পৃথিবীকে জেনে নিন আপনার ভাষায়….24 Hrs Online Newspaper

চিন্তা-চেতনায় মৃত বা বন্ধ্যা ভূখণ্ড

Posted on December 11, 2014 | in নির্বাচিত কলাম | by

image14বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ জিয়া হায়দার রহমান একজন প্রতিশ্র“তিশীল তরুণ কথাশিল্পী। ইংরেজিতে লেখা তাঁর প্রথম উপন্যাসটি যথেষ্ট সুনাম অর্জন করেছে। ডিসেম্বরের শুরুতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক মতবিনিময় সভায় তিনি তাঁর বাপ-দাদার বাসভূমি বাংলাদেশকে আখ্যায়িত করেছেন ‘আ ল্যান্ড অব ডেড আইডিয়াল’—বাংলাদেশ চিন্তা-চেতনায় বন্ধ্যা একটি ভূখণ্ড। তিনি বলেন, এখানে যখনই নতুন কোনো ধারণার প্রকাশ ঘটে, তখনই তাকে শ্বাসরুদ্ধ করে হত্যা করা হয়। বিভিন্ন সামাজিক, রাজনৈতিক ও শ্রেণির বাধায় নতুন চিন্তা-চেতনা, ধ্যানধারণা বিকশিত হতে পারে না।
তিনি ওই অনুষ্ঠানে আরও বলেছেন, মূলত দেশটা বিপুল ক্ষমতাধর ও অসামান্য সুযোগ-সুবিধাভোগীদের, তাঁরা তাঁদের ধ্যানধারণা নিচের স্তরের জনগণের ওপর চাপিয়ে দেন এবং সাধারণ মানুষও তাকে ‘হ্যাঁ’ বলে মেনে নেয়। তিনি বলেন, মৃত ব্যক্তিদের ছায়াকে পুঁজি করে টু লেডিজ—দুই নারী বাংলাদেশের রাজনীতিতে আধিপত্য চালিয়ে যাচ্ছেন। জিয়া হায়দার রহমান তাঁর পিতৃপুরুষের আবাসভূমি সম্পর্কে বলেন, তিনি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ ছবিতে কোনো আলো দেখতে পাচ্ছেন না। দেশ এক বিপজ্জনক অবস্থায় চলে গেছে। এই অবস্থার সংস্কার করে বেরিয়ে আসা তরুণ প্রজন্মের জন্য খুবই কঠিনই হবে। তিনি শুধু শাসকশ্রেণি নয়, জনগণের দুর্বল ভূমিকার কথাও বলেছেন।
তরুণ ব্রিটিশ লেখকের বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করতে পারলেই সন্তুষ্ট হতাম; কিন্তু তাঁর বক্তব্যের বিরোধিতা করার মতো যুক্তি খুঁজে পাওয়া কঠিন। তিনি এই বক্তব্য কোনো দলবিশেষ বা বর্তমান সরকারকে উদ্দেশ করে বলেননি। সমাজসচেতন লেখক হিসেবে তিনি সঠিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেই এ কথা বলেছেন। তিনি বেড়ে উঠেছেন ব্রিটেনে, কিন্তু তাঁর শিকড় এই দেশের মাটিতে। সুতরাং এই দেশের ভালো-মন্দ তাঁকে স্পর্শ করবেই।
রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব রাজনীতিবিদদের। প্রশাসনের কর্মকর্তাদের দিয়ে তাঁরা দেশ পরিচালনা করেন। ক্ষমতাসীনদের ওপরই দায়দায়িত্ব মূলত বর্তায়। তবে ক্ষমতার বাইরে যাঁরা, তাঁরা তাঁদের দায়িত্ব এড়াতে পারেন না। যাঁরা দলীয় রাজনীতি করেন না বলে দাবি করেন, যেমন: নাগরিক সমাজের নেতা, শিল্পী-সাহিত্যিক-শিক্ষাবিদ প্রমুখ, তাঁদেরও ভূমিকা অল্প নয়। প্রগতিশীল সংবাদমাধ্যমের একটি বড় ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু শুধু উন্নত মানের সংবাদপত্রই সমাজকে কলুষমুক্ত ও রাষ্ট্রকে গণতান্ত্রিক করতে পারে না।
