পৃথিবীকে জেনে নিন আপনার ভাষায়….24 Hrs Online Newspaper

অভাব-বেকারত্বেই ঝরলো তিনটি প্রাণ

Posted on April 30, 2015 | in সারা দেশ | by

ঢাকা: স্কুলের ডায়েরি পড়ে রয়েছে বিছানার উপর, পড়ে রয়েছে বই খাতা কলম আর স্কুলব্যাগ। হতদরিদ্র ঘরের সন্তান কিন্তু স্বপ্নবান আপন দুই faishal_ele_bg_985406850বোন জান্নাতী ও মীম। সহপাঠিরা এসে তাদের দুই বান্ধবীর বই খাতা ডায়েরি দেখে চোখের পানি ফেলেছে শুধু। পরে চোখ মুছতে মুছতে ফিরে গেছে তারা। স্বামী-স্ত্রীর কলহ এবং অর্থনৈতিক সংকট এই দুই কারণেই দুই কন্যাসহ নিজের শরীরে বিদ্যুতের খোলা তার পেছিয়ে আত্মহত্যা করেন ইলেক্ট্রিক মিস্ত্রী বাবুল বিহারী (৪০)। জান্নাতী ও মীমের বান্ধবী সুমাইয়্যা সুমী জানায়, জান্নাতীর ইচ্ছে ছিলো বড় হয়ে ডাক্তার আর মীমের ইচ্ছা ছিল ‘ম্যাডাম’ অর্থাৎ শিক্ষিকা হওয়ার। কিন্তু এই দুই বোনের স্বপ্নের পথে কাঁটা হয়ে দাঁড়ালো তাদের হতদরিদ্র পরিবারের অভাব অনটন। একারণেই তাদের বাবা মায়ের কলহ ও সাময়িক বিচ্ছেদ। চলতি এপ্রিল মাসের ১০ তারিখ পরিবারে আর্থিক অভাব-অনটনের কারণে কলহের জের ধরে বাবুলের স্ত্রী সখিনা ঘর ছেড়ে চলে যান। এমন অবস্থায় তাদের দুই কন্যা জান্নাতী (১০) এবং মীম (০৯) কামরাঙ্গীরচরের মধ্য-রসুলপুরের রনি মার্কেট সংলগ্ন ১ নং গলির ৪ নম্বর দ্বিতল টং বাড়ির উপরের তলার এক রুমে তাদের বাবার সাথে থেকে যায়।

সরেজমিনে গিয়ে টং বাড়ির মালিকের পুত্রবধু কল্পনা বেগমের কাছ থেকে জানা যায়, বাবুল এবং তার স্ত্রী সখিনা তাদের দুই কন্যা জান্নাতী ও মীমকে নিয়ে গত ২ বছর ধরে ঘর ভাড়া করে থাকতেন। বাবুলের ইলেক্ট্রিক জিনিসপত্র মেরামত করার দোকান ছিলো। কিন্তু তিনি অনেকটা কর্মবিমুখ স্বভাবের হওয়ায় দোকানের ভাড়ার টাকার ব্যবস্থা করাই কঠিন হয়ে পড়তো। এমন অবস্থায় স্ত্রী সখিনা বাসা থেকে ১৫ মিনিটের দূরত্বে একটি ট্রাউজার কারখানায় কাজ নেন। সখিনার বেতন প্রতিমাসে ৬ হাজার টাকা। কাজকর্মের ব্যাপারে এক পর্যায়ে বাবুলের মধ্যে গা-ছাড়া ভাব জন্ম নেয়। দোকানপাট ছেড়ে ঘরে বসে বসে সারাদিন টেলিভিশন দেখতেন, মাঝে মাঝে মন চাইলে আশপাশের বাসাবাড়িতে গিয়ে ইলেক্ট্রিক মিস্ত্রির কাজ করে দিতেন। সামান্য যে আয় করতেন তা তার তার সিগারেট কেনার পেছনেই চলে যেতো। এমনটাই জানালেন তাদের প্রতিবেশী কল্পনা আক্তার।

এমন পরিস্থিতিতেও সখিনা একা সংসারের হাল ধরে রেখেছিলেন। এলাকার এসএস ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের তৃতীয় শ্রেণীতে পড়ুয়া তাদের দুই মেয়ের পড়ার খরচও সখিনাই চালাতেন। এই অর্থ সংকটের কারণে বাবুল আশপাশের কয়েকটি সমিতি ও পরিচিতজনদের কাছ থেকে প্রায় ২ লাখ টাকা ঋণ করেন। সেই টাকা খরচ করেন সংসারের পেছনে। কিন্তু কর্মহীন থাকায় সেই টাকাও ফুরিয়ে যায়। অভাব অনটন লেগেই থাকে ছোট্ট এই সংসারে। কর্মবিমুখ দরিদ্র বাবুলও একের পর এক ধারকর্জ করতে থাকেন। তার কাছে বাড়ির মালিক পেতেন ৫ মাসের ভাড়ার টাকা, প্রতিবেশীদের কেউ ১০ হাজার, কেউ ২০ হাজার আবার কেউবা ৩০ হাজার টাকা পেতেন।

