পৃথিবীকে জেনে নিন আপনার ভাষায়….24 Hrs Online Newspaper

এমপি যখন ডাকাত কিংবা লুটেরা

Posted on February 12, 2014 | in রাজনীতি | by

af4e8adc30450172acb61e7253d07dfeগোলাম মাওলা রনি : শিরোনামটি যেনো কিরাম কিরাম হয়ে গেলো- ঠিক যেনো বাংলা সিনেমার নামের মতো। কয়েকদিন যাবৎ মনে হচ্ছিলো একটি সিনেমা বানাই হালের ক্রেজ অনন্ত জলিলের মতো। অনন্ত আমার তরুণ বন্ধু, ও যদি পারে তবে আমি পারবো না কেনো। ও তো নিজে কাহিনী লিখে। তারপর পরিচালনা এবং অভিনয়সহ অন্যান্য খুঁটিনাটি কাজও নিজে করে। তার ছবির নায়িকা সাধারণত তার স্ত্রী বর্ষাই হয়ে থাকেন। আমার স্ত্রী অবশ্য নায়িকা হতে রাজী নন। তাতে আমার ভালোই হয়েছে। বোম্বে বা কোলকাতা থেকে আমার সঙ্গে মানানসই নায়িকা আমদানী করা যাবে। কয়েকজন আমার বেশ জানা শোনা। এদের মধ্যে বিদ্যা বালানই আমার বেশ পছন্দ- রানী মুখার্জীও খারাপ হবে না। জীবনের অনেক অভিজ্ঞতা সিনেমার কাহিনীকেও হার মানিয়েছে- তাইতো পরিনত বয়সে এসে নতুন করে রং ঢং করার শখ জেগেছে। শিরোনামের বিষয়টি বিস্তারিত বলার আগে বলে নেই হঠাৎ করে আজ লেখার তাড়না অনুভব করলাম কেনো।

বাংলাদেশ প্রতিদিনের সহযোগী পত্রিকা দৈনিক কালের কন্ঠে খবর বেরিয়েছে- বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে পদ্মা সেতু নির্মাণ করা হচ্ছে। বিশ্বব্যাংক ও অন্যান্য আর্ন্তজাতিক সংস্থা প্রয়োজনীয় অর্থায়ন না করার কারনে সরকার অবশেষে নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ করতে যাচ্ছে। এই কাজের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের বিপরীতে যে বৈদেশিক মূদ্রা লাগবে তা এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে সরবরাহ করা হবে। এই খবরের সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত আবেগ আর অনুভূতির অনেক কিছুই জড়িত। দেশের বাঘা বাঘা অর্থনীতিবিদ যখন বলেছিলেন- বিদেশী অর্থায়ন ছাড়া পদ্মা সেতু সম্ভব নয় কিংবা আমাদের বয়োঃবৃদ্ধ অর্থমন্ত্রী যখন বলেছিলেন- বিশ্বব্যাংক ছাড়া এ প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্ভব নয় – তখন সমগ্র স্রোতের বিপরীতে গিয়ে আমিই উচ্চস্বরে বলেছিলাম- সম্ভব। আমাদের নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু করা সম্ভব।

গত পাঁচটি বছর ধরে আমি বলে আসছিলাম- পদ্মা সেতু সম্পর্কে আমার পরিকল্পনার কথা। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে সম্পৃক্ত করে, স্থানীয়ভাবে অর্থের যোগান দিয়ে সেতুটি ৪/৫ বছরের মধ্যে নির্মাণ করা সম্ভব যা কিনা সরকার বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছে ঠিক সেই ভাবে যেভাবে আমি প্রথম প্রস্তাব উত্থাপন করেছিলাম যোগাযোগ মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে ২০১০ সালের প্রথম দিকে। এরপর বহু কলাম লিখেছি বাংলাদেশ প্রতিদিন সহ অন্যান্য পত্র পত্রিকায়। এছাড়া নানা সভা সমিতি, সেমিনার এবং টেলিভিশন টক শোতে অসংখ্যবার আমার প্রস্তাবনা সমূহ উপস্থাপন করেছি।

