়ামী লীগের নেতারা গিয়ে মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম ও জনসভায় অন্যান্য নেতার কাছে ক্ষমা চেয়েছেন। সারা দেশেও এর প্রচণ্ড বিরূপ প্রতিক্রিয়া হয়েছে। সিলেটে এই গুণ্ডামির প্রতিবাদে পরের দিন সোমবার যে অর্ধদিবস হরতাল ডাকা হয়েছিল, তাতে বিএনপিসহ অনেকেই সমর্থন জানিয়েছে এবং হরতালটি শান্তিপূর্ণভাবে পালিত হয়েছে। দেশের বিভিন্ন দলের নেতারাও স্বাভাবিকভাবেই এই সন্ত্রাস ও দুর্বৃত্তপনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন।
আমি অনেক ভেবেও বুঝতে পারছি না, বেছে বেছে কমিউনিস্ট পার্টি ও বাসদের জনসভায় ছাত্রলীগের এই হামলা কেন? এ দুটি দলই আওয়ামী লীগের মহাজোটে না থাকলেও মুক্তিযুদ্ধের শিবিরের দল। কমিউনিস্ট পার্টি একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছে এবং মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম নিজে একজন বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা। তা ছাড়া আজ পর্যন্ত সিপিবি আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে বিরোধী দলগুলোর ধ্বংসাত্মক আন্দোলনে যোগ দেয়নি, সরকারের গঠনমূলক সমালোচনা করেছে। তাদের মিটিং-মিছিলও সব সময় শান্তিপূর্ণ। জানা যায় সিলেটের জনসভাটিও ছিল শান্তিপূর্ণ।
বক্তারা হয়তো সরকারের কোনো কোনো কাজের কঠোর সমালোচনা করে থাকতে পারেন, কিন্তু বিএনপি ও জামায়াত নেতাদের মতো উসকানিমূলক কথাবার্তাও বলেননি। মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম শুধু একজন নিষ্ঠ বাম রাজনীতিকই নন, বর্তমানে একজন রাজনৈতিক কলামিস্টও। তাঁর লেখা আমি নিয়মিত পড়ি। তিনি বাম রাজনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে আওয়ামী লীগ ও আওয়ামী লীগ সরকারের সমালোচনা করেন। তাতেও আওয়ামীবিদ্বেষী নেই এবং আওয়ামী লীগ সম্পর্কে কোনো মিথ্যা প্রচারণাও নেই।
এ অবস্থায় আওয়ামী লীগের সমমনা দুটি বাম রাজনৈতিক দলের সভায় সিলেট ছাত্রলীগের এই হিংস্র আক্রমণ কেন? খবরে পড়েছি, সিলেটে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যাবেন, তাঁকে সংবর্ধনাদানের প্রস্তুতি হিসেবে সিলেট ছাত্রলীগ ওই রবিবারই (১৫ সেপ্টেম্বর) শহরে একটি শোভাযাত্রা বের করেছিল এবং কমরেড সেলিমদের জনসভার পাশ দিয়ে যাচ্ছিল। জনসভাটিও চলছিল শান্তিপূর্ণভাবে। তাহলে সিলেট ছাত্রলীগের মিছিলটির মধ্যে উত্তেজনা ও হিংস্রতা কেন দেখা দিল এবং তারা সমমনা গণতান্ত্রিক দুটি দলের সভা ভাঙতে গেল কেন, তার কোনো কারণ আমি এখনো জানতে পারিনি।
দেশের গণবিরোধী সাম্প্রদায়িক দলগুলো, বিশেষ করে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের সমর্থক এবং মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী জামায়াত, হেফাজত, ছাত্রশিবির প্রভৃতি সংগঠন যখন হরতাল, শোভাযাত্রার নামে গাড়ি পোড়ায়, দোকানপাটে ভাঙচুর করে, আওয়ামী লীগকে সন্ত্রাসী শক্তি দ্বারা ক্ষমতাচ্যুত করার হুমকি দেয়, তখন ছাত্রলীগের একশ্রেণীর বীরপুঙ্গবের বীরত্ব কোথায় থাকে তা জানতে ইচ্ছে করে।
এটি একটি রহস্য কি না আমি জানি না। আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের একশ্রেণীর নেতা-কর্মীকে দেখা যায়, দেশের প্রকৃত সন্ত্রাসী দলগুলোর বিরুদ্ধে নয়, গণতন্ত্রমনা, শান্তিপ্রিয় দল-বিশেষের ওপর হামলা চালিয়ে তারা বীরত্ব দেখাতে বেশি পছন্দ করে। প্রথম হাসিনা সরকারের আমলেও দেখা গেছে কমিউনিস্ট পার্টির একটি শান্তিপূর্ণ মিছিলের ওপর আওয়ামী লীগের তৎকালীন মায়া বাহিনীকে অকারণে হামলা চালাতে। সেবারও ওই কমিউনিস্ট শোভাযাত্রার এক নেতা (মুজাহিদুল ইসলাম সেলিমই কি না আমার মনে পড়ছে না) আক্রান্ত হয়েছিলেন। সম্ভবত পুলিশ দিয়ে তাঁদের লাঠিপেটা করারও চেষ্টা হয়েছিল।
সেবারও কমিউনিস্ট নেতাদের কাছে আওয়ামী লীগ দুঃখ প্রকাশ করেছিল, এবার ক্ষমা চেয়েছে। কিন্তু এই ক্ষমা চাওয়া এবং সিলেটের ছাত্রলীগের কমিটি ভেঙে দেওয়ার মধ্যেই এরূপ একটি হিংস্র ও দেশের গণতান্ত্রিক রাজনীতির জন্য বিপজ্জনক ঘটনার সমাপ্তি টানা উচিত বলে সিলেট আওয়ামী লীগ ও কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের নেতারা কি মনে করেন? নাকি এ ধরনের ন্যক্কারজনক ঘটনার আর যাতে পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সে জন্য দলের বা সহযোগী সংগঠনের দোষী প্রমাণিত নেতা ও কর্মীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিদানের পদক্ষেপ তাঁরা নেবেন? আওয়ামী লীগ সরকারেরও কি উচিত নয়, তারা যখন দেশ থেকে সন্ত্রাস ও দুর্নীতি উচ্ছেদের কথা বলে, তখন এই মহৎ কাজটি নিজেদের দলের ভেতর থেকেই শুরু করা?