বাড়ির মালিকের স্ত্রী আসমা বেগমের কন্ঠে উঠে আসে বাবুলের নানা সমস্যা ও সংকটের কথা: ‘কয়েকটি সমিতি থেকে দেখতাম কিস্তির টাকা চাওয়ার জন্য লোকজন বাবুলের কাছে আসতো। কিন্তু বাবুল কিস্তির টাকা দিতে পারতো না। তাই সমিতির লোকজন তাকে গালি গালাজ করে হুমকি ধমকি দিয়ে চলে যেতো। এসবের কারণে বাবুল মানসিক সমস্যায় ভুগতো। বদমেজাজী বাবুল অনেক সময় অকারণেই স্ত্রী সখিনাকে মারধর করতো। এসব সইতে না পেরে সখিনা ঘর সংসার ছেড়ে চলে যায়। ফলে দুই কন্যাকে দেখাশোনা ও সংসার চালানোর বোঝা এসে পড়ে দিশেহারা বাবুলের ঘাড়ে। অবশ্য সখিনা অজ্ঞাত স্থান থেকে ফোন করে দুই কন্যার খোঁজ খবর নিতো। ফিরে আসার আশ্বাসও দিতো। স্ত্রী ছাড়া সংসার চালাতে অপারগ বাবুল মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়ে। তার উপর প্রায় দুই লাখ টাকার ঋণের বোঝা! বাবুল প্রতিবেশীদের প্রায়ই বলতো, দুই কন্যাকে নিয়ে সে আত্মহত্যা করবে। এবং সেই ভয়ানক হৃদয়বিদারক কাণ্ডটাই তো করলো।’

২৯ এপ্রিল ভোর রাতে শরীরে বিদ্যুতের তার পেঁচিয়ে দুই কন্যাকে নিয়ে আত্মহত্যা করেন। রাত ১টায় বাড়ির মালিকের স্ত্রী আসমার সঙ্গে কথা বলে তিনি নিজের রুমে যান। তার আগে দুই মেয়ে গরুর গোস্ত খেতে পছন্দ করে বলে তা কিনে এনে নিজ হাতে রান্না করে দুই মেয়েকে যত্ন করে খাইয়ে শুইয়ে রাখেন। কিন্তু মেয়েদের ঘুম আসছিল না। তখন তিনি তাদের মারধর করে ঘুমাতে বাধ্য করেন। প্রতিবেশী সুবর্ণা জানান, ২৯ এপ্রিল (বুধবার) ভোরে বাবুলের এক খালাশ্বাশুড়ি এসে বাবুল ও দুই কন্যার খোঁজখবর জানতে এসেছিলেন। কারণ রাত ৩টায় বাবুল খালা শ্বাশুড়িকে মোবাইলে কল দিয়ে বলেছিলেন তিনি আত্মহত্যা করবেন। এই কারণে তিনি খবর নিতে এসেছিলেন। ভোরে এসে তিনি দেখেন রুমের দরজা লাগানো এবং ভিতরে টেলিভিশন চলছে। তারা টেলিভিশন দেখছে মনে করে খালাশাশুড়ি ফিরে যান। কিন্তু তিনি বুঝতে পারেননি যে বাবুল সেই ভয়ানক কাণ্ডটিই করে ফেলেছেন।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বাবুলের দুই কন্যার দুই হাতে দুই পায়ে এবং তার নিজের দুই পায়ে এবং হাতে বিদ্যুতের তার পেঁচানো। বাবুলের বুকের উপর মাল্টিপ্লাগের সঙ্গে মূল বৈদ্যুতিক বোর্ডের সকেটের সংযোগ রয়েছে। প্রতিবেশী সূবর্ণা জানান, অন্যান্য দিন বাবুল ও তার দুই কন্যা সকাল ১০টার মধ্যে ঘুম থেকে উঠলেও ঘটনার দিন দুপুরে জোহর আযানের সময় না উঠার কারণে সন্দেহ হয়। পরে টিনের দরজা ভেঙ্গে দেখা যায় তার পেঁচানো অবস্থায় বাবা ও দুই মেয়ের নিথর লাশ পড়ে রয়েছে বিছানা উপর। ছোট মেয়ে মীম ছিল বাবা ও তার বড় বোনের মাঝখানে। বৈদ্যুতিক শকে সকলের হাতে ও পায়ে কালো দাগ হয়ে পুড়ে গেছে।
সৌজন্য….বাংলানিউজ

Comments are closed.

সর্বশেষ খবর

আজকের ছবি

www.facebook.com

Tag Cloud