আমাদের দলের কট্টর পন্থীরা আমার এসব বক্তব্যে ভারী বিরক্ত হতেন। নিজেরা আমার বিরুদ্ধে বিষোদগার করে গালিগালাজ করতেন এবং দলের তরুণ বন্ধুদেরকে লেলিয়ে দিতেন। ভাগ্যিস তরুণীদেরকে লেলিয়ে দেননি! তাহলে আমার অবস্থা যে কি হতো তা সুপ্রীম কোর্ট প্রাঙ্গনে ইটা মারার দৃশ্য দেখেই বুঝতে পেরেছি। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সঙ্গে আমার স¤পৃক্ততা বহু দিনের। দলের যেসব প্রাজ্ঞ ও অভিজ্ঞ নেতাদের নেতৃত্বে রাজনীতি করতে করতে আমি যখন সংসদ সদস্য হয়ে গেলাম তখন চারিপাশে তাকিয়ে দেখি- আমি আছি কিন্তু আমার নেতারা নেই। ৯ম সংসদের কার্যকালীন সময়ে যারা সরকার ও দলের নেতৃত্বে ছিলেন তাদের বেশির ভাগই অখ্যাত, অযোগ্য এবং ব্যক্তি বা মহল বিশেষের করুনায় নিয়োগ প্রাপ্ত ছিলেন। অনেকে তাদেরকে মেনে নিয়েছিলেন প্রচন্ড হতাশা সত্বেও; আবার অনেকে মেনে নেননি কিন্তু চুপচাপ ছিলেন বাস্তব পরিস্থিতি এবং নিজেদের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে। কিন্তু আমি বিষয়টি কোনদিন মেনে নিতে পারিনি- অনায়াসে এবং নির্দ্বিধায় আমার মতামত ব্যক্ত করেছি।

২০১১ সালে আমি বাংলাদেশ প্রতিদিনে লিখেছিলাম- তোফায়েল ভাই, আমু ভাইকে মন্ত্রী পরিষদে দেখতে চাই। পুরোনো নেতাদেরকে রাজনীতিতে সুযোগ করে দেবার জন্য দলীয় সভানেত্রীকে একাধিকবার আহবান জানিয়েছিলাম। বলেছিলাম- মাহমুদুর রহমান মান্না, সুলতান মোহাম্মদ মনসুর, খ. ম. জাহাঙ্গীর, আখতারুজ্জামান, সাবের হোসেন চৌধুরী, মুকুল বোস, আব্দুল মান্নান, মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন প্রমুখ ব্যক্তিবর্গকে রাজনীতির পাদপীঠে নিয়ে আসা হোক। আমার যুক্তি ছিল- নেতা সহজে সৃষ্টি হয়না কিন্তু ধ্বংশ করতে সময় লাগেনা। আওয়ামী লীগ গত ৩০ বছর ধরে যাদেরকে সৃষ্টি করেছে তাদেরকে আবার নিজ হাতে বিনাশ করাটা ঠিক হবে না।

উপরোক্ত লেখা প্রকাশ হবার পর আমার শুভার্থীদের কেউ কেউ ফোন করে বলেছিলেন- তুমি কেনো খ. ম. জাহাঙ্গীরের কথা বলতে গেলে? সে যদি রাজনীতিতে পুর্নবাসিত হয় তাহলে তোমার যায়গা কোথায়?  আমি মুচকী হেসে বলেছিলাম- অসুবিধা নেই তবু আমি চাই তারা আসুক। আমার বিশ্বাস যদি এমপি হতে চাই তবে জনগণের ভোটে আমি তা হতে পারবো এবং সেক্ষেত্রে ইনশাআল্লাহ দলীয় মনোনয়ন লাগবে না। অন্যদিকে রাজনীতির মূল লক্ষ কেবল মন্ত্রী বা এমপি হওয়া নয়- যেকোন ভাবে জনকল্যাণ করার একটি অদম্য আকাংখ্যা থাকলে মানুষ কখনোই জনগণ কর্তৃক প্রত্যাখ্যাত হয় না। আর একজন মানুষ যদি সারাজীবন একাই পদ পদবী আকড়ে থাকে তাহলে নতুন নেতৃত্ব আসবে কিভাবে!

