April 21, 2026
লিওনেল মেসির গোল্ডেন বল নিয়ে চলছে বিতর্ক ছবি:এএফপিবিশ্বকাপ জিততে পারেননি। যে স্বপ্ন আজীবন লালন করে এসেছেন মনের গহিনে। সেই স্বপ্ন খুব কাছে এসেও ধরা দিল না মেসির হাতে। বিশ্বকাপ ফাইনালে তাঁর দলের তরীটা নিমজ্জিত হওয়ার পর থেকে লিওনেল মেসির চেহারাটা খেয়াল করেছেন? যেন কিছুই ভালো লাগছে না তাঁর। যেন খালি হয়ে আসছে তাঁর চারপাশের পৃথিবীটা। এমন একটি মুহূর্তে গোল্ডেন বলের পুরস্কারের জন্য নিজের নাম শুনে মেসি যেন যারপরনাই বিব্রত। মারাকানার পুরস্কার বিতরণী ব্যালকনিতেও তিনি তা আনতে গেলেন নিতান্তই অনিচ্ছায়। জীবনে চারবার ব্যালন ডি’অর জিতেছেন, বিভিন্ন পুরস্কার অনেকবারই সমৃদ্ধ করেছে তাঁর ক্যারিয়ার। কিন্তু এই একটি পুরস্কারই যেন নিতান্তই অনিচ্ছায় হাতে নিলেন তিনি। গোল্ডেন বলটি নেওয়ার সময় একবার যেন ওটার দিকে চেয়েও দেখলেন। চেহারাটা হলো ঠিক এমনই, ‘হু! বিশ্বকাপ জিততে পারলাম না, এটা নিয়ে আমি কী করব?’
রসিক লোকজন গোল্ডেন বল নিয়ে আলোচনায় করছেন নানা ধরনের জল্পনা। ট্রফির আধিক্যে মেসি এই গোল্ডেন বলটি বাড়ি নিয়ে যাবেন না কাউকে দিয়ে দেবেন—এটা নিয়েও কথাবার্তা উঠছে। শেষ অবধি মেসি এই গোল্ডেন বল নিয়ে কী করবেন তার কোনো ফয়সালা না হলেও এটা সত্য, বিশ্বকাপ ফাইনালে হারের রক্ষাক্ত ক্ষতে এই সোনার বল কিছুটা নুনের ছিটার মতোই অসহনীয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
ডিয়েগো ম্যারাডোনা মেসিকে খুব ভালোবাসেন বলেই জানা ছিল। সেই ম্যারাডোনার আবার একটা বাজে স্বভাব আছে। তিনি প্রায়ই খুলে দেন মুখের লাগাম। বিশ্বকাপ ফাইনালের পর তিনি বলেই দিয়েছেন, মেসির এই গোল্ডেন বল স্পন্সরদের চাপেই আসা।
হ্যাঁ, স্পন্সরদের চাপ। বিখ্যাত ব্রিটিশ পত্রিকা ডেইলি মেইলের দাবিও এমনটাই। তারাও লিখেছে, ফিফার স্পন্সর বিখ্যাত ক্রীড়াসামগ্রী প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান অ্যাডিডাস ‘চেয়েছে’ বলেই গোল্ডেন বলটি মেসির হাতে উঠেছে। এটা কে না জানে, ফুটবল বিশ্বে অ্যাডিডাসের সবচেয়ে বিখ্যাত ‘পণ্যদূত’ এই মেসিই।
মেসি কি সত্যিই গোল্ডেন বলের উপযোগী ছিলেন না? এই লাইনে কথা উঠলে অবশ্য মেসির প্রতি বেশ অবিচারই করা হয়। কেবল স্পন্সরের চাপে মেসি গোল্ডেন বল পেয়েছেন বলে অভিযোগ তুললেও মেসির অবদানকে অস্বীকার করা হয়। এবারের বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার প্রথম ম্যাচ থেকে মেসির পারফরম্যান্স বিচার করুন। অন্যদের সঙ্গে মেসিকে তুলনায় আনুন। প্রায় একক কর্তৃত্বে নিজের দলকে ধাপে ধাপে ওপরে তুলে নেওয়ার নজির সত্যিই খুঁজে পাওয়া যাবে না। সেদিক দিয়ে গোল্ডেন বল ঠিকই আছে।
