March 6, 2026
স্টাফ রিপোর্টার : সরকার কারাবন্দি জঙ্গিদের বিশেষ নজরদারির আওতায় আনার উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে। এজন্য জঙ্গিদের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মামলার বিচারব্যবস্থা পর্যবেক্ষণ ও করণীয় নির্ধারণে প্রতিটি জেলায় গঠন করা হচ্ছে বিশেষ সেল। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে গঠন করা এসব সেল বিভিন্ন মামলায় জঙ্গিদের ফাঁসির রায় কার্যকর না হওয়ার বিষয়গুলো পর্যালোচনা করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে অবহিত করবে। আর জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার এসব বিশেষ সেলগুলো মনিটর করবেন। তাঁদের সহায়তা করবে কারা কর্তৃপক্ষ। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সূত্রে এ তথ্য জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, প্রতিটি জেলায় গঠিত বিশেষ সেলগুলো জঙ্গি বিস্তার রোধে সরকার গৃহীত পদক্ষেপগুলোও মনিটর করবে। আগামী মাসের মধ্যেই এসব বিশেষ সেলগুলোর রূপরেখা চূড়ান্ত হবে। জঙ্গিদের ফাঁসির দÐাদেশ যাতে দ্রæত কার্যকর করা যায় সেজন্যও ওই সেলগুলো কাজ করবে। একই সঙ্গে সেলগুলো পলাতক জঙ্গিদের আটকে পদক্ষেপ গ্রহণ ও তাদের মামলার হালনাগাদ অবস্থাও পর্যালোচনা করবে। জঙ্গিবিরোধী প্রচারণাসহ সরকার গৃহীত পদক্ষেপ কিভাবে চলছে সে বিষয়েও সেলগুলো খোঁজ-খবর নেবে। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন কারাগারে অন্তত ৫২ জন ফাঁসির দÐপ্রাপ্ত জঙ্গি আছে। তাদের বিষয়টি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সেল পর্যালোচনা করবে। অন্য মামলার ফাঁসির দÐপ্রাপ্তদের ব্যাপারেও খোঁজ নেবে ওই বিশেষ সেল।
সূত্র জানায়, দেশের কারাবন্দি জঙ্গিদের নিয়ে গোয়েন্দারা বিভিন্ন সময়ই প্রতিবেদনে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। বিশেষ করে ফাঁসির দÐপ্রাপ্ত ভয়ঙ্কর আসামিরা জোটবদ্ধ হওয়া এবং নানাভাবে রায়ের কার্যকারিতা স্থগিতের চেষ্টা করছে। কারাগারে জঙ্গি এসব আসামি নিজেদের মধ্যে শলাপরামর্শের পাশাপাশি বাইরের লোকজনের সাথেও যোগাযোগের সুযোগও পাচ্ছে। আত্মীয়স্বজন পরিচয়ে অনেকেই কারাবন্দি জঙ্গিদের সাথে দেখা করছে। আবার কারাগারের ভেতরেও থাকা অনেক বন্দিকে জঙ্গিবাদে দীক্ষিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে বিভিন্ন মামলার ফাঁসির দÐপ্রাপ্তদের ব্যাপারে হালনাগাদ তথ্যসহ করণীয় নির্ধারণে সরকার উদ্যোগী হয়েছে। সেক্ষেত্র ফাঁসির দÐপ্রাপ্ত জঙ্গিদের বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে।