আমি এমপি নির্বাচিত হবার পর পরই ধরে নিয়েছিলাম- দ্বিতীয় মেয়াদে আমি মনোনয়ন চাইব না বা পাবো না কিংবা এমপি হতে পারবো না। ফলে আমার যা কিছু করতে হবে তা পাঁচ বছর মেয়াদের মধ্যেই করতে হবে। ফলে এলাকার উন্নয়ন, স্থানীয় এবং জাতীয় রাজনীতিতে নিজের একটি অবস্থান সৃষ্টি এবং একই সাথে আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে কিছু কাজ করার পরিকল্পনা আমি প্রথম থেকেই করে রেখেছিলাম। উদ্দেশ্য একটাই- এমপি না হলেও যেনো আমি জাতীয় রাজনীতির ধারাবাহিকতা ও আলোচনা থেকে বাদ না পড়ি কিংবা মানুষ যেনো আমাকে ভুলে না যায়।

পদ পদবীর প্রতি লোভ বা সীমাহীন আকাংখ্যা না থাকার কারনে আমি নির্ভয়ে সবকথা বলতে পেরেছি এবং এখনো পারছি। কোন প্রভাবশালীদের পদ লেহন আমাকে করতে হয়নি। ফলে নিজের মধ্যকার সহজাত এবং অর্ন্তনিহিত গুণাবলী নষ্ট হয়নি। অন্যদিকে নির্বাচনী এলাকার উন্নয়নে অসম্ভব সব কাজ কর্ম করতে পেরেছিলাম। একটি উদাহরন দিলেই সম্মানীত পাঠক বিষয়টি বুঝতে পারবেন। ঢাকার অদুরে বিমান বন্দর তৈরী করার জন্য মাত্র ৬০০ একর জমি অধিগ্রহন করার প্রয়োজন ছিলো। সরকার সর্বশক্তি নিয়োগ করেও তা পারেনি। অন্যদিকে নারায়নগঞ্জের ভুলতায় সেনা কর্মকর্তাদের জন্য আবাসিক এলাকা গঠন করতে গিয়ে জনরোষের কারনে সরকারকে পিছু হঠতে হয়েছে। এবার আমার এলাকার কথা বলি- এশিয়ার বৃহত্তম বীজ বর্ধন খামার প্রতিষ্ঠিত হলো আমার নির্বাচনী এলাকায়। বলতে দ্বিধা নেই- এই খামার প্রতিষ্ঠার চিন্তা এই অধমের মস্তিষ্ক প্রসূত। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, কৃষিমন্ত্রী, বর্তমান কৃষি সচিব এটি অনুমোদন দেয়া এবং সর্বাত্মক সাহায্য সহযোগীতার মাধ্যমে প্রকল্পটি বাস্তবায়নে কার্যকর ভূমিকা নিয়েছেন। কিন্তু নেপথ্যের সব কাজই আমি একক ভাবে করেছি।

যখন প্রকল্পটি একনেকে অনুমোদন লাভ করলো তখনই শুরু হলো আমার অগ্নি পরীক্ষা। প্রকল্পের জন্য মোট ৫৩০০(পাঁচ হাজার তিনশত) একর জমি অধিগ্রহন করতে হবে- এবং আমি তা করে দিলাম ২/৩ মাসের মধ্যে। একটি মিছিল হয়নি, একটি মামলা হয়নি- সরকারের পুলিশ বাহিনীকে কিছুই করতে হয়নি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ২০১৩ সালে সেটি উদ্বোধন করলেন কোন একদিন সকাল দশটার সময়। চারিদিকে ৭/৮ কিলোমিটার প্রশস্ত একটি নদী দ্বারা বেষ্টিত নির্জন দ্বীপটিতে অতো সকালে এক লাখ লোকের সমাবেশ করেছিলাম। সকাল ৯ টার মধ্যে লোকজন সমাবেশ স্থলে উপস্থিত হয়েছিলো যারা বাড়ী থেকে ট্রলারে করে রওয়ানা করেছিলো আগের দিন রাত ১২টার সময়। বিশাল নির্বাচনী এলাকার দরিদ্র পীড়িত এক লাখ লোক ৮/৯ ঘন্টা ট্রলার চালিয়ে- এবং ট্রলারে বসে ৩ বেলা খাবার খেয়ে সমাবেশে এসছিলো এম. পির আহবানে। আর আমি এসব করেছিলাম কেবল মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে সম্মান জানাবার উদ্দেশ্যে; নমিনেশন পাবার জন্য নয় কিংবা মন্ত্রী, এম.পি হবার জন্য নয়-

