March 16, 2026
ঢাকা: গত মঙ্গলবার খবরটি ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই ‘গুজব’ বলে উড়িয়ে দিলেও শেষ পর্যন্ত সরেই যেতে হলো আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলামকে। স্থানীয় সরকারের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেনকে। এর মধ্য দিয়ে সৈয়দ আশরাফ হয়ে গেলেন ‘দপ্তরবিহীন’ মন্ত্রী।
বৃহস্পতিবার দুপুরে সৈয়দ আশরাফকে সরিয়ে দিয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ সরকারের রুলস অব বিজনেস, ১৯৯৬ এর রুল ৩ (৪)-এ প্রদত্ত ক্ষমতাবলে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালায়ের মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলমাকে দপ্তরবিহীন মন্ত্রী করা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেনকে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। তিনি অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করবেন।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ মোশাররাফ হোসাইন ভূইঞা স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনটিতে এ আদেশ অবিলম্বে কার্যকর হবে বলে জানানো হয়েছে।
গত মঙ্গলবার ছিল একনেকের বৈঠক। নতুন অর্থবছরের প্রথম একনেকের সভা ছিল সেটি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নির্দিষ্ট সময়ে হাজির হলেও দলের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম ওই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন না। অথচ বৈঠকের প্রথম এজেন্ডাই ছিল তার মন্ত্রণালয়ের। এলাকার বাঁধ, রাস্তাঘাট, কালভার্ট নির্মাণের জন্য ২৮৪ জন সংসদ সদস্যকে প্রত্যেককে ২০ কোটি টাকা দেয়া হবে। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগ এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে।
জানা যায় প্রধানমন্ত্রী বৈঠক শুরু করতে তার জন্য অপেক্ষা করেন। ২৫ মিনিট পার হয়ে যায়। এক পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘তিনি ( সৈয়দ আশরাফ) মিটিং টিঢিংয়ে আসেন না। তাকে সরিয়ে দিলেই হয়।’
সূত্র জানায়, এসময় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কণ্ঠ মেলান আশরাফ বিরোধীরা। তারা বলেন, তিনি তো বেশিরভাগ মিটিংয়েই আসেন না। তার কোনো প্রডাকশনও থাকে না।
সূত্র আরো জানায়, এ ঘটনার পরই মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোশাররাফ হোসাইন ভূইয়া তৎপর হয়ে ওঠেন। কেবিনেট ডিভিশনে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তিনি নির্দেশ দেন এ সংক্রান্ত সার সংক্ষেপ তৈরি করে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠাতে। তার নির্দেশ পেয়ে সার সংক্ষেপ তৈরি করে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়েও পাঠানো হয়।
একনেক বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষুব্ধ মনোভাব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে দল এবং সরকারে আশরাফের শুভাকাঙ্ক্ষিদের কাছে। তারাও তৎপর হয়ে ওঠেন পরিস্থিতি সামাল দিতে। পরে সেদিন আর প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়নি।
মন্ত্রণালয় থেকে সরিয়ে দেয়ার এই টালমাটাল পরিস্থিতির মধ্যেই গত মঙ্গলবার দুপুরে সৈয়দ আশরাফ চলে যান নিজ জেলা কিশোরগঞ্জে। বিকেলে তিনি সদর উপজেলার নবনির্বাচিত ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে ইফতার মাহফিলে যোগ দেন।
অনুষ্ঠানের বক্তৃতায় তিনি বলেন, ‘জননেত্রী শেখ হাসিনা উন্নয়ন করতে করতে চান। তাই উন্নয়নের জন্য তার হাতকে শক্তিশালী করতে হবে।’ ওই দিন ঢাকা থেকে কিশোরগঞ্জ রওনা হওয়ার সময় সৈয়দ আশরাফ তাকে সরিয়ে দেয়ার ঘটনাকে ‘গুজব’ বলে অভিহিত করে তাতে কান না দেয়ার পরামর্শ দেন।
কিন্তু একদিনের মাথায় গুজবই সত্যি হলো!