আমি কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়-জীবনে ছাত্রলীগের একজন কর্মী ছিলাম। এ জন্য বর্তমান ছাত্রলীগের অবস্থা দেখে আমার লজ্জা হয়। এ অবস্থার জন্য ছাত্রলীগের সাধারণ নেতা-কর্মীদের দোষ দিই না। তাঁদের অনেকের মধ্যেই অতীত ছাত্রলীগের আদর্শবাদ মরে যায়নি, তার প্রমাণ পাই। কিন্তু ছাত্রলীগের ওপরের স্তরের একশ্রেণীর নেতা-কর্মী, যাঁরা সরকার ও ক্ষমতার কাছাকাছি, তাঁরা অনেকেই চরিত্রে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মতো দুর্নীতি, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, লাইসেন্সবাজি, খুনোখুনিতে এমনভাবে জড়িয়ে পড়েছেন যে এর প্রতিকারের উপায় কী তা কেউ বলতে পারছেন না।
আমাকে বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের এক প্রভাবশালী সদস্য বলেছেন, ছাত্রলীগ থেকে সন্ত্রাসী ও দুর্নীতিবাজদের অবশ্যই বের করে দেওয়া যায়। মুশকিল হয়েছে, তাহলে লোম বাছতে কম্বল উজাড় হয়ে যাবে। আমাদের দেশের রাজনীতি এখনো ছাত্র ও যুবশক্তির ওপর নির্ভরশীল। ইউরোপে বৃহৎ শক্তির মধ্যে একতরফা নিরস্ত্রীকরণ আন্দোলন সফল করা যেমন সম্ভব হয়নি, তেমনি আমাদের দেশেও একতরফা অহিংস ছাত্রসংগঠন গড়ে তোলা সম্ভব নয়। ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের সশস্ত্র সন্ত্রাস ও গুণ্ডামির মুখে ছাত্রলীগ যদি শুধু ভদ্রলোকের ছাত্র সংগঠন হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে আওয়ামী লীগ এক দিনও মাঠের রাজনীতিতে থাকতে পারবে না। শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চে কী ঘটল দেখলেন না? ছাত্রলীগ সরে আসতেই মঞ্চ দুর্বল হয়ে পড়ল, হেফাজতিদের উত্থান ঘটল।
আমি এই সরকারি নেতাকে বলেছি, ঠিক আছে, ছাত্রলীগেরও মাসল পাওয়ারের দরকার আছে এবং আওয়ামী রাজনীতির জন্য ডিফেন্স লীগ হিসেবে কাজ করার আবশ্যকতা আছে, তা মানছি। কিন্তু ছাত্রলীগের একশ্রেণীর নেতা-কর্মী যখন অফেন্সে যায় এবং তা গণবিরোধী চক্র ও শক্তিগুলোকে প্রতিহত করার জন্য নয়; বরং গণতান্ত্রিক শিবিরের সমমনা দলগুলোর বিরুদ্ধে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের একই কায়দায় গুণ্ডামি করে, তখনই আপত্তি করতে হয়। ছাত্রলীগ যখন ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের কায়দায় হল দখল, চাঁদাবাজি, লাইসেন্সবাজি ও রক্তাক্ত আত্মদ্ব›েদ্ব লিপ্ত হয়, তখন তা কি আওয়ামী লীগ সরকারের জন্যই দুর্নাম ও কলঙ্ক বয়ে আনে না? যে ছাত্রলীগ ছিল এককালে গণজাগরণের অগ্রদূত, আওয়ামী লীগের শক্তি ও সুনামের উৎস, তা আজ আওয়ামী দল ও সরকারের জন্য দুর্নামের উৎস ও লায়াবিলিটি- এ অবস্থা কি মেনে নেওয়া যায়? ছাত্রলীগের দুর্নীতি ও সন্ত্রাস আগামী সাধারণ নির্বাচনেও আওয়ামী লীগের জন্য এক বোঝা হয়ে দাঁড়াবে।