আজ আমি একথা ভেবে কিছুটা হলেও তৃপ্তি পাই যে- গত পাচঁটি বছর যেসব অযোগ্য ও অদক্ষ মন্ত্রীদের কার্যকলাপ এবং দূর্নীতি নিয়ে সরব ছিলাম- তারা সবাই নতুন মন্ত্রী পরিষদ থেকে বাদ পড়েছেন। অনেকেতো মনোনয়নই পাননি। যাদেরকে দিয়ে মন্ত্রী সভা গঠন করার জন্য বার বার প্রস্তাব করছিলাম- কমবেশী তাদেরকেই তো অর্ন্তভুক্ত করা হয়েছে। নতুন মন্ত্রী সভা নিয়ে তাই আওয়ামীলীগের ঘোর শত্র“রাও সমালোচনা করতে পারছে না। এসব বিষয় নিয়ে আমি যখন সমালোচনা মুখর থাকতাম তখন দলের কিছু লোক আমাকে নব্য খোন্দকার মোশতাক বলতো। তারা এখন কি বলবেন।
আমি আমার নির্বাচনী এলাকায় দলের একজন নিবেদিত কর্মী হিসেবে সর্বদা চেষ্টা করেছি দল ও সরকারের ভাবমূর্তি রক্ষা করার জন্য। সেখানকার ছাত্রলীগ, যুবলীগ বা আওয়ামীলীগের কোন নেতা কর্মীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, মাস্তানী বা অন্য কোন অরাজক কার্য-কলাপের অভিযোগ ছিলোনা। অত্যন্ত শক্ত হাতে আমি দুষ্টের দমন এবং শিষ্টের পালন করেছি। কোন সরকারী অফিস, কোর্ট কাচারী, থানা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কিংবা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে কোন রাজনৈতিক নেতা কর্মী সে যে দলের হোক প্রভাব বিস্তার তো দূরের কথা ঢুকতেও সাহস পেতো না। অভাবী ও অসহায় মানুষ জনেরা সব সময় নিরাপদ বোধ করতেন কারন প্রশাসনের সহযোগীতা পাওয়ার জন্য তাদেরকে কোন রাজনৈতিক নেতা বা টাউটদের দ্বারস্থ হতে হতো না।
আমার কার্যকালীন সময়ে আমি যখন এলাকায় যেতাম তখন কম করে হলেও পনের দিন থেকে একমাস পর্যন্ত অবস্থান করতাম। গত পাঁচ বছরে একটি সম্বর্ধনা নেইনি। একটি তোরন নির্মিত হয়নি আমার জন্য। চলা ফেরার জন্য পুলিশ প্রটেকশন দরকার হয়নি। একদিনের জন্য সরকারী গাড়ী ব্যবহার করিনি। কোন সার্কিট হাউজ বা ডাক বাংলোতে বসে সরকারী পয়সায় এক কাপ চা খাইনি। একটি ভাড়া করা মোটর সাইকেল নিয়ে দিনরাত পথে প্রান্তরে ঘুরে বেড়াতাম আর এম. পি গিরি করতাম একজন ইউ.পি মেম্বারের মতো। রাজনীতিতে আমি এসেছি ধনাঢ্য ব্যক্তি হিসেবেই এবং নিজস্ব অর্থ দ্বারাই সেবা করেছি। এলাকার মসজিদ, মন্দির, মাদ্রাসা, স্কুল কলেজ এবং আর্ত মানবতার পূনর্বাসন এবং চিকিৎসার জন্য স্বোপার্জিত অর্থই ব্যয় করেছি বেশী- অন্যদিকে সরকারী বরাদ্ধ সমূহ বন্টনে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করেছি।