সমাজের সার্বিক অবস্থার বাইরে সংবাদপত্র নয়। রাষ্ট্রের কতটা চাপ সংবাদপত্র সইতে পারে। সমাজের কায়েমি স্বার্থের আক্রমণ প্রতিহত করার ক্ষমতা কোনো প্রতিবাদী সংবাদপত্রের কতটা থাকতে পারে, যদি তার পাশে শক্ত নাগরিক সমাজ না থাকে। যেখানে ক্রিটিক্যাল অথরিটি বা সমালোচনার কর্তৃত্ব দুর্বল, বুদ্ধিজীবীরা পদ বা অন্য প্রাপ্তির ফলে আত্মবিক্রীত, পেশাদার অর্থনীতিবিদেরা কোনো পুরস্কার বা লাভজনক পদপ্রাপ্তির জন্য সরকারকে গায়ে পড়ে প্রশংসা করে বেড়ান, যা প্রশংসার যোগ্য নয়, তাকে প্রশংসা করে পত্রিকায় নিবন্ধ প্রকাশ করেন শুধু ক্যারিয়ারের জন্য—দেশের মানুষের স্বার্থের পরিপন্থী হওয়া সত্ত্বেও, সেখানে শুধু সংবাদপত্র জনস্বার্থ রক্ষা করতে পারে না। ব্যক্তিস্বার্থে ও গোষ্ঠীস্বার্থে যখন পাকাচুল-বুদ্ধিজীবীও সর্বৈব অন্যায়-অবিচারের মধ্যে ধ্যানমগ্ন মুনিঋষির মতো মৌনব্রত পালন করেন, সেখানে সমাজ পরিবর্তনের জন্য নতুন ধ্যানধারণা ও সংস্কারের আশা করা বৃথা।
সীমাহীন রক্ত ও ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত বাংলাদেশ রাষ্ট্র আজ সেখানে এসে দাঁড়িয়েছে, তা এক বিপজ্জনক সর্বনাশা খাদের কার্নিশ। যতই বলা হোক জিডিপি বাড়বে, বাংলাদেশ মধ্য আয়ের দেশ হবে, এশিয়ার টাইগার হবে ইত্যাদি ইত্যাদি—তাতে কী লাভ? তৈরি পোশাক বা অন্য কোনো দ্রব্যের রপ্তানি বাড়ালেই বা কী লাভ? গরিব মানুষ বিদেশে গিয়ে টাকা পাঠিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সিন্দুক ভরে ফেললেই কি উপকার হবে দেশের মানুষের? বন্ধ্যা, পুরোনো সমাজব্যবস্থা যদি একই রকম থাকে, ঘণ্টায় ঘণ্টায় ধর্ষণ, নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ডের শিকার হয় নারী, প্রাথমিক শিক্ষা থেকে উচ্চশিক্ষা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে, ন্যায়বিচার যদি মানুষ না পায়, আইনের শাসন বলে কিছু না থাকে, শাসকশ্রেণির ইচ্ছা জনগণের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়, মানুষের জীবনের নিরাপত্তা না থাকে, সমস্ত সম্পদ ২-৩ শতাংশ মানুষের অধিকারে থাকে, হাজার বছরের জাতীয় সংস্কৃতি যদি বিলীন হয়ে যায়, জাতিগত, ভাষাগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা যদি হারায় তাদের অধিকার—তাহলে জিডিপি ও মধ্য আয়ের দেশ দিয়ে জনগণ কী করবে?
নতুন আইডিয়ার যাঁরা জন্ম দেবেন, তাঁদের উঁচু মানসম্পন্ন শিক্ষায়—তা প্রাতিষ্ঠানিক হোক বা অপ্রাতিষ্ঠানিক হোক—শিক্ষিত হতে হবে। উনিশ শতকে বাঙালি হিন্দুসমাজে যে জাগরণ এসেছিল, তার মূলে ছিল যুগের উপযোগী মানসম্মত শিক্ষা। তাই হিন্দু মধ্যবিত্ত সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পেরেছিল। মানসম্মত শিক্ষা গ্রহণ না করে এবং পুরোনো ধ্যানধারণা আঁকড়ে থেকে মুসলমান মধ্যশ্রেণি পিছিয়ে পড়ে। আজ দেড় শ বছর পরে বাংলাদেশের শাসন কর্তৃত্ব মুসলমান উচ্চমধ্যশ্রেণির হাতে। এই শ্রেণিটি রাষ্ট্রক্ষমতার অপব্যবহার করে বিপুল বিত্তের অধিকারী হয়েছে। তারা প্রচলিত ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখতে মরিয়া। নতুন আইডিয়াকে তারা মৃত্যুপরোয়ানা মনে করে। সে জন্য নতুন চিন্তাকে যে তারা শুধু টুঁটি টিপে মারে তা-ই নয়, শিক্ষাব্যবস্থাকেও তারা সুপরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করেছে, যাতে ভবিষ্যতে এমন কোনো চিন্তাবিদের আবির্ভাব না ঘটে, যাঁরা সনাতন সমাজব্যবস্থার জন্য হুমকি। এই পরিস্থিতিতে খ্যাতিমান শিক্ষাবিদদের ভূমিকা চরম হতাশাজনক।
