পৃথিবীকে জেনে নিন আপনার ভাষায়….24 Hrs Online Newspaper

ইউসুফের মামলার নিষ্পত্তি

Posted on February 12, 2014 | in জাতীয় | by

1089_1ঢাকা: বিচার চলাকালে মারা যাওয়ার কারণে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধে অভিযুক্ত জামায়াতের সিনিয়র নায়েবে আমির একেএম ইউসুফের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলার নিষ্পত্তি ঘোষণা করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। বুধবার দুপুরে চেয়ারম্যান বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের নেতৃত্বে ৩ সদস্যের ট্রাইব্যুনাল মামলা নিষ্পত্তির আদেশ দেন। এর আগে সকালে এ বিষয়ে প্রসিকিউশন ও আসামিপক্ষের শুনানি গ্রহণ করেন ট্রাইব্যুনাল।  নিষ্পত্তির আদেশে মামলার বিস্তারিত কার্যক্রম তুলে ধরে ট্রাইব্যুনাল বলেন, আদেশের মাধ্যমে মামলার সকল কার্যক্রম বন্ধ করে তা  নিষ্পত্তি করা হলো। তার মানে এই নয় যে, তিনি মরণোত্তর ক্ষমা পাওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেছেন। তার আকস্মিক মৃত্যুতে আমরা দুঃখ প্রকাশ করছি। তার এই মৃত্যুতে তিনি নিজেই কেবল বিচার প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হননি, ক্ষতিগ্রস্থরাও তাতে ব্যাপকভাবে বঞ্চিত হয়েছেন।

গত রোববার বেলা সাড়ে এগারোটার দিকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে নেওয়ার পথে মারা যান একেএম ইউসুফ। ৮৭ বছর বয়স্ক ইউসুফ হৃদরোগ ও বার্ধক্যজনিত নানা রোগে ভুগছিলেন।  সকালে কাশিমপুর কারাগারে অসুস্থ হয়ে পড়লে ইউসুফকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে আনা হচ্ছিল। পথেই অজ্ঞান হয়ে পড়েন তিনি। হাসপাতালে আনার পর কর্তব্যরত চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আব্দুল মজিদ জানান, হাসপাতালে আনার আগেই হার্ট অ্যাটাকে মারা গেছেন তিনি।  দুপুরে ইউসুফের পরিবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এ ময়না তদন্ত ছাড়াই লাশ হস্তান্তর করার জন্য আবেদন করেন। পরিবারের পক্ষে ইউসুফের আইনজীবী গাজী তামিম এ আবেদন জানান। শুনানি শেষে আবেদন নাকচ করে কারাবিধি অনুযায়ী কারা কর্তৃপক্ষ পরবর্তী পদক্ষেপ নেবেন বলে আদেশ দেন বিচারপতি মুজিবুর রহমান মিয়া ও শাহীনুর ইসলামের সমন্বয়ে ২ সদস্যের ট্রাইব্যুনাল। লাশ ময়না তদন্তের পর পরিবারের কাছে হস্তান্তর ও ইউসুফের মৃত্যুর কারণ জানাতে নির্দেশ দেন ট্রাইব্যুনাল।