আমি যখন এসব কাজ করতাম তখন নিজেকে সিনেমার নায়কের মতোই মনে হতো। কখনো কখনো মনে হতো হযরত ওমর (রাঃ) এর মতো। আমি শুধু নায়কের সফলতার কথাই চিন্তা করতাম। কিন্তু সিনেমার নায়কের করুন পরিনতি কিংবা বহুমুখী সড়যন্ত্র আর চক্রান্তের ফাঁদে পড়ার কথা ভাবনায় আসতো না। কিন্তু বাস্তবে আজ আমার জীবন সত্যিই নায়কের মতো হয়ে গেছে। শিরোনামের বিষয়-”এম.পি যখন ডাকাত কিংবা লুটেরা” নামক সিনেমার নায়ক হিসেবে আমি কি যে কি এক নিদারুন সময় পার করছি তা সম্মানীত পাঠকগনকে জানাতে চাচ্ছি। আমার জীবনের ট্রাজেডী থেকে কেউ হয়তো শিক্ষা নিতে পারবেন আবার কেউ হয়তো ট্রাজেডীর মধ্যে চরম একটি আদীম ও বন্য প্রকৃতির কমেডীর স্বাদ পেয়েও যেতে পারেন। কথা না বাড়িয়ে সিনেমার গল্পটি আপনাদের বলি।

নায়কের ছিলো ছোট্র একটি সুখী সংসার। সমবয়সী স্ত্রী – অনেকটা বন্ধুর মতো। অল্প বয়সে প্রেম করে বিয়ের পর জীবনের বাস্তবতায় নায়ক অর্থনৈতিক ও সামাজিক ভাবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে খুব দ্রুত। সচ্ছল সংসারে ২ টি ফুট ফুটে মেধাবী পুত্র সন্তান এবং একটি রাজ কন্যার মতো অপরুপা মেয়ে সন্তান নিয়ে নায়কের সুখী জীবন। রাজধানীর অভিজাত এলাকায় সুন্দর বাড়ী, দামী গাড়ী এবং কাড়ি কাড়ি উপার্জনের স্বপ্ন সুখের মধ্যে নায়কের হঠাৎ করেই ভাব আসলো – তিনি নেতা হবেন – জন নেতা ! দেশ সেবা করে স্বর্গে যাবেন।

নায়কের সারা শরীরে এমনিতেই ভীষন সুড়সুড়ি ছিলো- নেতা হবার পরিকল্পনা মাথায় আসতেই তার সুড়সুড়ি বেড়ে গেলো বহু গুনে। নায়কের যে সুড়সুড়ি ভাব এসেছে একথা প্রচার হয়ে গেলো এবং রাতারাতি পাত্রমিত্ররুপী রাজনৈতিক টাউট বাটপাররা ভীড় করলো নায়ককে কাতুকুতু দেবার জন্য। সুড়সুড়িযুক্ত নায়ক এমনিতেই হাসির রাজা তার উপর আবার লোক জনের কাতুকুতু পেয়ে মনের আনন্দে হেসে গড়াগড়ি দিতে লাগলো। নায়ক হাসে আর পকেট থেকে টাকার তোড়া বের করে বিলাতে থাকে। এভাবেই চললো বহুদিন। বহু চড়াই উৎরাই, ঘটনা দূর্ঘটনার পর নায়ক সত্যিই একদিন সংসদ সদস্য হয়ে গেলো।

নায়কের দুটো মারাত্মক বদভ্যাস রয়েছে- নিয়মিত লেখা পড়া এবং ধর্মমতে নৈতিক বিধান মেনে জীবন পরিচালনা করা। লিখা পড়ার মধ্যেও আবার দুটি খারাপ বিষয় রয়েছে- একটি ইতিহাস চর্চা আর অন্যটি জোর্তিবিজ্ঞান চর্চা। নায়কের দল রাষ্ট্র ক্ষমতায়। স্বভাবজাত কৃতজ্ঞ নায়ক সারাদিন দলীয় প্রধান এবং একই সঙ্গে সরকার প্রধানের জন্য নামাজ পড়ে দোয়া করে। স্ত্রী ছেলে মেয়েদেরকেও দোয়া করতে বলে। নায়ক ব্যক্তি জীবনে প্রচুর লাজুক লজ্জাবতী মেয়েদের চেয়েও বেশী। ফলে সে যার মঙ্গলাকাঙ্খায় দিবারাত্র সময় গুজার করে জীবনে একবারের জন্যও স্বপ্রনোদিত হয়ে তার সামনে যেতে পারেনি।