যদিও অবস্থা সামন্ততন্ত্র-রাজতন্ত্রের মতোই, কিন্তু এই যুগে আর রাজতন্ত্রে ফিরে যেতে পারব না, সুতরাং থাকতে হবে গণতন্ত্র অথবা স্বৈরতন্ত্রের যেকোনো একটিতে। গণতন্ত্রের বিপর্যয়ের জন্য শুধু শাসকশ্রেণি ও রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাদের দোষ দেওয়া যাবে না। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা বিনির্মাণে জনগণের একটি ভূমিকা থাকে। স্বাধীনতার আগে থেকেই দেশের মানুষ সামরিক শাসনে থাকায় গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি কী, সে সম্পর্কে জনগণ সম্পূর্ণ সচেতন হয়ে ওঠেনি। গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি তৈরি এক ধীর ও সময়সাপেক্ষ প্রক্রিয়া। যে সরকার তাৎক্ষণিক কিছু সুবিধা দেয়, তাকেই সমর্থন দেয় জনগণ। তাতে দেশের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি হলো কি না, তা ভেবে দেখে না মানুষ। এইভাবে স্বৈরশাসনের ভিত্তি রচিত হয়।
গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির সুষ্ঠু চর্চা না হওয়ায়, সরকারি কর্মকর্তারা শুধু নন, মধ্যশ্রেণির মানুষও সামরিক-বেসামরিক একনায়কত্বকে ‘হ্যাঁ’ বলতে বা কুর্নিশ করতে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুণ্ঠনে যে শাসক যত সুবিধা দেবেন, শিক্ষিত শ্রেণিকে, তাকে টিকিয়ে রাখতে তাদের তত
আগ্রহ। কিন্তু সেই পরিস্থিতিতেও বাদ সাধেন একশ্রেণির মানুষ, তাঁরা সংখ্যায় অতি অল্প, তাঁরাই স্বৈরশাসনবিরোধী সচেতনতা সৃষ্টি করেন। প্রথমে খুব ছোট পরিসরে। একসময় তা বিরাট আকার ধারণ করে এবং বিস্ফোরণ ঘটে। সেই জাতীয় বিস্ফোরণে প্রথাগত কোনো নেতা নেতৃত্ব দিতে পারেন না। হঠাৎ নতুন নেতৃত্বের সৃষ্টি হয়। তবে হঠাৎ তৈরি ক্যারিশম্যাটিক নেতৃত্ব যে সব সময় ভালো হয়, তাও নয়। প্রচলিত ব্যবস্থাকে চুরমার করতে তারা ধূমকেতুর মতো আবির্ভূত হন। তাঁদের সেই ভূমিকাটির ঐতিহাসিক মূল্য রয়েছে।
এখন যেসব প্রবীণ নেতাকে আমরা দেখছি, তাঁরা ৬০-৭০ বছরের বুড়ো আম-জামগাছের মতো, তা থেকে কোনো ফল আশা করা যায় না। বুড়োদের থেকে কোনো ত্যাগও প্রত্যাশা করা যায় না। জীবনের শেষবেলা যতই ঘনিয়ে আসে, ততই শুধু পাওয়ার জন্য তাঁদের ব্যাকুলতা বাড়ে। সব কালে সমাজে পরিবর্তন আনে নতুন প্রজন্মের মানুষ।
চিরকালই শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থাকে অপরিণামদর্শী দূরদৃষ্টিহীন শাসকশ্রেণি মনে করে শান্তির সময়। আসলে তা প্রস্তুতির সময়। সব সময় নতুন প্রজন্ম লাঠিসোঁটা নিয়ে রাস্তায় নামে না। তাদের প্রস্তুতির জন্য সময় দরকার। মারাত্মক অবক্ষয়ের মধ্যেও বাংলাদেশের তরুণদের অনেকেই সমাজ পরিবর্তনের আকাক্সক্ষা পোষণ করেন। প্রথাগত প্রচারমাধ্যমের বাইরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে তাঁরা কাজে লাগাবেন। বাঙালির সন্তান ব্রিটিশ লেখক ভবিষ্যতের বাংলাদেশের ছবিতে কোনো আলো যে দেখতে পাননি, তা চ্যালেঞ্জ করা কঠিন। তবে অন্ধকার চিরস্থায়ী নয়। বন্ধ্যা ভূখণ্ডে নতুন ফসলের চাষ করতে শেষ পর্যন্ত নতুন প্রজন্মই ভরসা।
সৈয়দ আবুল মকসুদ: গবেষক, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক?

Comments are closed.

সর্বশেষ খবর

আজকের ছবি

www.facebook.com

Tag Cloud