February 21, 2026
ঢাকা: সরকারি ও বেসরকারি যৌথ উদ্যোগে বিপুল অর্থ ব্যয়ে নির্মিত দেশের বৃহত্তম ফ্লাইওভার (যাত্রাবাড়ী-গুলিস্তান) কাজে আসছে না। উদ্বোধনের সাড়ে তিন মাস অতিবাহিত হলেও হাজার কোটি টাকার এই ফ্লাইওভারের সুফল মিলছে না। অতিরিক্ত টোল আর নির্মাণ কাজে অসম্পূর্ণতা এ ফ্লাইওভারের মূল সমস্যা। চালকরা ফ্লাইওভার দিয়ে গাড়ি চালাতে চাইছেন না এখনও। ফলে যাত্রাবাড়ী ও গুলিস্তান এলাকায় যানজট কিছুতেই কামছে না। নিচে গাড়ির দীর্ঘ জট বেঁধে গেলেও ফ্লাইওভারের ওপর থাকে একেবারেই ফাঁকা। সন্ধ্যা হলে তাই ফ্লাইওভারের একপাশ হয়ে ওঠে ব্যান্ডমিন্টন খেলার মাঠ। ফ্লাইওভার চালু হলে এ যানজট কমবে বলে প্রত্যাশা থাকলেও এখনও প্রতিদিনই যানজটের কবলে পড়ে ভোগান্তি পোহাচ্ছেন সাধারণ মানুষ। ফ্লাইওভারের কুতবখালী টোল প্লাজা সূত্রে জানা গেছে, নতুন এই ফ্লাইওভারটির এক পাশ থেকে অপর পাশ যেতে (একবার) মিনিবাসের ১৭৩ টাকা, মাইক্রোবাসের ৮৫ টাকা, সিএনজির ১৮ টাকা, ট্রাকের ২৬০ টাকা, দূরপাল্লার বাসের ২৬০ টাকা, কাভার্ড ভ্যানের ১৩০ টাকা ও মোটরসাইকেলের টোল ১০ টাকা। ফ্লাইওভারটি ব্যবহারের আগে টোল দিতে থামা, গাড়িতে প্রি-পেইড স্টিকার লাগানো, পরিশোধিত টাকা শেষ হয়ে গেলে আবারও রিচার্জ করা ও টোলের খড়গ থেকে রক্ষা পেতেই অধিকাংশ চালকরা ফ্লাইওভার ব্যবহার করছেন না।
সরেজমিনে যাত্রাবাড়ী ফ্লাইওভার ঘুরে দেখা গেছে, জরুরি কোনো মালামাল আনা নেয়ার গাড়ি আর হাতে গোনা সাধারণ কিছু গাড়ি ছাড়া বাকি সব গাড়ি নিচ দিয়েই চলছে। চালকদের ভাষ্য, অতিরিক্ত টোল, ফ্লাইওভারের কাজের অসম্পূর্ণতা ও টোল আদায়কালে যে সময় নষ্ট হয় তার চেয়ে তারা নিচের রাস্তা ব্যবহারেই বেশি সুবিধা পান। কুমিল্লাগামী বিসমিল্লাহ ট্রাকের চালক নাজমুল জানান, তারা যে মালামাল আনা নেয়া করেন তাতে দুইবার এই ফ্লাইওভার ব্যবহারে তাদের গুনতে হয় বাড়তি সাড়ে পাঁচশ টাকা। টাকা বাঁচানোর জন্য ফ্লাইওভারের নিচের রাস্তা ব্যবহার করেন তারা।
যাত্রাবাড়ী রুটে চলা শিখর বাসের হেলপার আসলাম বলেন, ‘অনেক সময় টোল ও বাসের মালিককে ভাড়া দিতে গিয়ে আমাদের ক্ষতির মুখে পড়তে হয়। বাধ্য হয়েই আমরা বেশিরভাগ সময়ই ফ্লাইওভার ব্যবহার করি না।’ সিএনজি চালক রুহুল বলেন, ‘ফ্লাইওভারের টোল আমাদের মতো সিএনজি চালকদের জন্য বিপদ। যাত্রীর তাড়া না থাকলে ফ্লাইওভার ব্যবহার করা হয় না।’ এছাড়া এই ফ্লাইওভারের পাশে সন্ধ্যা হলেই চলে ব্যাডমিন্টন খেলা। ওইসব এলাকার উঠতি বয়সী যুবকরা রাস্তার আলো ব্যবহার করে ব্যাডমিন্টন খেলেন। ফলে ফ্লাইওভার উদ্বোধন হওয়ার পরে এখনও কাটছে না যানজট। একবার এ জট লাগলে তা স্থায়ী হয় ঘণ্টার পর ঘণ্টা। যানজট নিয়ন্ত্রনে হিমশিম খেতে হচ্ছে দায়িত্বরত ট্রাফিক কর্মকর্তাদেরও।