নায়ক হঠাৎ করেই লক্ষ করলো কিছু লোকের খারাপ কাজের দায় প্রধান মন্ত্রীর ওপর বর্তালো। জনগন বানিয়ে বানিয়ে নানা কল্প কাহিনী প্রচার করতে থাকলো। সরকার বিরোধীরা বাতাস দেয়া শুরু করলো। দেশের রাজনৈতিক অবস্থা সঙ্গীন হয়ে উঠলো। পুঁচকে নায়ক ভাবলো – এ অবস্থায় একটাই করনীয় – প্রধান মন্ত্রী এবং খারাপ লোক গুলোকে আলাদা ভাবে উপস্থাপন করতে হবে। লোকজনকে বুঝতে হবে যে যারা খারাপ কাজ করেছে তারা প্রধানমন্ত্রী এবং দলের সঙ্গে বিশ্বাস ঘাতকতা করেছে। দল বা প্রধানমন্ত্রী এসব কিছুই জানে না। এতে করে দল ও প্রধানমন্ত্রীর ইমেজ রক্ষা হবে যদিও পদ পদবীধারী কিছু লোকের ক্ষতি হবে। এটা অনেকটা অপারেশন বা অস্ত্রপচার করে ক্যান্সার ফেলে দেবার মতো। যদি ক্যান্সার ফেলে দেয়া না হয় তবে তা সারা শরীরে বিস্তার লাভ করে। এই কাজে নায়কের ঝুঁকি ছিলো শতভাগ- কারন প্রধানমন্ত্রী জানতেন না কেনো নায়ক এসব করছে। অন্যদিকে যাদের বিরুদ্ধে সে একা লড়াই করছিলো- তারা ছিলো সবাই ঐক্যবদ্ধ। তারা একসময় প্রধানমন্ত্রীকেও নায়কের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে ফেলে পরস্পর যোগসাজশে।

নায়ক সবই টের পাচ্ছিলো। কিন্তু তার কোন ভ্রুক্ষেপ ছিলোনা। তার উদ্দেশ্য একটাই- যে কোন মূল্যে প্রধানমন্ত্রীকে কলঙ্কমুক্ত রাখা এবং এ কাজে সে যতই সফলতা লাভ করতে থাকলো তার শত্র“রা ততই ঐক্যবদ্ধ হয়ে নায়কের পতনের জন্য উঠে পড়ে লাগলো। অবশেষে নায়ক ফাঁদে পড়ে জেলে গেলো এম.পি হবার সাড়ে চার বছর পরে। জেল থেকে বের হবার পর নায়ক ভিন্ন এক দুনিয়ার ভিন্ন এক স্বাদ অনুভব করতে লাগলো। অত্যধিক ব্যস্ততায় সে বিগত দিনগুলোতে লক্ষই করেনি- সে প্রধানমন্ত্রী, দেশ জাতি এবং দলের জন্য কাজ করতে গিয়ে নিজের অনেক সর্বনাশ করে ফেলেছে। চমৎকার সাজানো একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান প্রায় দেউলিয়া হয়ে গেছে। শিশু পুত্রটি বালক হয়েছে,বালিকা কন্যাটি কিশোরী হয়েছে এবং কিশোর পুত্রটি যুবক হয়ে গিয়েছে – আর প্রিয়তমা স্ত্রী বার্ধক্যের পথে পা বাড়িয়েছে।

জেল থেকে বের হয়ে দেখলো নায়কের মাথার উপর ৩টি মামলা। এর মধ্যে দু’টি হয়েছে তার নির্বাচনী এলাকায়। একটি ছিনতাই আর অন্যটি লুটের মামলা। নায়ক তার ছোট ভাই, ৭৫ বছর বয়স্ক শ্বশুর, শালা, সম্বন্ধি সহ পরিবারের প্রায় একশ লোক নিয়ে একজন ব্যক্তির ত্রিশ হাজার টাকা ছিনতাই করেছে এবং অজ পাড়া গাঁয়ের একটি দোকান লুট করেছে। নায়ক ওসিকে জিজ্ঞাসা করলো কেনো এই মিথ্যা মামলা ! ওসি বললো উপরের নির্দেশ – এস.পি জানে, এস.পি বললো ডি আইজি জানে। ডিআইজি বললো মন্ত্রীর কথা। আর মন্ত্রী বললো প্রধানমন্ত্রীর কথা। নায়ক জীবনে এই প্রথমবারের মতো হৃদয়ের গভীর থেকে গভীরে বেদনা অনুভব করলো। অভিমান করে কারো কাছে গেলো না; কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ করলো না; কেবল নিয়তি মেনে নেবার চেষ্টা করতে থাকলো –