কী কারণে স্থানীয় সরকারের মতো গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় থেকে সৈয়দ আশরাফকে সরিয়ে দেয়া হলো তা নিয়ে নানা কথা হচ্ছে। কেউ বলছেন, তিনি নিয়মিত মন্ত্রণালয়ে যান না। বিভিন্ন মিটিং-টিটিংয়েও সময়মতো যোগ দেন না। কেউ বলছেন, কাজে কর্মেও তার কোনো প্রডাকশন নেই।
বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, মন্ত্রিপরিষদের রদবদল নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের দূরত্বের সৃষ্টি হয়েছিল। দল ও সরকারে আশরাফবিরোধী অংশ সেই বিরোধকে কাজে লাগিয়েছে।
বিএনপির সরকার বিরোধী আন্দোলন নস্যাৎ করে দেয়ার পর থেকেই মন্ত্রিসভায় রদবদলের কথা হচ্ছে। ঈদের আগে-পরে এই রদবদল হতে পারে। সরকারের কিছু বিতর্কিত লোককে সরিয়ে অপেক্ষাকৃত ক্লিন ইমেজের লোকদের মন্ত্রিসভায় যুক্ত করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন আশরাফ। বিশেষ করে তিনি ত্রাণমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া, খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম, শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদকে সরিয়ে দেয়ার পক্ষে ছিলেন। পাশাপাশি মহীউদ্দীন খান আলমগীর, ডা. দীপু মনি, ড. হাছান মাহমুদের মতো নেতারাও যাতে মন্ত্রিসভায় যোগ দিতে না পারেন তার পক্ষে অবস্থান নেন তিনি।
মন্ত্রিসভার সম্ভাব্য রদবদলে শেষোক্ত তিন নেতার যুক্ত হওয়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানিয়েছে সূত্র।
সূত্র আরো জানায়, অপেক্ষাকৃত ক্লিন ইমেজের লোকদের মন্ত্রী করে ২০১৭ সালের দিকে নির্বাচন দেয়ার জন্যও পরামর্শ দেন সৈয়দ আশরাফ। কিন্তু এসব বিষয় নিয়ে একসময় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তার মতানৈক্যের সৃষ্টি হয়।
জানা গেছে, সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম টানা ছয় বছর ধরে দলের সাধারণ সম্পাদক ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রী থাকলেও তার বিরোধী একটি শক্তিশালী গ্রুপ ঐক্যবদ্ধ ছিল। ওই গ্রুপে রয়েছেন: সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবীর নানক।
সূত্র জানায়, গত ছয় বছরে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে সৈয়দ আশরাফের দুর্নীতিবিরোধী অবস্থানের কারণে দলের একটি গ্রুপ তার ওপর ক্ষুব্ধ ছিলেন। তারা সেই সুযোগটি কাজে লাগিয়েছেন। তার কঠোর অবস্থানের কারণে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দুর্নীতি কমে এসেছে। অন্যান্য মন্ত্রীর দুর্নীতি নিয়ে কানাঘুষা শোনা গেলেও সৈয়দ আশরাফকে নিয়ে তেমনটি শোনা যায়নি।
সূত্র জানায়, সৈয়দ আশরাফকে স্থানীয় সরকার থেকে সরিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নেয়ার প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল। এই মন্ত্রণালয়ে প্রতিমন্ত্রী রয়েছেন আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল এমপি। কিন্তু তাতে রাজি হননি সৈয়দ আশরাফ।
সূত্র জানায়, আশরাফের শুভাকাঙ্ক্ষিরা আশা করছেন, শিগগির সৈয়দ আশরাফকে মর্যাদাপূর্ণ কোনো মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেয়া হবে।
শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু, বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ, অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবে আলমরা চাচ্ছেন সৈয়দ আশরাফ যোগ্য মর্যাদায় ফিরে আসবেন। আর তা না হলে তিনি নিজ থেকেই ক্যাবিনেট থেকে সরে যেতে পারেন।