এই মৌসুমে বার্সেলোনার হয়ে মেসি ঠিক নিজের মতো ছিলেন না। চোট-অসুস্থতা পুরো মৌসুমজুড়েই তাঁকে বিব্রত করেছে। কিন্তু বিশ্বকাপের শুরু থেকেই তিনি ছিলেন অন্য রকম। একটা দৃঢ় প্রত্যয় যেন তাঁকে পেয়ে বসেছিল।
বসনিয়া-হার্জেগোভিনার বিপক্ষে প্রায় একক প্রচেষ্টায় করলেন দারুণ এক গোল। গোলশূন্য ড্রয়ের মুখে থাকা ইরানের ম্যাচটি তিনি নিজেদের করে নিলেন শেষ মুহূর্তের দারুণ এক গোলে। নাইজেরিয়ার বিপক্ষে নিজের ট্রেডমার্ক ফ্রি-কিকের গোলের পাশাপাশি করলেন আরও একটি গোল। প্রথম পর্বটি তো ছিল মেসিরই। দ্বিতীয় রাউন্ডে সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে তাঁর পাস থেকেই দলকে বৈতরণী পার করিয়েছেন অ্যাঙ্গেল ডি মারিয়া। কোয়ার্টার ফাইনালে বেলজিয়ামের বিপক্ষেও খুব একটা খারাপ খেলেননি তিনি। মেসির একমাত্র নিষ্প্রভ ম্যাচ হল্যান্ডের বিপক্ষে সেমিফাইনাল। ফাইনালে পাওয়া গোলের সুযোগটি যদি কাজে লাগাতে পারতেন তাহলে কি মেসিকে নিয়ে এত কথা উঠত? মনে হয় না।
সেমিফাইনাল ও ফাইনালে মেসি ছিলেন বড্ড ক্লিশে। তাঁর শরীরী ভাষাতেই ফুটে উঠছিল ক্লান্তি। এবারের বিশ্বকাপ প্রমাণ করে দিয়েছে আর্জেন্টিনা কতটা মেসিনির্ভর দল। তিনি গোল করলে কিংবা গোল বানিয়ে দিলেই কেবল আর্জেন্টিনা জিততে পারে। সেমিফাইনাল ও ফাইনালের নিষ্প্রভ মেসি এই ব্যাপারটিই প্রমাণ করে দিয়েছেন বেশ স্পষ্টভাবেই। মেসির সহায়তা বিনা আর্জেন্টিনা এই বিশ্বকাপে গোল পেয়েছে মাত্র তিনটি। এমন দল বিশ্বকাপে আর একটি ছিল কি না, সেটা কি কেউ বলতে পারবেন?
তার পরও কথা কিন্তু থেকেই যায়। একক কৃতিত্বের কথাই যদি বলা হয়, তাহলে খোদ মেসির দলেরই হাভিয়ের মাচেরানো কী দোষ করলেন? হল্যান্ডের আরিয়েন রোবেন মাঠের পারফরম্যান্সে কি মেসির চেয়ে খুব পিছিয়ে ছিলেন? জার্মানির ফিলিপ লাম, ম্যাটস হ্যামেলস, টনি ক্রুস আর টমাস মুলার খুব সম্ভবত গোল্ডেন বল পাননি জার্মানির আঁটসাঁট দলগত পারফরম্যান্সের কারণে। নতুন বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের দলে একক কৃতিত্ব যে আলাদাভাবে চোখেই পড়ে না।
হামেস রদ্রিগেজ গোল্ডেন বলের সংক্ষিপ্ত তালিকায় থাকলেও তিনি ৬ গোল করে ছিনিয়ে নিয়েছেন গোল্ডেন বুট। অ্যাঙ্গেল ডি মারিয়া চোটের কারণে শেষ অবধি খেলতে না পারায় এই পুরস্কারের সিদ্ধান্তটি গেছে ওই মেসির পক্ষেই। তবে হল্যান্ড ফাইনালে উঠলে কিংবা কাপ জিতলে আরিয়েন রোবেন গোল্ডেন বুট পেতে পারতেন কি না, এ নিয়ে আলোচনা হতেই পারে। তবে ডাইভিং-প্রবণতা খুব সম্ভবত এই পুরস্কারের প্রশ্নে তাঁর প্রতিপক্ষ হিসেবে কাজ করেছে।
কিন্তু মূল ব্যাপার হলো মেসি শেষ পর্যন্ত গোল্ডেন বলটি পেয়েই গেছেন। এ ব্যাপারে এখন যেকোনো আলোচনাই অর্থহীন। স্পন্সররা যদি মেসিকে গোল্ডেন বল পাইয়ে দিয়েই থাকেন, তাহলেও তো বলার কিছু থাকে না। মেসির যে বিশ্বকাপটাই পাওয়ার কথা ছিল!