এদিকে নায়কের পরিবারের বেশির ভাগ লোক জেলে গেলো। দিনের পর দিন পার হয় কোর্ট জামিন দেয় না। বিধবা মা কাঁদে, স্ত্রী কাঁদে শ্বশুর শ্বাশুড়ী কাঁদে। নায়ক লক্ষ করলো তার পঞ্চম শ্রেনীতে পড়–য়া ছেলেটি পরিবারের এই কষ্টের দিনে বাইরে খেলতে যায় না,- বাসায় বসে থাকে মুখ গোমরা করে। দশম শ্রেনীতে পড়–য়া মেয়েটি হঠাৎ কেমন জানি চুপ হয়ে গেছে। তার মুখে ব্রন উঠেছে- মনে হয় সারা রাত ঘুমায় না। আর বড় ছেলেটি যে কিনা এই বছর এইচ, এস, সি পরীক্ষা দেবে – সে একদম বাইরে যায় না। স্ত্রী নামাজ কালাম ও কোরআন তেলাওয়াতে মনোযোগী হয়ে উঠেছে- সারাদিন তছবি নিয়ে ঘুরে বেড়ায়।

এতো কিছুর পরও নায়কের কোনো পরিবর্তন নেই। সি নিয়মিত ইতিহাস চর্চা করে আর জোর্তিবিজ্ঞানের চুলচেরা মাপ কাঠিতে রাহু, শনি ও বৃহস্পতির অবস্থান নির্নয় করে। তার একটাই বক্তব্য আমি যা করেছি তাতে আমি অবশ্যই পুরস্কৃত হবো। এসব ঝামেলা খুবই সামান্য ও সীমিত সময়ের জন্য। একদিন নায়ক জ্ঞান চর্চা করছে- এমন সময় হন্ত দন্ত হয়ে স্ত্রী মহাশয়া এগিয়ে এলেন- বললেন- শুনেছ পুলিশ আব্বাকে তাড়া করছে। ৭৫ বছরের বৃদ্ধ মানুষ কতদিন পালিয়ে বেড়াবে। নায়ক উত্তর করলো আমার কি করার আছে ? স্ত্রী মেজাজ ঠিক রাখতে পারলেন না – ২৯ বছরের বিবাহিত জীবনে এই প্রথম স্বামীর মুখের উপর বলে দিলেন- তুমি একটা আস্ত ভোদাই, হাদারাম আর রাম ছাগল-

স্ত্রীর কথয় নায়ক বেশ মজাই পেলো। সে মনে মনে প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানালো। তার মনে পড়লো ২৯ বছরের পুরানো কথা। ১৯৮৬ সালে নায়কের বিয়ের সময় তার প্রভাবশালী এবং ধনাঢ্য শ্বশুর বড়ই ঝামেলা করেছিলো। বিয়ের পরও প্রায় এক বছর নায়কের সাথে কথা বলেননি শ্বশুরজী। আজ এতো বছর পর জীবন সায়াহ্নে সেই লোকটি এখন ৭৫ বছরের বৃদ্ধ। মেয়ের জামাইয়ের জন্য পালিয়ে বেড়াচ্ছেন দিনের পর দিন। ২৯ বছর আগে নায়কের ইচ্ছে হতো ইস্ শ্বশুর যদি একটু বিপদে পড়তেন। না তিনি কোনদিন বিপদে পড়েননি। আজ নায়কের কল্যানে উঁচু হাতের ইশারায় তিনি এখন বৃদ্ধ ফেরারী –

আচ্ছা বলুন তো – উপরোক্ত কাহিনীটি অবলম্বন করে যদি একটি সিনেমা বানানো হয় আর তাতে আমি থাকবো নায়ক এবং বিপরীতে থাকবেন বিদ্যাবালান- কিংবা রানী মুখার্জী- তবে কেমন হবে ?

সর্বশেষ খবর

আজকের ছবি

www.facebook.com

Tag Cloud