এ আদেশের পর বিকেল পাঁচটার দিকে ময়না তদন্ত করতে ইউসুফের লাশ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে থেকে নিয়ে যাওয়া হয় ঢামেক হাসপাতালে। সন্ধ্যায় ময়না তদন্ত শেষে ইউসুফের লাশ কাশিমপুর কারাগার ও ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ইউসুফের বড় ছেলে একেএম মাহবুবুর রহমানের কাছে হস্তান্তর করেন। ময়না তদন্তকারী চিকিৎসক হাসপাতালের ফরেনসিক চিকিৎসক ঢামেকের সহকারী অধ্যাপক একেএম শফিউজ্জামান জানান, মৃতের শরীরে কোনো আঘাতের চিহ্ন ছিল না। মস্তিস্কে রক্তক্ষরণের কারণে মৃত্যু ঘটেছে। তবুও রাসায়নিক পরীক্ষার জন্য ভিসেরা সংগ্রহ করে রাখা হয়েছে।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এ একেএম ইউসুফের বিরুদ্ধে একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ পর্যায়ে ছিল। তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষীদের সাক্ষ্যগ্রহণ ও পক্ষে সাফাই সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়েছে। বুধবার মামলার শেষ ধাপ যুক্তিতর্ক (আর্গুমেন্ট) উপস্থাপন শুরুর কথা ছিল। গত বছরের ১২ মে প্রসিকিউশনের দাখিল করা আনুষ্ঠানিক অভিযোগ (ফরমাল চার্জ) আমলে নিয়ে মুক্তিযুদ্ধকালে রাজাকার বাহিনীর প্রতিষ্ঠাতা ইউসুফের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে ট্রাইব্যুনাল। ওই দিনই ধানমণ্ডির বাসা থেকে তাকে গ্রেফতার করেন র্যাব সদস্যরা। এরপর থেকে কারাগারে ছিলেন ইউসুফ। জামায়াতের এই নেতাকে হত্যা, গণহত্যা, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটসহ ৪ ধরনের ১৩টি মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়। এর মধ্যে হত্যার ৫টি, গণহত্যার ৭টি এবং অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ১টি অভিযোগ রয়েছে। সব মিলিয়ে প্রায় ৭০০ জনকে হত্যা ও গণহত্যার সঙ্গে জড়িত থাকার জন্য অভিযুক্ত হন ইউসুফ। এছাড়া তার বিরুদ্ধে ৩০০ বাড়ি ও ৪০০ দোকান লুটের অভিযোগ করা হয়েছে।

ইউসুফের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ নির্দেশ, পরামর্শ ও প্ররোচনায় খুলনার বিভিন্ন এলাকায় গণহত্যা, হত্যা, ধর্ষণ, লুণ্ঠন ও অগ্নিসংযোগসহ মানবতাবিরোধী নানা অপরাধ সংঘটিত হয় বলে তার বিরুদ্ধে আনা হয়েছে সুপিরিয়র রেসপনসিবিলিটির (উর্ধ্বতন নেতৃত্বের দায়) অভিযোগও। মুক্তিযুদ্ধের সময় এ দেশে পাকিস্তানিদের গঠিত কথিত মালেক সরকারের মন্ত্রিসভার সদস্য ছিলেন ইউসুফ। অভিযোগে বলা হয়েছে, একাত্তরে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে হত্যা-লুণ্ঠনে সহায়তা দেওয়ার জন্য গঠিত সশস্ত্র বাহিনীর ‘রাজাকার’ নামটি তিনিই চালু করেন।

সেই সময় কেন্দ্রীয় শান্তি কমিটির নির্দেশে এ কে এম ইউসুফ নিজে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নিয়ে প্রথমে বৃহত্তর খুলনা জেলায় (খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট) শান্তি কমিটি গঠন করেন। পরে মহকুমা, থানা এবং ইউনিয়ন পর্যায়ে জামায়াত ও মুসলিম লীগের সদস্যরাসহ স্বাধীনতাবিরোধীদের নিয়ে শান্তি কমিটি গঠন করেন তিনি।

বিভিন্ন এলাকা থেকে ৯৬ জনকে নিয়ে তিনি খুলনার আনসার ও ভিডিপি ক্যাম্পে সশস্ত্র রাজাকার বাহিনী প্রতিষ্ঠা করেন। ওই অঞ্চলের শান্তি কমিটি, রাজাকার, আলবদর, আলশামস বাহিনীসহ স্বাধীনতাবিরোধীদের নেতৃত্ব দেন। জামায়াতের উচ্চ পর্যায়ের নেতা, বৃহত্তর খুলনার শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান, রাজাকার বাহিনীর প্রতিষ্ঠাতা ও মন্ত্রী হিসেবে ইউসুফ পাকিস্তানি সেনাদের বিভিন্ন নির্দেশনা ও পরামর্শ দিতেন বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর দালাল আইনে ইউসুফের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হলেও আইনটি বাতিল হলে পরে তিনি মুক্তি পেয়ে যান। এক সময় জামায়াতের ভারপ্রাপ্ত আমিরের দায়িত্বও পালন করেছেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত দলের সিনিয়র নায়েবে আমির ছিলেন তিনি।

সর্বশেষ খবর

আজকের ছবি

www.facebook.com

Tag Cloud