সূত্র আরো জানায়, বর্তমানে জঙ্গিদের অনেকগুলো ফাঁসি কার্যকরের রায় আপিলে ঝুলে আছে। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারসহ দেশের বিভিন্ন কারাগারে আটক জেএমবি ও হুজির সদস্যসহ ১ হাজার ১৮১ জন ফাঁসির দÐাদেশ পাওয়া আসামি রয়েছে। কারা কর্তৃপক্ষ স্বাধীনতার পর এখন পর্যন্ত ৪৩২ আসামির মৃত্যুদÐ কার্যকর করেছে। কিন্তু উচ্চ আদালতে আসামিদের করা আপিলের কারণে বছরের পর বছর ধরে ঝুলে থাকায় এধরনের বন্দির সংখ্যাও বাড়ছে। স্বাধীনতার পর থেকে এখন পর্যন্ত ৪৩২ আসামির মৃত্যুদÐ কার্যকর করা হয়েছে। তার মধ্যে ১৯৭৬ সালে ৩ জন, ’৭৭ সালে ২৪৭ জন, ’৭৮ সালে ১৭ জন, ’৭৯ সালে ১ জন, ’৮০ সালে ১৩ জন, ’৮১ সালে ১৩ জন, ’৮২ সালে ৬ জন, ’৮৩ সালে ৬ জন, ’৮৪ সালে ৭ জন, ’৮৫ সালে ১৩ জন, ’৮৬ সালে ২৬ জন, ’৮৭ সালে ১ জন, ’৮৮ সালে ২ জন, ’৯০ সালে ১ জন, ’৯২ সালে ৫ জন, ’৯৩ সালে ৫ জন, ৯৪ সালে ২ জন, ’৯৭ সালে ২ জন, ২০০১ সালে ৩ জন, ২০০২ সালে ২ জন, ২০০৩ সালে ২ জন, ২০০৪ সালে ১৩ জন, ২০০৫ সালে ৫ জন, ২০০৬ সালে ৪ জন, ২০০৭ সালে ৬ জন, ২০০৮ সালে ৮ জন, ২০০৯ সালে ৪ জন, ২০১০ সালে ৯ জনের মৃত্যুদÐ কার্যকর করা হয়। ২০১১ ও ২০১২ সালে কোনো ফাঁসির রায় কার্যকর হয়নি। আর ২০১৩ সালে ১ জন, ২০১৪ সালে ৪ জন ও চলতি বছর ১ জনের ফাঁসি কার্যকর হয়েছে।
এদিকে সিলেটে হযরত শাহজালাল (রহ.) মাজারের সামনে সাবেক বিট্রিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরীর ওপর গ্রেনেড হামলা ও রমনা বটমূলে বোমা হামলার ঘটনায় আদালত মুফতি হান্নান, শফিকুল ইসলাম ও রিপনকে মুত্যৃদÐের আদেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু তারা উচ্চ আদালতে আপিল করেছে। ২০০২ সালের ১৭ জুলাই গাইবান্ধার স্কুলছাত্রী তৃষা হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার হয় শাহিন, মেহেদী হাসান মর্ডান ও আরিফুল ইসলাম আশা। নিম্ন আদালত তাদেরকে ওই বছরেরই ৩০ সেপ্টেম্বর ফাঁসির রায় দেন এবং ২০১০ সালে হাইকোর্ট ওই রায় বহাল রাখেন। কিন্তু আসামিদের পরিবার উচ্চ আদালতে আপিল করলে তা এখনো নিষ্পত্তি হয়নি। বিশেষ সেল গঠন হলে এ ধরনের মামলার রায় দ্রæত পরিণতি পাবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অন্যদিকে ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট সারাদেশে সিরিজ বোমা হামলা ঘটনার পর জেএমবির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ৩৫০টি মামলা দায়ের করা হয়। ইতিমধ্যে আদালত বেশির ভাগ মামলার রায় ঘোষণা করেছেন। এসব রায়ে এখন পর্যন্ত ৫৭ জঙ্গিকে মৃত্যুদÐ দেয়া হয়েছে। তার মধ্যে শায়খ আবদুর রহমান, সিদ্দিকুল ইসলাম বাংলা ভাই, আতাউর রহমান সানী, আবদুল আউয়াল, সাইফুল্লা ও মামুনকে ফাঁসিতে ঝোলানো হয়। কিন্তু এরপর জঙ্গি মামলার অন্য আসামিদের ফাঁসি কার্যকরের প্রক্রিয়া শ্লথ হয়ে পড়ে।
এ প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল জানান, জঙ্গি প্রতিরোধে প্রধানমন্ত্রী প্রতিটি জেলায় সেল গঠন করতে বিশেষ নির্দেশ দিয়েছেন। বিশেষ করে ফাঁসির দÐাদেশপ্রাপ্ত আসামিদের ব্যাপারে সেলগুলো বেশি কাজ করবে। আশা করি আগামী মাসের মধ্যে তা সম্পন্ন হবে। জঙ্গি নির্মূলে সরকার কাজ করে যাচ্ছে। আর তা জোরালো করতে সেল গঠন করা হচ্ছে।