April 5, 2026
চট্টগ্রাম: ঈদে `পাখি’ ফ্রক কিনে দেওয়ার বায়না ধরেছিল বড় মেয়ে রীমা। তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে মেজ মেয়ে সীমাও বলেছিলো আপুর মতো নতুন পোশাকের কথা। তবে বাবা যা কিনে দেবে তাতেই সন্তুষ্ট ছোট মেয়ে ঝুমা। কিন্তু মেয়েদের জন্য নতুন পোশাক আর কেনা হল না। এর আগেই আগেই তারা চলে গেলো না ফেরার দেশে। ‘কেউ যখন বেঁচে নেই, আমাকে কেন বাঁচিয়ে রাখলেন আল্লাহ। আমাকেও নিয়ে গেলে অন্তত তাদের সাথে ঈদ করতাম!’ এভাবেই বুক চাপড়ে আহাজারি করছিলেন স্ত্রী আর চার সন্তান হারানো মাহবুবুল আলম সওদাগর। রোববার রাতে চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলার মির্জাপুর ইউনিয়নের কুমারীকুল এলাকার রফিক সওদাগরের বাড়ির মাহবুবুল আলমের ঘরে অগ্নিকাণ্ডে দগ্ধ হেয়ে একই পরিবারের পাঁচজনের মৃত্যু হয়। গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণ ও বৈদ্যুতিক সর্ট সার্কিটে সৃষ্ট আগুনে মাহবুবের স্ত্রী রোজি আক্তার (৩৫), মেয়ে রীমা (১২),সীমা (১০), ঝুমা (৮) এবং একমাত্র ছেলে মারুফ (৪) মারা যায়। স্ত্রীসহ চার সন্তানের মৃত্যুর খবর শুনে অজ্ঞান হয়ে যান মাহবুবুল আলম। পরবর্তীতে স্থানীয় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা শেষে বাড়ি ফিরেন তিনি।
শোকে কাতর মাহবুবুলের কণ্ঠ রোধ হয়ে আসছে বার বার। কথা বলতে গিয়েই মূর্ছা যাচ্ছেন তিনি। জ্ঞান ফিরে এলেই বলছেন, ‘আমার রীমা কই। আমাকে ছাড়া সে চলে গেল কেন? এখন আমি কাকে নিয়ে বাঁচবো?’ কান্নাজরিত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘আমি রাতে দেরিতে বাড়ি ফিরতাম। বাচ্চারা না খেয়ে ঘুমিয়ে যেত। আমি গেলে এক সাথে রাতের খাবার খেতাম। রোববার দুপুরে বাড়িতে গেলে মারুফ বলেছিল রাতে সরকারহাট যাবে। তাকে নতুন শার্ট ও জিন্সের প্যান্ট কিনে দিতে হবে। কিন্তু আমি আর কিনে দিতে পারলাম না।’ বড় মেয়েকে ডাক্তার, ছোট মেয়েকে ইঞ্জিনিয়ার ও ছেলেকে পুলিশ বানানোর স্বপ্ন ছিল মাহবুবুলের। কিন্তু সেই স্বপ্ন কেবলই স্বপ্ন রয়ে গেল! এদিকে অগ্নিকাণ্ডের খবর এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে হাজার হাজার উৎসুক মানুষ ভিড় করে মাহবুবের বাড়িতে। স্বজনদের আহাজারিতে এলাকার পরিবেশ ভারি হয়ে উঠে। সৃষ্টি হয় এক হৃদয় বিদারক দৃশ্যের। মাহবুবের মা জারিয়া বেগম বাংলানিউজকে বলেন, ইফতারের সময় আমার নাতি নাতনিদের সাথে কথা হয়েছিল। ঈদের কাপড়ের ব্যাপারে তাদের সাথে অনেক ঠাট্টা করেছি। আমি নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছি না। আগুন মূহূর্তের মধ্যে কিভাবে আমার ছেলের পরিবারকে ছাই করে দিল। আমার ছেলে কিভাবে বাঁচবে? কাকে নিয়ে বাঁচবে? সে কী স্বাভাবিক জীবন-যাপন করতে পারবে? ছোট বেলা থেকে সবজি ব্যবসার সাথে জড়িত মাহবুব ২০০২ সালে মুছার দোকান এলাকায় বিয়ে করেন। তিন ভাই ও দুই বোনের মধ্যে মাহবুব সবার বড়। মাহবুবের ছোটভাই আজম বাংলানিউজকে বলেন, আমরা সবাই বাজারে ছিলাম। ঘরে নতুন সিলিন্ডার এনেছিলেন ভাইয়া। গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে ঘরে আগুন ধরে যায়। এসময় আগুন মুহূর্তে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। এ ভাবী বারবার বাঁচার আকুতি জানালেও বিচ্ছিন্ন ঘর হওয়াতে কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই পাঁচজন দগ্ধ হয়ে মারা যান।