যাত্রাবাড়ী এলাকার বাসিন্দা মাহমুদুল হাসান বলেন, ‘কই যানজট তো কিছুতেই কমছে না। বরং যে লাউ সেই কদু।’ এখন চলছে এই ফ্লাইওভারের অবশিষ্ট কাজ। শ্রমিকরা এখনও ফ্লাইওভারের বিভিন্ন পয়েন্টে কাজ করছেন। কিন্তু এ ব্যাপারটি মানতে নারাজ নির্মাণ প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ। যাত্রাবাড়ী-গুলিস্তান ফ্লাইওভার পরিচালক আশিকুর রহমান কাছে দাবি করে বলেন, ‘ফ্লাইওভারের সব কাজ শেষ হয়েছে। যানবাহনও বেশ ভালো চলছে। কোনো সমস্যা নেই।’ নির্মাণ শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এখনও এই ফ্লাইওভারের অনেক কাজই বাকি আছে। ১১টি রেম্পের (সংযোগ সড়ক) মধ্যে মাত্র ছয়টির কাজ শেষ হয়েছে। বাকি পাঁচটির কাজ শেষ হয়নি। এর মধ্যে সায়েদাবাদ, পাগলা ও টিটিপাড়ার কাজ শেষ না হওয়ায় তা খুলে দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। গেল বছরের ডিসেম্বর মাসে এটি চালু করার কথা থাকলেও তার আগেই গত ১১ অক্টোবর তাড়াহুড়ো করেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ফ্লাইওভারটি উদ্বোধন করেন।
১১ কিলোমিটার দীর্ঘ ফ্লাইওভারটি যাত্রাবাড়ীর শনির আখড়া থেকে শুরু হয়ে গুলিস্তানের নিমতলী মোড়ে গিয়ে শেষ হয়েছে। ডিসিসি দক্ষিণ সূত্রে জানা গেছে, ফ্লাইওভারটি নির্মাণের জন্য ডিসিসি ২০০৫ সালের ২১ জুন ওরিয়ন গ্রুপের সঙ্গে একটি চুক্তি করে। কিন্তু কাজ শুরুর আগেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার চুক্তিটি বাতিল করে দেয়। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর ফ্লাইওভারটির নির্মাণকাজ আবার ওরিয়ন গ্রুপকেই দেয়। তবে শর্ত জুড়ে দেয় নতুন করে নকশা তৈরি এবং এটি আরও সম্প্রসারণ করতে হবে। তাই সরকারের নির্দেশে ওরিয়ন গ্রুপ আবারও নকশা সংশোধন করে। নতুন নকশায় ফ্লাইওভারটির দৈর্ঘ্য দাঁড়ায় ১১ কিলোমিটার। দৈর্ঘ্য বেড়ে যাওয়া এবং আনুষাঙ্গিক খরচ বেড়ে যায় নির্মাণ প্রতিষ্ঠানের। ফলে এখন এর নির্মাণ ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ১০৮ কোটি টাকা।
উল্লেখ্য, প্রকল্পের শুরুতে ফ্লাইওভারটির জন্য ব্যয় ধরা হয়েছিলো ৭৮৮ কোটি ৯০ হাজার ৩৮১ টাকা। কয়েক দফা নির্মাণ ব্যয় বাড়িয়ে বর্তমানে এটির নির্মাণ খরচ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ হাজার ৪শ কোটি টাকা।