সিলেটের ঘটনায় কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ সিলেটের ছাত্রলীগের কমিটিকে বাতিল করেছে এবং ঘটনার কারণ অনুসন্ধান করছে। এখানেই তাদের দায়িত্ব পালনে ইতি টানলে ভুল করা হবে। এ ঘটনাটি যারা ঘটিয়েছে, তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে এবং সারা দেশে ছাত্রলীগের ভেতরে চিরুনি অভিযান চালিয়ে সন্ত্রাস ও দুর্নীতিতে জড়িত দুর্বৃত্তদের বহিষ্কার করতে হবে। আওয়ামী লীগের বর্তমান সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফ একবার বলেছিলেন, ‘২০০৮ সালে ক্ষমতার হাত বদলের পর ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির থেকে বহু দুর্বৃত্ত ছাত্রলীগে এসে অনুপ্রবেশ করেছে।’ সৈয়দ আশরাফের এ কথা যদি সত্য হয়, তাহলে সরকার ও আওয়ামী লীগ কেন যৌথভাবে ছাত্রলীগের সৎ ও নিষ্ঠ নেতা-কর্মীদের সহায়তায় এই অনুপ্রবেশকারী দুর্বৃত্তদের চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণে অগ্রসর হয়নি?
দেশে ছাত্ররাজনীতি ও সংগঠনে যেহেতু সন্ত্রাস ও দুর্নীতি ঢুকেছে, সেহেতু ছাত্ররাজনীতি কিছুকালের জন্য নিষিদ্ধ করার কথাও কেউ কেউ বলেন। এটি মাথাব্যথা দূর করার জন্য মাথা কেটে ফেলার পরামর্শ দেওয়ার মতো। দেশে শুধু বড় ছাত্র সংগঠনগুলোতেই সন্ত্রাস ও দুর্নীতি ঢোকেনি, বড় রাজনৈতিক দলগুলোতেও এর প্রাবল্য ঘটেছে। বস্তুত রাজনীতির বৃহৎ অঙ্গনের সন্ত্রাস ও দুর্নীতিই আজ ছাত্ররাজনীতিতেও গিয়ে ঢুকেছে। উৎসের দুর্নীতি ও সন্ত্রাস বন্ধ না করলে দেশের ছাত্ররাজনীতিকেও এই রোগ থেকে মুক্ত করা যাবে না।
দেশে সামাজিক অবস্থার দ্রুত অবক্ষয়, শিক্ষিত বেকারের দ্রুত হার বৃদ্ধি, রাজনৈতিক অস্থিরতা ছাত্ররাজনীতিতেও প্রতিফলিত হয়েছে। যে ছাত্রলীগ ছিল দেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের নিরাপত্তার লেঠেল, সেই দল কেন আজ সমমনা গণতান্ত্রিক দলের সভায় হামলা চালিয়ে গণতন্ত্র নিধনের লেঠেল হতে চায়, সরকারকে তার কারণ খুঁজে বের করতে হবে এবং এর প্রতিকারপন্থা উদ্ভাবন করতে হবে। ছাত্রলীগ থেকে দুর্বৃত্ত বিতাড়নের ব্যবস্থা গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে বর্তমান সরকারের উচিত, গোটা ছাত্ররাজনীতির দুর্বৃত্তায়ন রোধ করার জন্য কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সহায়তায় কিছু আইন প্রণয়ন এবং তা বাস্তবায়নের জন্য কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ।
ইউরোপের কোনো কোনো দেশে ছাত্ররাজনীতিকে সঠিক পথে ধরে রাখার জন্য কিছু গাইডলাইন তৈরি ও তা বাস্তবায়ন করা হয়েছিল। বর্তমানে দেশে ছাত্ররাজনীতির নামে যা ঘটছে- ভিসিকে ঘেরাও, শিক্ষক প্রহার, শিক্ষাঙ্গন লণ্ডভণ্ড করা, শিক্ষাঙ্গনে গোলাগুলি চালানো ইত্যাদি অত্যন্ত লজ্জাকর। এর প্রতিকারপন্থা উদ্ভাবনের জন্য সরকার সব দলমতের মানুষ, শিক্ষক ও বুদ্ধিজীবীদের নিয়ে বৈঠকে বসতে পারে, দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থাকে বিবেচনায় রেখে দেশে গঠনমূলক ছাত্ররাজনীতির একটি গাইডলাইন তৈরি করে তাকে আইনে রূপান্তর ও কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের ব্যবস্থা করতে পারে। তাতে রাতারাতি বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতির সব সমস্যা দূর হবে তা নয়, কিন্তু ছাত্ররাজনীতিকে বর্তমানের অসহনীয় দুর্বৃত্তপনা থেকে মুক্ত করার একটি উদ্যোগের সূচনা হবে।